তিনি বইগুলো অনেক কষ্ট করে লিখেছেন

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০২:৩৫ এএম

২০১৬ সালে একুশে পদক পেয়েছিলেন। বাংলাদেশের আর কোনো আদিবাসী লেখক, মানুষ এই দেশের সর্বোচ্চ সম্মাননাটিতে ভূষিত হতে পারেননি। সাংবাদিক, গবেষক ও লেখক মংছেন চিং মংছিন মারা গেছেন। স্বামীর কর্মময় জীবন নিয়ে বেগম রোকেয়া পদক ২০১৭ পাওয়া শোভা রানী ত্রিপুরার সঙ্গে আলাপ করেছেন রূপায়ন তালুকদার

তার জন্ম কোথায়? মা-বাবা? পূর্বপুরুষ?
মংছেন চিং মংছিনের জন্ম ১৯৬১ সালের ১৬ জুলাই কক্সবাজারের চালহট্টার রাখাইন পরিবারে। বাবা মং অংসাথোয়াই, মা দ মাইকোচিং। বাবা স্বর্ণকার, মা গৃহিণী ছিলেন। তার বাবা কক্সবাজারের রাখাইন পল্লীতে বৌদ্ধমন্দির, বৌদ্ধ ধর্মীয় জাদি স্থাপন করেছেন। তার বাবা অগ্রমেধা বৌদ্ধ বিহার পরিচালনা কমিটির সভাপতি ছিলেন। মা তাঁতের কাজও করতেন।

লেখালেখির প্রতি তার ভালোবাসার শুরু?
মংছেন চিং মংছিন ছোটকাল থেকে কবিতা লিখতেন। সেভাবেই লেখালেখির প্রতি তার আগ্রহ। ১৯৮০ সালে ২১ বছর বয়সেই ‘কক্সবাজারের রাখাইন ছাত্রসমাজ’ বইটি লেখেন। এই দেশে অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বা আদিবাসীদের তুলনায়  রাখাইনদের সংখ্যা খুব কম। তাই বৃহত্তর গোষ্ঠীগুলো-মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধসহ সবার কাছে রাখাইনদের জীবনধারা তুলে ধরতে পরের জীবনেও তিনি তাদের নিয়ে লিখেছেন।

ছাত্রজীবনের পর কর্মজীবনে নিজের সম্প্রদায়কে নিয়ে তার উল্লেখযোগ্য লেখা?
‘রাখাইন কথোপকথন’, ‍‘রাখাইন সংস্কৃতি ও সাহিত্য’, ‘রাখাইন রত্ন’, ‘রাখাইন জাতির  ইতিবৃত্ত’, ‘রাখাইনদের জীবনধারা’ তার অন্যতম লেখা বই। রাখাইন জাতির উন্নয়ন, তাদের মধ্যে স্বপ্ন ছড়ানো, তাদের সাহিত্যকে তুলে ধরা, এই ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জীবনধারা, পরিচয় অন্য জাতিদের কাছে তুলে ধরতে তিনি বইগুলো অনেক কষ্ট করে লিখেছেন। তিনি লিখতেন যাতে রাখাইনসহ অন্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো লেখার মাধ্যমে আরও উন্নত জীবনের নির্দেশনা পায়। নিজেদের উন্নত করতে পারে। নিজেদের কথা সবার কাছে বলতে পারে। তিনি অনেক রাত জেগে লিখতেন। বেশি রাত জেগে লেখার জন্য অনেক সময় বকেছি। তখন তিনি আরও উৎসাহিত হয়ে লিখেছেন।

বাইবেল নিয়ে কেন ডিপ্লোমা পাস করেছেন? ডিগ্রিটি পরে কীভাবে তার ও সমাজে কাজে লেগেছে?
অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই বাইবেলে ডিপ্লোমা করেছিলেন। ডিগ্রিটি সমাজের খুব বেশি কাজে লাগাতে না পারলেও অনেক সময়ই তিনি খ্রিস্টানদের গির্জায় গিয়ে ধর্মীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। বৌদ্ধ হয়েও খ্রিস্টানদের নির্দেশনা দিতে পেরে তিনি খুব গর্বিত হতেন। তিনি সব ধর্মীয় স্থানেই বাতি জ্বালাতেন, সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন।

আপনার সঙ্গে পরিচয়?
আমরা দুজনেই সাপ্তাহিক ‘বনভূমি’তে লিখতাম। তুমুল যৌবনের সেই সময়ই পরিচয়। তারপর ভালো লাগা, ভালোবাসার পর বিয়ে। আমাদের দুই পরিবারেরই এই বিয়েতে সম্মতি ছিল। লেখালেখিই আমাদের ভালোবাসার বাঁধনে জড়িয়েছে। এরপর তো তিনি আমার টানে আমাদের আবাস খাগড়াছড়িতে কক্সবাজার থেকে চিরকালের জন্য চলে এলেন। আমাদের দুটি সন্তান; দুই মেয়ে মেয়ে প্রিয়াংকা পুতুল ও চেন চেননু।

আপনিও বিখ্যাত-২০১৭ সালে ‘রোকেয়া পদক’ লাভ করেছেন।
সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে নারীর জাগরণ নিয়ে লেখায় আমি বেগম রোকেয়া পদক পেয়েছি। এই অমূল্য সম্মান পাওয়ার পেছনে আমার স্বামীর অনেক অবদান আছে। তিনি আমাকে লেখালেখিতে সহযোগিতা না করলে মোটেও এগোতে পারতাম না। তার মতো লেখক ও গবেষককে স্বামী হিসেবে পেয়ে লেখালেখির কাজে আগ্রহ আরও বেড়েছে। তিনি না হলে হয়তো আমি রোকেয়া পদক পেতে পারতাম না। লিখেছি যাতে নারীরা সব কাজে উৎসাহ পান, এগিয়ে আসেন। অবহেলার শিকার যাতে তাদের না হতে হয়। আমার সর্বশেষ প্রকাশিত বই ‘বৌদ্ধ ধর্মে নারীর অবদান’। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় প্রকাশিত হয়েছে।

তার কোনো অপূর্ণ স্বপ্ন আছে?
‘রাখাইন সংস্কৃতি ও সাহিত্য’ আরও বড় করে প্রকাশের জন্য পুরো পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছিলেন। তবে সেটি প্রকাশ করে যেতে পারেননি। আগ্রহী কোনো প্রকাশক তার স্বপ্নপূরণ করতে এগিয়ে আসবেন বলে আমরা আশা করি। তাতে আমার স্বামীর আত্মা শান্তি পাবে।  

কক্সবাজার, খাগড়াছড়িসহ রাখাইন লোকসাহিত্যে তার অবদান?
‘রাখাইন সংস্কৃতি ও সাহিত্য’, ‘রাখাইন রত্ন’ বই দুটিতে রাখাইন জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, চাওয়া পাওয়া, দাবি ইত্যাদি উল্লেখ করেছেন বলে রাখাইনদের জন্য বই দুটি অমূল্য, গুরুত্বপূর্ণ। রাখাইনদের সমাজব্যবস্থা দেখে তাদের কল্যাণের জন্য তিনি এই দুটি বই লিখেছেন।

তাদের জীবনে, সংস্কৃতিতে তিনি কেমন ছিলেন?
মংছিন রাখাইনদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। রাখাইনদের জীবনধারা, তাদের সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে তিনি চিন্তা করতেন। কীভাবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীদের সঙ্গে তারা তারা তাল মিলিয়ে চলবেন সে ভাবনা ভেবে কাজ করতেন। তাদের বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে চেষ্টা করতেন। জীবনমান উন্নয়নের মাধ্যমে তারা যেন টিকে থাকেন, সে জন্য তিনি কাজ করেছেন। লেখালেখির মাধ্যমে তিনি তাদের জীবন, সমাজ ও বাস্তবতা বোঝাতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন লেখার কোনো বিকল্প মানুষের জীবনে নেই। লেখক হিসেবে যেমন তিনি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর কাছে প্রিয় ছিলেন, তেমনি মানুষ হিসেবেও সবার ভালোবাসা কুড়িয়েছেন। রাখাইনের নিয়ে লিখলেও বাংলাদেশের সব আদিবাসী গোষ্ঠীর জীবন ও সংগ্রামের বোধ, বার্তা তার প্রতিটি বইতে আছে।

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর উৎসব ও সংস্কৃতি নিয়ে তার কোনো বই আছে?
‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনযাপন’ এই পার্বত্য জেলাগুলোর সব নৃ-গোষ্ঠীকে নিয়ে লেখা তার বই। এই বইটি তিনি প্রকাশ করে যেতে পারেননি। অপ্রকাশিতই আছে। তবে বইটি প্রকাশের সামর্থ্য আমাদের নেই। তিনি তার লেখা প্রতিটি বই নিজে সম্পাদনা করেছেন। রাত জেগে বই লিখতেন, সম্পাদনা করতে। মন-মেজাজ যখন ভালো থাকত, তখন বই লিখতেন। অবসর ছিল তার সম্পাদনার সময়। ‘রাখাইন জাতির ইতিবৃত্ত’ লেখার পেছনে তিনি সবচেয়ে বেশি সময় ও সংগ্রাম ঢেলে দিয়েছেন। কারণ একটি আলাদা জাতির ইতিবৃত্ত লেখা সহজ নয়। এটি তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বই।

বইগুলো থেকে তার ও পরিবারের প্রাপ্তি?
বই লিখে তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পদক একুশে পদক লাভ করেন। এটি আমাদের এবং এই দেশের মানুষের গর্ব। তারপর থেকে বাংলাদেশের সব মানুষ তাকে এক নামে চেনেন ও সম্মান করেন।

জাতীয় জাদুঘরেও তো তার দান আছে?
জাতীয় জাদুঘরে তিনি নিজের চশমা, যে পোশাকগুলো পরতেন, সেই রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকগুলো, তার লেখা বইয়ের সেট সবইদান করেছেন। মনে করেছিলেন, যখন তিনি থাকবেন না; কেউ জাদুঘরে গেলে তাকে এগুলো দেখে মনে করবেন, তার জাতির কথা ভাববেন। জাতীয় প্রতিষ্ঠানে দানগুলো করে তিনি খুব খুশি হয়েছেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে খুব ভালোবাসতেন। তাকে আদর্শ মানতেন।  

সাংবাদিকতা জীবন?
তিনি রাখাইন সাময়িকী, সাপ্তাহিক বনভূমি ও দৈনিক গিরিদর্পণ-এ সাংবাদিকতা করেছেন। স্থানীয় নানা বিষয় তুলে এনেছেন। এই পত্রিকাগুলোতে লিখে নিজেকে গড়ে তুলেছেন।

খুব কম বয়সে মারা গেলেন কেন?
তার ফুসফুসে ক্যানসার হয়েছিল। ব্রেইন টিউমার রোগেও আক্রান্ত ছিলেন। রোগের চিকিৎসা করানোর সময়ও পাননি। তার শরীরে যে রোগগুলো বাসা বেঁধেছে, কাউকে তিনি বুঝতেও দেননি। ফলে আমরা যেমন, যারা তাকে ভালোবাসতেন; তারা তাকে সাহায্য, রোগমুক্ত করতে পারেননি। তার চিকিৎসায় কেউ সাহায্য-সহযোগিতা করার সময় পাননি। নিজের বাড়িতে ৫৮ বছর বয়সে ৭ সেপ্টেম্বর তিনি দেহত্যাগ করেছেন।

(১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, খাগড়াছড়ি)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত