আফগানিস্তান : ৩৪২ ও ২৩৭/৮ বাংলাদেশ : ২০৫ ৩য় দিন শেষে ৩৭৪-এ এগিয়ে আফগানিস্তান
সৌভাগ্যের শহরে নিশ্চিতপ্রায় দুর্ভাগ্যের মুখোমুখি বাংলাদেশ। চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টের তৃতীয় দিনের খেলা শেষে স্বাগতিকদের খুব কাছ থেকে চোখ রাঙাচ্ছে পরাজয়। আফগানদের দ্বিতীয় ইনিংস গতকাল শেষ হয়নি। হাতে দুই উইকেট নিয়ে তাদের লিড ৩৭৪ রানের। ১৮৭৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এর চেয়ে বেশি রানের টার্গেট তাড়া করে জয়ের রেকর্ড আছে সাকুল্যে সাতটি। বাংলাদেশে রেকর্ড
সর্বোচ্চ ২১৫। চার শতাধিক রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড ইতিহাসে মাত্র চারটি। ওই মাইলস্টোন স্পর্শের লক্ষ্য আফগানিস্তানের। বাংলাদেশের মনস্তত্বে আরও বড় দেয়াল তুলতে। সব মিলে স্বাগতিকরা হারের মুখেই।
ক্রিকেট গৌরবময় মহান অনিশ্চয়তার খেলা। অধিনায়ক সাকিব আল হাসান আগের বিকেলে বলে গেছেন, এখনো জয় সম্ভব। গতকাল সেই আশার সামনে প্রায় দুরাশার দেয়াল উঠে গেছে। আফগানিস্তানের ওপেনার ইব্রাহিম জাদরান দ্বিতীয় ইনিংসে ২০৮ বলে ৮৭ রানের পরিণত ইনিংস খেলেছেন। অথচ ২০ বছরের এই যুবার এটা অভিষেক ম্যাচ। ব্যাক টু ব্যাক ফিফটি করা অভিজ্ঞ আসগার আফগানের (৫০) সঙ্গে ১০৮ রানের জুটি গড়েছেন চতুর্থ উইকেটে। পঞ্চম উইকেটে আরও ৩৫ রানের পার্টনারশিপ ৩৪ রানে অপরাজিত আফসার জাজাইয়ের সঙ্গে। অধিনায়ক রশিদ খান ২২ বলে ২৪ রানের দ্রুত ও প্রয়োজনীয় একটা ইনিংস খেলে গেছেন। প্রথম ইনিংসের ৩৪২-এর পর এখন ৮ উইকেটে ২৩৭ তাদের। বাংলাদেশ তৃতীয় দিন সকালে ২০৫ রানে গুটিয়ে গেছে প্রথম ইনিংসে। সব মিলে ইব্রাহিমের মনে হচ্ছে, ম্যাচ জেতার ৭০ শতাংশ কাজটা তারা সেরে ফেলেছেন।
গতকাল শেষ বিকেলে বৃষ্টি নামলে খেলা সময়ের আগে শেষ হলো। তাতে আজ খেলা শুরু হচ্ছে ২০ মিনিট আগে। এখনো এই টেস্টের দুই দিন বাকি। আবহাওয়া দীর্ঘ সময় কেড়ে না নিলে ড্রর সুযোগ নেই, ফল হবে নিশ্চিত। এবং মাত্র তৃতীয় টেস্ট খেলতে নামা আফগানদের পাল্লা ভারী। মেহেদী হাসান মিরাজ গতকাল জানিয়ে গেলেন, ‘ক্রিকেটে অনেক কিছুই সম্ভব। ব্যাটসম্যানদের চ্যালেঞ্জটা নিতে হবে।’
বাস্তবতা যখন এমন ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ জয়ের সাহস খুব একটা দিচ্ছে না। তারপরও শেষের আগে তো হার মানা যায় না। চট্টগ্রামের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে গেল রাত, আজ সকাল ও দুপুরে বজ্রসহ বৃষ্টি দেখা যাচ্ছে। তবে সেই আভাসে বৃষ্টির স্থায়িত্বের সম্ভাবনা কম। তার মানে এই টেস্টে বৃষ্টির প্রার্থনা করেও লাভ নেই। আর চট্টগ্রামের ড্রেনেজ সিস্টেম তো দারুণ।
বাংলাদেশের স্পিনারদের মনে হচ্ছে, উইকেট এখনো তেমন আছে যেমনটা তারা প্রথম দিন পেয়েছিলেন। দ্বিতীয় দিনের শেষ বিকেলে মোসাদ্দেক হোসেনের সঙ্গে দারুণ একটা জুটি দিয়ে দলীয় স্কোরটা বাড়িয়েছিলেন তাইজুল ইসলাম। কিন্তু এদিন সকালে শুরুতেই তাইজুল আউট। অন্য উইকেটও দ্রুত গেল। ৩.৫ ওভারে ৯ রান তুলতে শেষ দুর্দশার প্রথম ইনিংস। মোসাদ্দেক ৪৮ রানে অপরাজিত ছিলেন।
স্বাগতিকরা যে উইকেটে টিকল ৭০.৫ ওভার সেখানে প্রথম ইনিংসে ১১৭ ওভার খেলেছে আফগানিস্তান। আর দ্বিতীয় ইনিংসে খেলে ফেলেছে ৮৩.৪ ওভার। কিন্তু তাদের এই ইনিংসের শুরুতে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলেন সাকিব। বাঁহাতি স্পিনার ইনিংসের প্রথম ওভারে টানা দুই বলে ওপেনার ইহসানউল্লাহকে ৪ ও আগের ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান রহমত শাহকে গোল্ডেন ডাকে ফেরান। হ্যাটট্রিক হয়নি। কিন্তু ছন্দ পেয়ে যায় স্বাগতিক বোলাররা। দলের ২৮ রানের সময় হাশমতউল্লাহ শাহিদকে (১২) ফেরান অফ স্পিনার নাঈম হাসান।
কিন্তু তারপর তারুণ্যে-অভিজ্ঞতায় দারুণ প্রতিরোধ ও মনোযোগ দেখায় আফগানিস্তান। বিস্ময় জাগানো দেয়াল ইব্রাহিম। আসগার তো পরীক্ষিত। একটু আলগা বল পেলেই কেমন মেরেছেন তার প্রমাণও আছে। ইব্রাহিমের ইনিংসে ৬টি চারের পাশে ৪টি ছক্কা। আসগারের ২ ছক্কা ও ৪ বাউন্ডারি। বাংলাদেশের বোলাররা সেই প্রথম দিন থেকে বল করছেন। ব্যাটও করেছেন। এটা তাদের জন্য শাস্তির টেস্ট হয়ে উঠেছে। ‘অল স্পিন অ্যাটাক’ এখন বোঝা যেন। উইকেট থেকে সহায়তা মিলছে না। আকাশও বিরূপ। রৌদ্র খরতাপও মেলেনি। তাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে নিতে আফগান ব্যাটসম্যানরা আরও ধৈর্যশীল হয়ে উঠেছেন।
বাংলাদেশি বোলারদের শক্তি নিঃশেষ হচ্ছে। তাইজুল ইসলাম ব্যাট হাতেও মাঠে কাটিয়েছেন ৬৯ মিনিট। প্রথম ইনিংসে ৪১ ওভার বল করার পর এর মধ্যে ২৪.৪ ওভার হাত ঘুরিয়ে ফেলেছেন। প্রাপ্তি, এই ইনিংসে সবচেয়ে দামি চার উইকেটের দুটি। আসগারকে বিদায় করে বিপজ্জনক জুটি ভেঙেছেন। রশিদ খানের ঝড়ও তাইজুল থামিয়েছেন।
তবে ঝামেলা হলো, সকালে সাকিব যে ছন্দ এনেছিলেন তা ধরে রাখতে পারেনি বাংলাদেশ। পরে আরও বিপর্যস্ত হয়েছে। এদিন আফগানদের অলআউট করতে পারলেও এক ধরনের সান্ত¡না ও স্বস্তি থাকত। মেলেনি কিছুই। আসলে এই টেস্টে এখন পর্যন্ত নবীন আফগানদের বিপক্ষে অভিজ্ঞ বাংলাদেশ নিজেদের পক্ষে নিতে পারেনি কিছু। না ব্যাটিংয়ে, না বোলিংয়ে।
টানা তিন দিনের এই ব্যর্থতার পর চতুর্থ দিন থেকে ক্লান্ত স্বাগতিকরা আচমকা খুব সফল হয়ে উঠতে থাকবে? পাহাড় টপকে জিতবে? ক্রিকেট ইতিহাসে এমন ঘটনা আছে সামান্য। যাকে বলতে হয় ‘ব্যতিক্রম’। কিন্তু ব্যতিক্রম তো আর কখনো উদাহরণ হিসেবে আসতে পারে না, তাই না!
