মুহিবুল্লাহসহ সহযোগীরা চিহ্নিত

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০২:০০ এএম

রোহিঙ্গা সংকটের দুই বছর পূর্তিতে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কক্সবাজারের উখিয়া ক্যাম্পের ভেতরে রোহিঙ্গাদের বিশাল সমাবেশ আয়োজনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতাকারী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে চিহ্নিত করেছে জেলা প্রশাসন। জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ ও মাস্টার আবদুর রহিমের নেতৃত্বেই বড় সমাবেশ ঘটে। তিনি জানান, ওই দুজনের সঙ্গে দেশি-বিদেশি এনজিওগুলোর সম্পর্ক রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, এর মধ্যে আমরা কয়েকটা এনজিওর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছি। দ্রুতই জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এনজিওদের কার্যক্রম নিয়ে গতকালও (রবিবার) মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট মিলারকে বলা হয়েছে। ত্রাণ এবং আর্থিক সহযোগিতার নামে কেউ বিশৃঙ্খলা করবে এটা মেনে নেওয়া হবে না।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি তদন্ত প্রতিবেদন গত ৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক বরাবর পাঠানো হয়েছে। এরই মধ্যে অভিযুক্ত ছয়টি এনজিও সংস্থাকে ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের পাঠানো তদন্ত প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা সমাবেশের আয়োজক হিসেবে যেসব সংগঠনকে চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো হলোÑ ভয়েস অব রোহিঙ্গা, রোহিঙ্গা রিফিউজি কমিটি (আরআরসি) এবং আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যানস রাইটস (এআরএসপিএইচ)। এর মধ্যে এআরএসপিএইচ সংগঠনটি রোহিঙ্গাদের মধ্যে বেশ প্রভাবশালী।

প্রতিবেদনে মদদদাতা হিসেবে যাদের চিহ্নিত করেছে তারা হলেন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউমিনিটি রাইটসের (এআরএসপিএইচ) সভাপতি মুহিবুল্লাহ, সহসভাপতি মাস্টার আবদুর রহিম, সাধারণ সম্পাদক ও উখিয়া ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক নুরুল মাসুদ ভূঁইয়া, সংগঠনটি উপদেষ্টা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী দুলাল মল্লিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. ফরিদুল আলম ও মৌলানা ইউসুফ, কক্সবাজার জেলা দায়রা জজ আদালতের পিপি মাহবুবুর রহমান, কক্সবাজারে দুর্নীতি দমন কমিশনের পিপি আবদুর রহিম ও ক্যাম্পে নিয়োজিত পুলিশের এএসআই বোরহানউদ্দিন।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, গত ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মহাসমাবেশের ঘটনায় স্থানীয়রা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে প্রশাসনের অনুমতি না নিয়েই এ সমাবেশ হয়েছে। রোহিঙ্গাদের এই সমাবেশের পেছনে রহস্য জানতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই তদন্ত কমিটি একটি প্রতিবেদন এনজিও ব্যুরোর কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, চিহ্নিতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নিকারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, যারা রোহিঙ্গা সমাবেশে মদদ দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জানা গেছে, ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের সমাবেশের আগে ‘এডিআরএ’ নামক একটি এনজিও সংস্থা গত ১৯ ও ২১ আগস্ট কক্সবাজার কলাতলীর শালিক রেস্তোরাঁয় বৈঠক করে। বৈঠকে আলোচিত রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহকে আড়াই লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়। এছাড়া ‘আল মারকাজুল ইসলামী সংস্থা’ সমাবেশে রোহিঙ্গাদের জন্য টি-শার্ট তৈরিতে সহযোগিতা করে। পরে ২৫ আগস্ট কুতুপালংয়ে মধুরছড়া এক্সটেনশন-৪ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মহাসমাবেশ করে রোহিঙ্গারা। এছাড়াও নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফুটবল খেলার মাঠ ডি-৫ ব্লকের মাঠে ভিন্ন ভিন্ন সংগঠনের পক্ষে সমাবেশ ও র‌্যালি করা হয়। সমাবেশ সফল করতে ডি-৫ ব্লকে ‘রোহিঙ্গা রিফিউজি কমিটি’ (আরআরসি) সংগঠনের চেয়ারম্যান সিরাজুল মোস্তফার নেতৃত্বে ২৫ হাজার করে চাঁদা সরবরাহ করা হয়। সংগঠনের সেক্রেটারি সাইফুল হকের নিকটাত্মীয় স্বজন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করায় তাদের কাছ থেকেও চাঁদা সংগ্রহ করা হয়। বিশেষ করে লন্ডনের নুরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি তাদের প্রায় পাঁচ-ছয় মাস আগে সংগঠনের অফিস নির্মাণের জন্য ২ লাখ টাকা অনুদান দেন। এই সংগঠনের মূল কমিটি ২৫ জনের। সমাবেশের টি-শার্ট তৈরি করতে ক্যাম্পে কর্মরত পুলিশের এএসআই বোরহানউদ্দিনের মোটরসাইকেল ব্যবহার করা হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। জানা গেছে, ভয়েস অব রোহিঙ্গার ৭০০ সাদা হাফ টি-শার্ট ও ২৮টি ব্যানার উখিয়া উপজেলার মসজিদ মার্কেটের নিশাত প্রিন্টার্স ও মিডিয়া প্রিন্টার্স থেকে ছাপানো হয়। রোহিঙ্গা রিফিউজি কমিউনিটি (আরআরসি) সংগঠনের ১০০ হাফ টি-শার্ট ছাপানো হয়েছে কক্সবাজার বাজারঘাটা শাহ মজিদিয়া প্রিন্টার্স থেকে। তবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বেশকিছু সংগঠন কাজ করলেও মুহিবুল্লাহর নেতৃত্বে পরিচালিত ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউমিনিটি রাইটস (এআরএসপিএইচ)’ সংগঠনটি বেশ শক্তিশালী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। মুহিবুল্লাহর সংগঠনের ৩০০ জন সক্রিয় সদস্য রয়েছে। এ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন, উখিয়া সিকদারপাড়া এলাকার আবদুল করিম ভূঁইয়ার ছেলে উখিয়া কলেজের প্রভাষক নুরুল মাসুদ ভূঁইয়া। ২৫ আগস্ট তিনি উপজেলার মানবাধিকার সংগঠন ‘পিসওয়ে হিউম্যান রাইটস সোসাইটি’র সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। মাসুদের পূর্বপুরুষ মিয়ানমারের নাগিরক বলেও উল্লেখ করা হয়। এ সংগঠনের সাত সদস্যের একটি উপদেষ্টা কমিটি রয়েছে। যারা কক্সবাজারের স্থায়ী বাসিন্দা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মুহিবুল্লাহর সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট মিলারের একটি মিটিং হয়। এরপর তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাংলাদেশি টিভি ও ইউটিউব চ্যানেলের চেয়ে মিয়ানমারে চ্যানেল বেশি চলে। সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের মহা সমাবেশসহ নানান খবরাখবর নিয়ে এসব চ্যানেল সক্রিয় হয়ে উঠেছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে এমন তথ্য জানা গেছে। দেশের বাইরে থেকে বেশিরভাগ চ্যানেল পরিচালিত হয়। আর এর জন্য কিছু ফুটেজ পাঠানো হয় রোহিঙ্গা শিবির থেকে। উখিয়া টেকনাফের ৩৪টি আশ্রয় শিবিরের বাসিন্দাদের মধ্যে এসব টিভি চ্যানেলের এক ধরনের জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ প্রশাসনকে নিতে হবে। এজন্য রোহিঙ্গাদের ব্যবহৃত সব মোবাইল সিমও নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। যাতে ২৫ আগস্টের মতো মোবাইল ব্যবহার করে লাখ লাখ রোহিঙ্গা জড়ো হতে না পারে। তিনি বলেন, সম্প্রতি তিনি ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। সমাবেশ আয়োজনের হোতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কক্সবাজার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, রোহিঙ্গাদের অনলাইনভিত্তিক কিছু চ্যানেলের মাধ্যমে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, এমন অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। শিবিরে সাড়ে পাঁচ লাখ লোকের হাতে মুঠোফোন থাকার তথ্য পুলিশের কাছে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। গত মঙ্গলবার থেকে বিটিআরসি রোহিঙ্গা শিবিরে ১৩ ঘণ্টা ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত রাখার জন্য নির্দেশনা দেয়।

শিবিরে সক্রিয় যে অনলাইন টিভিগুলোর নাম জানা গেছে তার মধ্যে আরও রয়েছে ‘রোহিঙ্গা পিস টিভি’, ‘রোহিঙ্গা নিউজ আরাকান টিভি’, ‘আরাকান আর ভিশন’, ‘আরাকান টাইমস’, ‘রোহিঙ্গা নিউজ’, ‘আরাকান টাইম টুডে’, ‘রোহিঙ্গা টিভি’, ‘আরাকান নুর’, ‘এএনএ’ টিভি। এসব টিভিতে খবর ও অনুষ্ঠান প্রচারিত হয় রোহিঙ্গা ভাষায়। সরাসরি ওয়েবসাইটে গিয়ে অথবা ইউটিউবে এসব চ্যানেল দেখা যায়। এছাড়া অনেক টিভিরই ফেইসবুক পেজ রয়েছে। সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এসব চ্যানেল পরিচালিত হয়। আর রোহিঙ্গা শিবির থেকে এসব চ্যানেলের জন্য কিছু ফুটেজ পাঠানো হয়। এসব ফুটেজ আবার বিভিন্ন ফেইসবুক পেজ ও গ্রুপে শেয়ার করেছে রোহিঙ্গারা। এসব ফেইসবুক গ্রুপ ও পেজ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে প্রবাসী রোহিঙ্গা ও শিবিরে থাকা কিছু যুবক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত