ভারতীয় গণতন্ত্রের গোড়া থেকেই দ্বিমাত্রিক ঘুণপোকার আক্রমণ

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:৩৯ পিএম

ভারতীয় শাসনযন্ত্রে বিরাট গুণগত পরিবর্তন ঘটার পরও রাজনীতিমনস্ক শিক্ষিত শ্রেণির মানুষ, কিছু ব্যতিক্রম বাদে নড়েচড়ে বসছে না। তাদের উপলব্ধি ‘সব ঠিক হ্যায়’। সেই সুযোগে গেরুয়া শাসনযন্ত্র ঝড়ো হাওয়ার বেগে গণতন্ত্রকে স্বৈরতন্ত্রে পরিণত করে নির্বিবাদে স্বৈরাচারের রথ চালিয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তি থেকে সমষ্টি এই স্বৈরাচারের শিকার। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে ব্যক্তি, দল ও সম্প্রদায় কেন্দ্র করে শাসনযন্ত্রের অনাচার চলছে। নেপথ্যে সামরিক শক্তি। আর চলছে নির্বাচিত সদস্য নিয়ে টানাহেঁচড়া, বিকিকিনি তথা হর্স ট্রেডিং চলছে, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের বিধানসভার সদস্যদের কেন্দ্র করে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার ঘোড়া পথেই জলকাদায় মাখামাখি হয়ে মহাসমস্যায় বিজেপির সঙ্গে রাজনৈতিক মোকাবিলায় রত। একই সমস্যায় রয়েছে রাজ্য থেকে রাজ্যে জাতীয় কংগ্রেস।

 

বিজেপি যখন তাদের গেরুয়া উত্তরীয় গায়ে চড়িয়ে ভারতীয় লোকসভার নির্বাচনে মাত্র দুটো আসনে জয়ী হয়, তখন তাদের কেউ পাত্তা দেয়নি। কেউ ভাবতে পারেনি, অচিরে তারা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে, দিল্লির সিংহাসনে বসবে। এটা ছিল রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার অভাব। লক্ষ করলে দেখা যেত যে দুটো আসন পেয়ে ওরা হাল ছেড়ে দেয়নি, হতাশ হয়নি, তৎপরতা কমায়নি। বরং উঠেপড়ে লেগেছে নির্বাচনে সুফল তৈরি করতে। জাতীয় কংগ্রেসের ভুলভ্রান্তি ও দুর্বলতাগুলোকে ওরা কাজে লাাগিয়েছে যথাযথ প্রচারেÑ বিশেষভাবে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, গণতান্ত্রিক সুশাসনের ঘাটতি ইত্যাদি নিয়ে ওদের প্রচারণা ছিল নিরন্তর।

 

দুই. রাজনৈতিক বিশে^ ভারত বৃহৎ গণতন্ত্রী রাষ্ট্র হিসেবে সুপরিচিত এবং প্রশংসিত। কিন্তু ভারতীয় রাষ্ট্রতন্ত্র ও রাজ্যশাসনের এই অভিধা কতটা সঠিক তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়, বিশেষভাবে অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার বিচার-বিশ্লেষণে। গ্রিক দার্শনিকদের সংজ্ঞায়িত ‘ডেমোস’ (উবসড়ং) তথা জনগণের শাসনতন্ত্র বা লিংকনীয় গণতন্ত্রের আদর্শের সংজ্ঞা বিচারে প্রথমেই পূর্বোক্ত দাবি খারিজ হয়ে যায়। এটা বিস্ময়কর যে ভারতীয় স্বাধনীতা তথা মুক্তিসংগ্রামের কালে সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা জওহরলাল নেহরুর প্রধানমন্ত্রিত্বের শাসনামলের শুরুতে ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদ নস্যাৎ করতে পশ্চিমবঙ্গে কালা আইনের বন্দিদের মুক্তি বা অনাহারে ক্লিষ্টদের খাদ্যের দাবিতে ভুখা মিছিলে পুলিশের গুলিতে প্রতিবাদীদের মৃত্যুতে গণতান্ত্রিক শাসনের ফাঁকা বুলি স্পষ্ট হয়ে ওঠে ও  ওমেকি গণতন্ত্রের মুখোশটা খুলে যায়।

