বাবার মৃত্যুর ‘প্রতিবাদ’ করতে গিয়ে প্রাণ যাচ্ছে ছেলের

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০১:১২ এএম

গাড়িচাপায় বাবাকে হত্যার প্রতিবাদে বাস আটকাতে গিয়ে এবার প্রাণ হারানোর উপক্রম হয়েছে ছেলের। রাজধানীর উত্তরা এলাকায় একই পরিবহনের বাসের চাপায় গুরুতর জখম হয়ে পারভেজ রবের ছেলে আয়ামিন আলভী রব (১৯) এখন রাজধানীর ট্রমা সেন্টার হাসপাতালের বেডে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। গত শনিবার রাতের ওই ঘটনায় নিহত হয়েছেন আলভীর বন্ধু মেহেদী হাসান ছোটন (২০)। তার লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের অপমৃত্যু মামলায় বলা হয়েছে, রাস্তা পার হওয়ার সময় বাসের ধাক্কায় নিহত হয়েছেন ছোটন।

গত ৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর তুরাগ এলাকায় ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজের সামনে ভিক্টর পরিবহনের একটি বাসের চাপায় নিহত হন কণ্ঠশিল্পী  আপেল মাহমুদের চাচাতো ভাই সংগীত পরিচালক ও কণ্ঠশিল্পী পারভেজ রব। ওই দুর্ঘটনার পর থেকে তুরাগের বেড়িবাঁধ সড়ক দিয়ে ভিক্টর পরিবহনের বাস চলা বন্ধ ছিল।

উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি তপন চন্দ্র সাহা দেশ রূপান্তরকে জানান, পারভেজ রবের মৃত্যুর পর থেকে ভিক্টর পরিবহনের বাসগুলো উত্তরার কামারপাড়া হয়ে চলাচল করছিল। গত শনিবার রাত ৯টার দিকে আলভী ও তার বন্ধুরা বাস চলাচলে বাধা

 

দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় একটি গাড়ি আলভী ও মেহেদীকে চাপা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। এতে আলভী ও মেহেদী আহত হন। মেহেদীকে স্থানীয় হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।

এ ব্যাপারে পারভেজ রবের বন্ধু সংস্কৃতিকর্মী ও সাংবাদিক আলী আশরাফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, রবের মৃত্যুর পর শনিবার সন্ধ্যায় ভিক্টর পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে তার পরিবারের একটি সমঝোতা বৈঠক হয়। সেখানে তারা এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলে। কিন্তু পারভেজ রবের পরিবার তা মানেনি। এক পর্যায়ে দুপক্ষের মধ্যে বাগ্বিত-া হয়; পারভেজ রবের পক্ষের লোকজনকে ধাওয়া দেয় ভিক্টর পরিবহনের লোকজন। এ সময় দৌড়ে পালাতে গিয়ে পারভেজ রবের ছেলে আলভী ও তার বন্ধু মেহেদী বাসচাপা পড়ে। আলী আশরাফ বিষয়টিকে পরিকল্পিত হত্যা দাবি করে বলেন, ভিক্টর ও ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহন আগে থেকেই বেপরোয়া। গত ১৯ মার্চ রাজধানীর বসুন্ধরা গেট এলাকায় ‘সুপ্রভাত’ পরিবহনের একটি বাসের চাপায় নিহত হন বিইউপির শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী। ওই ঘটনার পর সুপ্রভাত পরিবহনের বাস বন্ধ করে দেওয়া হয়। সুপ্রভাত পরিবহনের বাসগুলোর অধিকাংশই নাম পরিবর্তন করে ভিক্টর ক্লাসিক নামে সদরঘাট থেকে আবদুল্লাহপুর হয়ে বাইপাইল পর্যন্ত চলাচল করে। এই বাসের চালকরা অত্যন্ত বেপরোয়া। এদের হাতে পরপর বেশ কয়েকটি প্রাণহানির ঘটনা ঘটল।

পারভেজ রবের পারিবারিক বন্ধু ও অভিনেতা খালেদ মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, শনিবার সন্ধ্যায় পারভেজ রবের পরিবারের সঙ্গে একটি সমঝোতা হওয়ার কথা ছিল। আলভী ও তার বন্ধুরা সেখানে গিয়েছিল। ওই সময় আমি (খালেদ) পারভেজ রবের বাসায় ছিলাম। পরে শুনে আলভী ও তার বন্ধু বাসচাপায় আহত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, গতকাল রবিবার ছিল পারভেজ রবের কুলখানি। ঠিক তার আগের দিনই বাসচাপায় প্রাণ হারাতে বসেছে পারভেজ রবের ছোট ছেলে।

পারভেজ রব যেখানে নিহত হন সেই এলাকা পড়েছে তুরাগ থানা এলাকায়। তুরাগ থানার ওসি নূরুল মোত্তাকিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের না জানিয়ে পারভেজ রবের পরিবারের লোকজন ভিক্টর পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতামূলক বৈঠকে বসে। শুনেছি সমঝোতা ছাড়াই ওই বৈঠক শেষ হয়েছে। সেখানে অথবা সেখান থেকে ফেরার পথে পারভেজ রবের ছেলে আলভী ও তার বন্ধু মেহেদী বাসচাপায় আহত হন। ঘটনাটি উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায় হওয়া এ বিষয়ে বিস্তারিত ওই থানার লোকজন বলতে পারবেন।

পারভেজ রবের পরিবারের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, সমঝোতার জন্য পারভেজ রবের পক্ষের লোকজন তার দুই ছেলের জন্য দুটি বাস অথবা ২০ লাখ টাকা দাবি করেন। কিন্তু এই দাবি না মেনে ভিক্টর পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ মাত্র এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলে। এই নিয়ে বাগ্বিত-ার এক পর্যায়ে আলভী ও মেহেদীকে বাসচাপা দিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়।

আলভীর স্বজনরা গতকাল রোববার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাংবাদিকদের জানান, শনিবার রাত ১০টার দিকে উত্তরা পশ্চিম থানাধীন ৯ নম্বর সেক্টরের স্লুইচগেট এলাকায় আলভী ও মেহেদীকে চাপা দেয় ভিক্টর পরিবহনের একটি বাস। পরে স্থানীয় এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় মেহেদীর। আলভীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। গতকাল শনিবার আলভীকে শ্যামলীর ট্রমা হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় ঘাতক বাস ও বাসের চালককে আটক করেছে পুলিশ। নিহত মেহেদী তুরাগ ধউর এলাকার ইউসুফ আলীর ছেলে। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি মেজ।

আহত আলভী দেশ রূপান্তরের ঢাকা মেডিকেল প্রতিনিধিকে জানান, স্লুইচগেট এলাকায় ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের একটি বাসকে থামার জন্য সংকেত দিলে তারা না থামিয়ে তাদের চাপা দেয়।

নিহত মেহেদীর মামাতো ভাই ফিরোজ ভিক্টর পরিবহনের লোকজনের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, মেহেদী ও তার বন্ধু আলভী এক সঙ্গে পারভেজ রবের কুলখানির বাজার করার জন্য টঙ্গী বাজারে যাচ্ছিল। তারা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ভিক্টর পরিবহনের একটি বাস অপর একটি বাসের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছিল। এ সময় ভিক্টর পরিবহনের একটি বাস মেহদী ও আলভীকে চাপা দেয়। এ ঘটনায় ফিরোজ নিজেই বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করেছেন। মেহেদীর ভাই পারভেজ জানান, তার ভাই কয়েক বন্ধুসহ বাসে উঠতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় ভিক্টর পরিবহনের একটি বাসের চাপায় মেহেদী মারা যান।

মেহেদীর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন উত্তরা পশ্চিম থানার এসআই মো. সাদেক। প্রতিবেদনে তিনি বলেছেন, বাসের চাপায় মেহেদীর কবজি ছড়ে গেছে, হাতে ও কানে কাটা জখম হয়েছে। ডান হাতের কবজির নিচে ভাঙা, বুকের ডান পাশে ও পেট কেটে গেছে। সুরতহাল প্রতিবেদনে এসআই সাদেক আরও বলেছেন, ‘রাত পৌনে ১০টার দিকে বেড়িবাঁধের আফসার কাউন্সিলরের পুরাতন বাড়ির সামনে রাস্তা পার হওয়ার সময় ভিক্টর পরিবহনের একটি বাস তাকে সজোরে ধাক্কা মারে। জখম অবস্থায় উপস্থিত লোকজন তাকে উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসরা মৃত ঘোষণা করেন। ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।’

বাসচালকদের বেপরোয়া আচরণে উত্তরা ও তুরাগের মতো দুর্ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ, শিক্ষার্থীদের দেশ অচল করার মতো আন্দোলন- কোনো কিছুই যেন চালকদের আচরণে প্রভাব ফেলছে না। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে প্রতিদিন গড়ে ১১ জন নিহত হচ্ছে।

এ নিয়ে গতকাল কথা হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিচার্স ইনস্টিটিউটের গবেষক ও অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমানের সঙ্গে। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘ঢাকার শহরে প্রতিনিয়ত এমন দুর্ঘটনা ঘটছে। এর মূলে যে সব কারণ রয়েছে আমরা সেগুলোর সমাধান করতে পারছি না। অভিজ্ঞ চালকের পাশাপাশি যতদিন ‘চুক্তিভিত্তিক’ বাস চালানো বন্ধ করা না হবে, ততদিন এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে। কারণ চুক্তিভিত্তিক বাস চালানোর ক্ষেত্রে চালক যত বেশি যাত্রী নিতে পারে, যত বেশি ট্রিপ দিতে পারে; তাদের ততই লাভ। চালকরা প্রতিদিন টাকা কামাই করার নির্ধারিত লক্ষ্য নিয়ে বাস চালায়। ওই লক্ষ্যপূরণের পর লাভের জন্য আরও বেপরোয়া হয়ে পড়ে। এই চাপ থেকে চালকরা যাত্রী উঠানোর জন্য রাস্তার মাঝখানেই বাস থামাচ্ছে, আবার যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে। বেশি যাত্রী পাওয়ার জন্য অন্য বাসের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। আর এই পাল্লা দেওয়া ও বেপরোয়া চালানো থেকে দুর্ঘটনা ঘটছে। চুক্তিভিত্তিক বাস চালানো বন্ধ করা গেলে এবং অভিজ্ঞ চালক দিয়ে গাড়ি চালানো হলে দুর্ঘটনা কমে যাবে।

ড. মিজান আরও বলেন, ‘ঢাকা শহরে ৬০-৬৫টি বাস রুট আছে। এত রুট থাকার কারণে বিভিন্ন রুটের বাসের মধ্যে যাত্রী নেওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা হয়। আমাদের পরামর্শ হচ্ছে, সব রুটে যে বাস চলে সেগুলো কমিয়ে আনা। যাতে একই সড়কে একটির বেশি রুটের বাস না থাকে। এটা করতে পারলে সড়কে শৃঙ্খলা অনেকাংশে ফিরে আসবে বলে আমাদের ধারণা।

পারভেজ রব ও মেহেদীর প্রাণহানি এবং আলভীর আহত হওয়ার ঘটনা মর্মান্তিক উল্লেখ করে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুধু ভিক্টর বাস নয়, সব পরিবহনেরই একই চিত্র। যে বাসের চালক ও চালকের সহকারী অপরাধ করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে দুর্ঘটনা কমতে বাধ্য। কিন্তু আমাদের দেশে দুর্ঘটনা হলে মামলা হয় না, মামলা হলে সঠিকভাবে তদন্ত হয় না, তদন্ত হলেও বিচার হয় না। বিচারহীনতার সংস্কৃতির জন্য জন্য এমন ঘটনা বারবার ঘটছে। যে কারণে তারা একটার পর একটা ঘটনা ঘটাতেও দ্বিধাবোধ করে না।’

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত