হঠাৎ করেই চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রকোপ বেড়েছে ফুসফুসের প্রদাহজনিত রোগ নিউমোনিয়ার। গত ২০ দিনে জেলা কেবল সদর হাপাতালেই চিকিৎসা নিয়েছে ৩ হাজারের বেশি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশু। এরমধ্যে প্রায় ২ হাজার শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে। এখনও দিনে ভর্তি হচ্ছে ৫০ এর অধিক শিশু। হাসপাতালে বিছানা ও জায়গা না পেয়ে রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ আরো বাড়ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, বিরূপ আবহাওয়ার কারণে হঠাৎ করে নিউমোনিয়া দেখা দিয়েছে। ব্যাপক সংখ্যক শিশুকে চিকিৎসা দিতে হিমসিম খেতে হচ্ছে তাদের। কাজ করছে না প্রচলিত এন্টিবায়োটিক সেফট্রিয়াক্সন।
হাসাপাতাল সূত্র জানিয়েছে, ঈদুল আজহার ক’দিন পর থেকে আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে শিশুদের ঠান্ডাজনিত রোগ ও নিউমোনিয়ায়র প্রার্দুভাব দেখা দেয়। গত দুই সপ্তাহে তা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
শুক্রবার সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের বারান্দা আর করিডোরে বিছানা পেতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে আক্রান্তদের।
হাসপাতালে ভর্তি আক্রান্ত এক শিশুর মা বলেন, ‘আমার বাচ্চার নিউমোনিয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। বেড না পাওয়ায় বারান্দায় বিছানা করে আছি’।
হাসিনা খাতুন নামের আরেক মা বলেন, ‘শিশুর বুক ধরপর করার পর হাসপাতালে নিয়ে আসি। এখানে ডাক্তাররা ছবি তুলতে কোহলে। ছবি তুলনু। তারপর ডাক্তাররা দেখলে, ঔষধ-পানি দিলে। চিকিৎসা হোইছে। ডাক্তাররা কোহছে একটু দেরি হয়ে গেছে।’
আরেক রোগী ফারুক হোসেন বলেন, ‘খুব খারাপ অবস্থা। ম্যালাই রোগী। নার্সেরা রোগী দেখছে। ডাক্তাররা সিরিয়াল ধরে রোগী দেখছে। হামার রোগী ১ ঘন্টা জ্ঞানহারা হয়েছিলে। চোখ বসে গেছে। আমার রোগীর এখনই দেখা দরকার। কিন্তু কি করবো ডাক্তারতো আসবে দেরি করে’।
জানা গেছে, হাসাপাতালে ১৮ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে প্রতিদিন গড়ে ভর্তি রোগী থাকছে ১৪০ জনের বেশি রোগী। দুইজন শিশু বিশেষজ্ঞের চলছে চিকিৎসা। তাই সবাইকে সেবা দিতে হিমসিম খেতে হচ্ছে বলে জানান চিকিৎসকরা।
হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. বেনজির আহম্মেদ বলেন, ‘আবহাওয়াটা খুব খারাপ যাচ্ছে, ভ্যাপসা গরম। তারপর আবার বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়ার এই তারতম্যের কারণেই এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের ৮০ ভাগই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। এর বাইরে টাইফয়েট, সর্দি জ্বরের রোগী আছে’।
হাসপাতালের আরেক শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মাহফুজ রায়হান বলেন, ‘এতো রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে বেকায়দায় পড়ছি। দিনে ১৫০ জনের বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে। এর বাইরে আউট ডোরেতো চিকিৎসা নিচ্ছেই’। তিনি বলেন, ‘পরিবারে ও মায়েদের অসচেতনাতার কারণে নিউমোনিয়ায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। তারা বাচ্চাদের আলো বাতাস থেকে দূরে রাখছেন। আবার সরিষার তেল দিয়ে বাচ্চাকে জামা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখেন। এতে করে বাচ্চা ঘেমে গিয়ে ঠান্ডাজনিত রোগ ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে’।
হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে গিয়ে এবারের অভিজ্ঞতা সর্ম্পকে ডা. মাহফুজ বলেন, ‘আগে আমরা যে সব প্রচলিত এ্যান্টিবায়োটিক সেফট্রিয়াক্সন ব্যবহার করতাম। এখন প্রায় ৪০ শতাংশ রোগীর এই সেফট্রিয়াক্সন কাজ করছে না। এটি একটি অশনি সংকেত। হাইয়ার এ্যান্টিবাইয়োটিক ইঞ্জেকশন ব্যবহার করছি। তারপর রেসপন্স পাওয়া যাচ্ছে’।
তিনি বলেন, ‘আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে হাইয়ার এ্যান্টিবাইয়োটিক ইঞ্জেকশন দেয়ার তেমন প্রয়োজন হতো না। দু’ একটা রোগীকে দিতে হতো। এখন তা দিতে হচ্ছে ১৪ থেকে ১৫ টি রোগীকে। এই ইঞ্জেকশনগুলো ব্যায় বহুল। হাসপাতাল থেকে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। যদি স্টক শেষ হয়ে যায় তাহলে তা বাইরে থেকে কিনতে হবে। এতে করে রোগীর স্বজনদের বেকায়দায় পড়বে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে সিভিল সার্জন ডা. জাহিদ নজরুল চৌধুরী বলেন, ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে রোগী আছে তার প্রায় তিনগুন। হঠাৎ করেই রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বেড না পাওয়া গুরুত্বপুর্ণ নয়, বারান্দাতেই যথাযথ চিকিসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। ভ্যাপসা গরম কেটে গেলেই পরিস্থিতির উন্নতি হয়ে যাবে’।
