জাতি, ধর্ম, ভাষা, বর্ণ এবং লিঙ্গ পরিচয়ের ভেদাভেদ দূর করে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা এবং শোষণ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অঙ্গীকার। এজন্য স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানেও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কাঠামোতেই ধর্মীয় অনুশাসনের ভিত্তিতে বিভিন্ন ধর্ম, সম্প্রদায় ও নৃগোষ্ঠীর জন্য আলাদা উত্তরাধিকার ও পারিবারিক আইন চালু রাখা হয়েছে। এ কারণে জাতি-ধর্ম-সম্প্রদায় ভেদে জনগণের নানা অংশের মধ্যে নানা ধরনের বৈষম্য রয়ে গেছে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই এসব বৈষম্যের সবচেয়ে বড় শিকার নারী। বিয়ে এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকারের প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি অধিকার বঞ্চিত হিন্দু নারীরা। মুসলিম ও খ্রিষ্টান নারীদের তুলনায়ও হিন্দু নারীর বঞ্চনা যেন সীমাহীন।
হিন্দু ধর্মের প্রথায় নারীর বিয়ে বিচ্ছেদের অধিকার না থাকার কারণে মারাত্মক বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন দেশের অগণিত হিন্দু নারী। স্বামী দুশ্চরিত্র, লম্পট, নির্যাতনকারী, কিংবা নিরুদ্দেশ যাই হোন না কেন স্ত্রীর বিয়ে বিচ্ছেদের কোনো অধিকার বা সুযোগ নেই। একটা আইন অনুযায়ী, আলাদা থাকার সুযোগ থাকলেও লোকলজ্জার ভয়ে অনেক নারীই দিনের পর দিন মুখবুজে পড়ে থাকেন স্বামীর সংসারে। অন্যদিকে হিন্দু পুরুষের স্ত্রীর অনুমতি না নিয়েই একাধিক বিয়ে করার সুযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, স্বামীর মৃত্যুর পর হিন্দু বিধবারা স্বামীর সম্পত্তির ভাগ পান না। এ কারণে অনেক বিধবাকেই আশ্রিতের মতো বাস করতে হয় মৃত স্বামীর বাড়িতে। এক্ষেত্রে বাবার সংসারের দ্বারস্থ হলেও কোনো লাভ নেই। কেননা, স্বামীর সম্পত্তির মতোই পিতার সম্পত্তিতেও হিন্দু নারীর কোনো উত্তরাধিকার নেই। পিতা বা স্বামীর সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর কেবল আজীবন ‘ভোগের অধিকার’ রয়েছে, কোনো বিধি-বিধান দ্বারা সুনির্দিষ্ট না থাকায় এটি অধিকারহীনতারই নামান্তর।
স্বামী নির্যাতন করলে কিংবা স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হলে হিন্দু নারীর আলাদা বসবাস ও ভরণপোষণের বিষয়ে ১৯৪৭ সালের একটি আইন রয়েছে। এ আইনের আশ্রয় নিয়ে তারা সালিশের মাধ্যমে আলাদা বসবাস করে স্বামীর কাছ থেকে নিজের ও সন্তানের ভরণপোষণ আদায়ের চেষ্টা করতে পারেন। হিন্দু নারীর সংকট আরও বাড়ার কারণ হিন্দু প্রথায় বিয়ের নিবন্ধন না থাকা। হিন্দু বিয়ে নিবন্ধন করতে সরকার ২০১৩ সালে একটি আইন করলেও সেটি বাধ্যতামূলক নয়, ঐচ্ছিক। শিক্ষিত ও উচ্চবিত্তদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা থাকলেও নিম্নবিত্ত হিন্দু নারীরা এ সমস্যার বড় শিকার। হিন্দু পুরুষ বিয়ের কথা অস্বীকার করলে, নারীর পক্ষে তা প্রমাণ করা অনেক ক্ষেত্রেই দুরূহ হয়ে ওঠে। ফলে, একদিকে নিবন্ধন না থাকায় বিয়ে প্রমাণ করতে না পারার সংকট; অন্যদিকে বিয়ে বিচ্ছেদের অধিকার না থাকায় সারাজীবন স্বামীর গলগ্রহ হয়ে থাকার সংকটে হিন্দু নারীরা অসহায়।
ব্রিটিশ ভারতে ১৯৪১ সালে হিন্দু ব্যক্তিগত আইনকে বিধিবদ্ধ করার জন্য স্যার বি এন রাওয়ের সভাপতিত্বে ‘হিন্দু ল কমিটি’ গঠন করা হয়, যা ‘রাও কমিটি’ নামে পরিচিত। স্বাধীন ভারতে ১৯৫৬ সালে ‘রাও কমিটি’র সুপারিশের ভিত্তিতে সমগ্র ভারতের জন্য অভিন্ন উত্তরাধিকার আইন ‘দ্য হিন্দু সাকসেশন অ্যাক্ট’ পাস হয়। যার মাধ্যমে ভারতের সব অঞ্চলে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তিতে নারীর মালিকানা স্বীকৃত হয়। কিন্তু পাকিস্তান আমলের ধারাবাহিকতায় স্বাধীন বাংলাদেশেও আগের আইনটিই রয়ে গেছে। ভারত পরে ১৯৫৬ সালের আইন সংশোধন করে সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে; যা ২০০৫ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সমগ্র ভারতের জন্য অনুমোদন দেয়। সম্প্রতি প্রতিবেশী দেশ নেপালও হিন্দু আইন সংস্কার করে সম্পত্তিতে নারীর অধিকার এবং বিয়ে ও বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারীর অধিকার রক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে।
দেশের মানবাধিকার কর্মী এবং নারী আন্দোলন কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্য সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে না পারাই সমাজে নারীর প্রতি নানাবিধ বৈষম্যের অন্যতম বড় কারণ। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মুসলিম পারিবারিক আইনে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করার বিষয়ে কথা বলেছেন। তিনি সম্পত্তির উত্তরাধিকারে নারীকে বঞ্চিত না করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে বিষয়টি সুরাহার পথ খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই কথা হিন্দু নারীর অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। কেননা, মুসলিম নারীরা পিতা ও স্বামীর সম্পত্তিতে একটা নির্দিষ্ট ভাগ পেলেও হিন্দু নারী কোনো ভাগই পায় না। আবার মুসলিম বিয়েতে শর্তসাপেক্ষে নারীর তালাক বা বিচ্ছেদের অধিকার থাকলেও হিন্দু নারী কোনো অবস্থাতেই বিয়ে বিচ্ছেদ চাইতে পারেন না। নারী-পুরুষের এই বৈষম্য দূর করতে হিন্দু ধর্মীয় বিয়ে ও উত্তরাধিকার আইন সংস্কারের বিষয়টিকে অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করতে না পারলে মুক্তিযুদ্ধের কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অধরাই রয়ে যাবে।