 

ভারতীয় গণতন্ত্র নিয়ে আলোচনায় এখন যদি কেউ  আক্ষেপের সুরে লেখেন : ‘বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ভারতীয় গণতন্ত্র’ তখন সেই আত্মসমালোচনার প্রসঙ্গে বলতে হয় ভারতীয় গণতন্ত্র ঘুণপোকার দ্বিমুখী চরিত্র তো আজকের নয়Ñ তা এক ধরনের গোড়ার গলদ। গলদ শ্রেণিগত চরিত্রের শাসনের কারণে। সে শ্রেণি স্থানীয় বুর্জোয়া (বৃহৎ শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, সামন্ত স্বার্থ এবং এলিট মধ্যবিত্ত, পেশাজীবী শ্রেণির) স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারীদের সমন্বয়ে গঠিত সেখানে ডেমোস জনগণের কোনো অস্তিত্ব নেই।

এককথায় অগণতন্ত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়বাদÑ এই দুই চরিত্র নিয়ে স্বাধীন ভারতে (১৯৪৭ পরবর্তী সময় থেকে) ঘুণপোকায় কাটা গণতন্ত্রের পরিচিতি নিয়ে ভারত ভার্টিকাল আর্থ-অগ্রগতির উন্নয়নের পদক্ষেপে এগিয়েছে। ব্রিটিশ ভারতে নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রামে তৎপর জাতীয় কংগ্রেস স্বাধীন পরিবেশে রাজনৈতিক বটবৃক্ষের মর্যাদা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে তার গায়ে দুর্নীতিসহ ভ্রষ্টাদর্শের ঘুণপোকার ক্ষয়-অবক্ষয় প্রধান হয়ে ওঠা সত্ত্বেও তা কর্তাব্যক্তিদের চোখে পড়েনি। অথবা এগুলোকে তারা গুরুত্ব দেয়নি। শাসনক্ষমতায় থাকার জন্য বৈধ-অবৈধ যা যা করণীয় সবই তারা করেছেন ‘ন্যায়-অন্যায় জানিনে জানিনে/শুধু তোমারে জানি’। সেই তুমিটা হলো শাসনক্ষমতা, সেই সঙ্গে লোভ-স্বার্থপরতা। এগুলো তারা গ্রাহ্য না করলেও জনগণ লক্ষ করেছেন, কারণ তারা ভুক্তভোগী। বিপুল সম্পদের বিপরীতে ন্যূনতম ব্যবস্থায় জীবনযাপন ক্ষোভের কারণ হয়ে ওঠে। আদর্শ, সততা তখন আর বিচার্য বিষয় হয়ে থাকে না। অন্যদিকে ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ যারা তাদের স্থায়ী ভোট ব্যাংকÑ তারা দেখছে তাদের অসহায়ত্ব, লেনদেনের নীতি অগ্রাহ্য, কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। বরং ‘পরিচ্ছিন্ন রাজনীতিক’ নামে পরিচিত প্রধানমন্ত্রী দিব্যি আদালতের নির্দেশ অমান্য করে বাবরি মসজিদ প্রাঙ্গণে বিজেপিকে খুশি করতে রামমন্দিরের শিলান্যাস করেছেন। একবারও ভেবে দেখেননি এতে করে হিন্দুত্ববাদীরা উৎসাহিত হবে, ভোট বিজেপির বাক্সেই যাবে, রামমন্দির যাদের অন্বিষ্ট। কী চমৎকার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা!

 

এর আগে তাদের অগ্রজদের ভূমিকা আরও ন্যক্কারজনক। বাবরি মসজদ ধ্বংসের রথযাত্রায় কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাওয়ের কোনো মাথাব্যথা ছিল না, বাধা দেওয়া তো দূরের কথা। তার যুক্তি ছিল, বিষয়টি কেন্দ্রের এখতিয়ারভুক্ত নয়, ওটা রাজ্য (প্রাদেশিক) সরকারের দায়। উত্তর প্রদেশীয় মুখ্যমন্ত্রীর নাকের ডগায় বাবরি মসজিদের ছাদে আদভানি, উমা ভারতী প্রমুখের বৈনাশিক প্রেত নৃত্য দৃশ্যমান হয়েছিল। রথাযাত্রার সেবকদের লৌহ আঘাতে বাবরি মসজিদ ধ্বংস মৃত্যু ঘটেছিল ভারতীয় গণতন্ত্রের।

 

আর সর্বোচ্চ আদালতকে যেখানে পরিত্রাণের ও সুবিচারের সর্বশেষ আশ্রয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়, এক্ষেত্রে তারাও নীরবÑ ধ্বংসলীলা শেষে মামলা ঝুলে আছে, থাকবে অন্তহীন সময় ধরে। মানুষ এসব দেখছে, ভাবছে, হিন্দুত্ববাদেই ভারতীয় রাজনীতি ও মতাদর্শের শেষ গতি, তাদের গণতান্ত্রিক ভোট-ভাবনা যে সে পথেই পরিচালিত হবে সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। আরেকটি অতি ছোট্ট সামাজিক উদাহরণ উচ্চ আদালত সম্পর্কে। আমরা জানি, একালে বিশেষভাবে উপলব্ধি করে থাকি, ১৯৪৭-এর দেশভাগটি মূলত সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপ্রসূত এবং বিদেশি শাসকদের স্বার্থবাহী চাতুর্যের

কৃত্রিম পরিণাম। অস্বাভাবিক ও কৃত্রিম বিভাজন নিম্নবর্গীয় জনতার জন্য চরম দুর্দশার কারণ। সংগত কারণেও কাউকে সীমান্ত অতিক্রম করতে হয়। তবু গুলিবিদ্ধ কিশোরীর লাশ কাঁটাতারে ঝুলেই থাকে (প্রতীকী অর্থে) হাইকোর্টে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণে। অন্তহীন প্রতীক্ষা থাকে ফেলানির স্বজনদের সুবিচারের জন্য।

 

তিন. রাজনীতি, প্রশাসন, আমলাতন্ত্র, উচ্চ আদালত প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়নীতি, সততা, নৈতিকতা, সর্বোপরি সুশাসন গণতন্ত্রী-জাতীয়তাবাদী  (সেক্যুলার) নামের কংগ্রেসি শাসনে এতটা বিনষ্ট, এতটা দুর্নীতিগ্রস্ত, যে এতটা একদেশদর্শী, এতটা দলবিশেষে স্বার্থপর ও নীতিহীন যে ভোটপাগল মানুষ গণতন্ত্র নিয়ে দিশেহারা, বেহাল অবস্থায়। তারা স্বভাবতই পরিবর্তনকামী। তর্কবিতর্কে অবশেষ প্রশ্ন- কীটগ্রস্ত বটবৃক্ষ কংগ্রেস আদ্যে কি জনবান্ধব, ন্যায়নিষ্ঠ? সংখ্যালঘুদেরও একাংশের ভাবনা, কংগ্রেস শাসন কি আদপেই সেক্যুলার, মুসলিম স্বার্থে আগ্রহী? অন্যদিকে এসব নিয়ে প্রচার-অপপ্রচারের মুখে, ধর্মীয় চেতনার উনকানির মুখে ভোটার জনতার ভাবনা: কোথাও প্রকৃত গণতন্ত্র নেই, থাকলেও তা নিয়ে কি ধুয়ে খাব?

 

আসুক না ভিন্ন রাজনীতির সংগঠন বিজেপি, উন্নয়ন ও ন্যায়নীতির ইশতেহার নিয়ে। দেখাই যাক না তারা ভাগ্যের চাকা বদলাতে পারে কিনা। অভিযোগÑ তারা হিন্দুত্ববাদী। আপাতত হিন্দুত্ববাদেও যদি স্বার্থসিদ্ধি, কার্যসিদ্ধি হয়, তাহলে ক্ষতিটা কোথায়? হতেও পারে এমন জনভাবনা কংগ্রেসকে বর্জন করেছে। তা নাহলে কংগ্রেসের চিরকালীন আমেথি আসনের দুর্গে স্বয়ং গান্ধী পরিবারের কনিষ্ঠ প্রতিনিধি রাহুল ভোটে হারেন? অবিশ্বাস্য ঘটনা।

 

ধীরে ধীরে দুই আসন থেকে উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধির মাধ্যমে নমনীয় অটল বিহারি বাজপেয়ির আমল অতিক্রম করে কট্টর হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদির বিজেপির ভোটে ভারত বিজয়। তারা এক মেয়াদে গেরুয়া পতাকা উড়িয়েছে দিল্লির তখতে তউসে। কিন্তু ঘটনা হলো তারাও নানাভাবে প্রথম মেয়াদে নানা অভিযোগে বিতর্কিত। গণতন্ত্র ক্রমশ অভিযুক্ত। কংগ্রেসসহ বামপন্থিরা আশাবাদী। এবারের ভোটে তাদের সিংহাসন টলবে। কিন্তু না, জনতা এখনো পূর্বস্মৃতি ভোলেনি। হিন্দুত্ববাদ তাদের জন্য সমস্যা নয়, মতাদর্শও তাদের জন্য বড় বিবেচনার বিষয় নয়। বড় বিষয় সাধারণ মানুষ, ভোটারদের অর্থনৈতিক স্বার্থ যা বারবার কংগ্রেসি শাসনামলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

তাই সব হিসাব-নিকাশ ভুল করে দিয়ে বিজেপির অবিশ্বাস্য দ্বিতীয় বিজয়। এবং এ বিষয়ে মত্ত বিজেপি অবিশ্বাস্য ঘটনার নায়ক। মোদি অমিতশাহী নায়কীয়নার আগ্রহী দর্শক কাশ্মীরে, আসামে এবং ভারতের সর্বরাজ্যে। হিটলারি স্বস্তিকা শক্তিতে ঘোষণা অনুপ্রবেশকারীদের বিতাড়ন চাই। তাতেই গণতন্ত্র রক্ষা পাবে, রক্ষা পাবে হিন্দুত্ববাদী সনাতন ভারত। পাকিস্তান ও পাকিস্তানবাদীদের শায়েস্তা করতে হবে যারা ভারতমাতার অঙ্গচ্ছেদ ঘটিয়েছে। ‘জয়হিন্দ’ তাদের কাছে ভিন্ন অর্থে সত্য। ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ফ্যাসিস্ট ধারার এসব শক্তিমান ঘোষণা জনতাদেবীকে প্ররোচিত করছে। আপাতত এসব ঘিরে সাময়িক উন্মাদনা। এ অবস্থায় ভারতীয় গণতন্ত্রকে ‘চ্যালেঞ্জের মুখে’ না পড়ে উপায় আছে? চমকপ্রদ ঘটনা যে গণতন্ত্র হরণ সত্ত্বেও কাশ্মীর-আসাম ও অভ্যন্তরীণ বহু প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মহল নীরব, নীরব বাংলাদেশ। সবাই আপাতত দর্শকের ভূমিকায়। নিরপেক্ষ ভারতীয় সাংবাদিকরা তাদের যুক্তিবাদী তীক্ষè কলমে সোচ্চার। চিদাম্বরম প্রতিবাদ করে এমন ফ্যাসাদে যে, এরপর অন্যরা নির্বাক। সর্বোচ্চ আদালত কাশ্মীর কাটাছেড়ায় নীরব। ভারতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বা গণতন্ত্রের পক্ষে প্রতিবাদী শক্তি অস্তিত্বহীন বলেই মনে হচ্ছে। এ অবস্থায় যত অন্যায়ই হোক ভোটার-জনতা ভাবতেই পারে সঠিক বাক্সে ভোট দিয়েছি, জয়তু বিজেপি। মুসলিম সমাজ ১৯৪৬-এর বিপরীত ধারায় বিভ্রান্ত। ভারতে ‘ঈশ^র-আল্লাহ তেরিনাম’ গুলিবিদ্ধ। আর গণতন্ত্র দ্বিমাত্রিক ঘুণপোকায় আক্রান্ত শুরু থেকেই। বিশদ আলোচনায় তা স্পষ্ট হবে।

 

লেখক

ভাষাসৈনিক এবং কলামনিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত