পুলিশের ‘মধ্যস্থতা’ আত্মসমর্পণ এবং ‘ক্রসফায়ার’

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৩:৫০ এএম

ক্রসফায়ারের ভয়ে চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে ঢাকায় গিয়ে তাবলিগ জামাতে সময় দিচ্ছিলেন চট্টগ্রাম নগর পুলিশের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় থাকা ১৩ মামলার আসামি মোহাম্মদ বেলাল (৪৩)। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগের আশ্বাস পেয়েই থানা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন তিনি। আর আত্মসমর্পণের বিষয়টি পুলিশের সঙ্গে মধ্যস্থতা করেছিলেন অনলাইন টিভির এক সাংবাদিক। তার পরামর্শেই জামিনে থাকা মামলায় গরহাজির থেকে আদালত থেকে ওয়ারেন্ট অর্ডার ইস্যু করিয়েছিলেন বেলাল। কিন্তু এত কিছুর পরও প্রাণে বাঁচতে পারেননি তিনি। সম্প্রতি চট্টগ্রামের খুলশী থানায় দিনে আত্মসমর্পণের পর রাতে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত বেলালের আত্মসমর্পণের নেপথ্য কাহিনী খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য।

পুলিশের সঙ্গে মধ্যস্থতা করে আত্মসমর্পণের পরও বাবাকে ‘ক্রসফায়ারে’ দেওয়ায় ক্ষুব্ধ বেলালের ছেলে নগরীর টাইগারপাস বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র মো. সজীব। সজীব দেশ রূপান্তরকে বলে, ‘বিভিন্ন মামলার আসামি হয়ে পুলিশের ক্রসফায়ারের হুমকি পেয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় চলে গিয়েছিলেন আমার আব্বু। আমার দাদা-দাদির মৃত্যুর পর তাদের মরা মুখ দেখারও সুযোগ হয়নি তার। অংশ নিতে পারেননি নিজের জন্মদাতা বাবা-মায়ের জানাজায়। তাই আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন তিনি। চেয়েছিলেন পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালোভাবে বাঁচতে। পুলিশের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়েই আত্মসমর্পণ করেছিলেন থানায়। কথা ছিল পরদিন আদালতে হাজির করবে। কিন্তু রাতেই বন্দুকযুদ্ধের গল্প সাজিয়ে মেরে ফেলা হলো আব্বুকে। এতিম করা হলো আমাদের।’

সজীব আরও বলে, ‘আব্বুর আত্মসমর্পণের পুরো বিষয়টি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) বিজয় বসাকের সঙ্গে সমন্বয় করেছিলেন জেটিভি অনলাইনের সাংবাদিক রাজু আহমেদ। আব্বুর সব মামলায় জামিন থাকার পরও ওই পুলিশ কর্মকর্তার পরামর্শে দুটি মামলায় আদালত থেকে ওয়ারেন্ট করা হয়েছিল। ওই ওয়ারেন্টের কপি দেওয়া হয়েছিল খুলশী থানায়। এরপর ৪ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টায় আমরা সবাই আব্বুকে নিয়ে খুলশী থানায় আত্মসমর্পণ করাই।’

নিহত বেলাল কুমিল্লার চান্দিনা থানার কঙ্গাই গ্রামের প্রয়াত আবদুল কাদেরের ছেলে। পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকতেন চট্টগ্রাম মহানগরীর খুলশীর আমবাগান এলাকার একটি ভাড়া বাসায়। তার দুই ছেলের বয়স যথাক্রমে ১৬ ও ৯ বছর। একমাত্র মেয়ের বয়স ১০ মাস। নগরীর বিভিন্ন থানায় তার নামে খুন, ডাকাতি ও মাদকের মামলা রয়েছে ১২টি। আরেকটি মামলা রয়েছে কুমিল্লার তিতাস থানায়।

বেলালের ছেলে সজীবের ভাষ্যমতে, গত বুধবার সকালে আত্মসমর্পণের পর দুপুরে ও রাতে তাকে বাসা থেকে নেওয়া ভাত খাওয়ানো হয়। তার এক ফুফাতো ভাই রাতে থানার বাইরে থাকতে চাইলেও কর্তব্যরত পুলিশ সদস্য তাকে বাসায় চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। ওই পুলিশ সদস্য বলেছিলেন, ‘কাল আদালতে চালান দেওয়া হবে, রাতে আর বসে থাকার কোনো দরকার নেই।’

সজীব বলে, ‘এরপর উনি (ফুফাতো ভাই) বাসায় চলে যান। সকাল সাড়ে ছয়টায় আম্মা নাশতা নিয়ে থানায় যান। তখন থানা থেকে বলা হয়, “ওনাকে (বেলাল) নিয়ে পুলিশ অভিযানে গিয়েছে, এখনো ফেরেনি।” পরে সকাল নয়টার দিকে আমরা শুনতে পাই, আব্বুকে ক্রসফায়ার দেওয়া হয়েছে।’

বেলালের আত্মসমর্পণে মধ্যস্থতার বিষয়টি দেশ রূপান্তরের কাছে স্বীকার করেছেন জেটিভি অনলাইনের সাংবাদিক রাজু আহমেদ। তিনি জানান, সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর মো. হোসেন হিরণের মাধ্যমে বেলালের সঙ্গে তার পরিচয়। রাজু বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আগ্রহ ব্যক্ত করেন বেলাল এবং এ ব্যাপারে আমার সহযোগিতা চান। আমি সিএমপি কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে তার বিষয়টি জানালে তিনি আমাকে উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) বিজয় বসাকের সঙ্গে দেখা করতে বলেন। পরে উপপুলিশ কমিশনারকে গিয়ে বিষয়টি বলার পর তিনি তার (বেলাল) বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়ে জানাবেন বলে জানান। পরে যোগাযোগ করার পর তিনি (উপকমিশনার) বলেন, তাকে (বেলাল) আত্মসমর্পণ করতে হলে কয়েকটি মামলায় ওয়ারেন্ট থাকতে হবে। তার পরামর্শ অনুযায়ী আদালতে গরহাজির থেকে দুটি মামলায় ওয়ারেন্ট করানো হয় এবং ওয়ারেন্টের কপি উপপুলিশ কমিশনারকে (উত্তর) দেওয়া হয়। তিনি ওয়ারেন্টের কপিগুলো খুলশী থানায় পাঠিয়ে দেন এবং সেখানে আত্মসমর্পণ করতে বলেন। এরপর আমি নিজে খুলশী থানায় গিয়ে ওসি প্রণব চৌধুরীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করি। এরপর বেলাল আত্মসমর্পণ করেন। পুলিশের সঙ্গে কথা ছিল তাকে আদালতে চালান দেবে। কিন্তু তা আর হয়নি। পুলিশের ভাষায়, অস্ত্র উদ্ধারে গিয়ে বন্দুকযুদ্ধে তার মৃত্যু হয়েছে।’

সাংবাদিক রাজু আরও বলেন, ‘একটা মানুষ ভালো হতে চেয়েছিলেন, তাই আমি এর মধ্যস্থতা করেছিলাম। কিন্তু এখন নিজেকেই অপরাধী মনে হচ্ছে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) বিজয় বসাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটা অনলাইন টিভির সাংবাদিক আমার কাছে এসে বেলালের আত্মসমর্পণের আগ্রহের কথাটি জানিয়েছিলেন। আমি বলেছি, যে কেউ চাইলে থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করতে পারে। পরে তিনি আত্মসমর্পণ করেছেন। পরদিন তাকে আদালতে হাজির করার কথা ছিল। তার বিরুদ্ধে খুন ও ডাকাতিসহ ১৩টি মামলা রয়েছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছে থাকা অস্ত্রের তথ্য দিয়েছিলেন বেলাল। সেই অস্ত্র উদ্ধারে রাতে তাকে নিয়ে অভিযানে গেলে সেখানে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে পুলিশের বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে বেলাল মারা যায়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত