সংবাদিকদের নতুন ডিএমপি কমিশনার

প্রয়োজনে আমিই ওসিগিরি করব

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:৪৬ এএম

জনহয়রানি বন্ধ করতে প্রয়োজনে নিজেই থানায় গিয়ে ওসিগিরি করবেন বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, ‘থানায় জনহয়রানি বন্ধ করে জনসাধারণকে ভালো সেবা দেওয়া আমার অগ্রাধিকার। আমি যেদিন দায়িত্ব নিয়েছি সেদিনেই দায়িত্বপ্রাপ্ত

সব কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছি। এরপরও থানায় যারা কাজ করছেন তাদের আচরণে যদি পরিবর্তন না হয়; তাহলে আমার চিন্তাভাবনা আছে আমাদের সিনিয়র অফিসার যারা আছেন তারা থানায় গিয়ে ওসির দায়িত্ব পালন শুরু করেন। আমি নিজেই থানায় গিয়ে ওসিগিরি করব। ডিসি (উপকমিশনার), এডিসি যারা আছেন তারা সপ্তাহে অন্তত এক দিন থানায় যাবেন, মানুষের কথা শুনবেন।’

গতকাল রবিবার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ ঘোষণা দেন। গত শুক্রবার কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর গতকাল প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন ডিএমপি কমিশনার। এ সময় তিনি ডিএমপির থানাগুলোতে জনসেবা নিশ্চিত করা, ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জঙ্গিবাদ, মাদক ও পুলিশকর্র্তৃক জনহয়রানি নিয়ে কথা বলেন।

সংবাদ সম্মেলনে শুরুতেই ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘গত ১০ বছরে পুলিশ জনগণের আস্থা অর্জন করেছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে থাকায় স্থিতিশীলতা এসেছে। দেশের বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে। দেশের জিডিপি বেড়েছে। কমিশনার হিসেবে প্রথমেই আমি যে বিষয়টির নিশ্চয়তা দিতে চাই; তা হচ্ছে থানায় গিয়ে অপরাধের শিকার মানুষ যেন হয়রানি ছাড়া জিডি বা মামলা করতে পারে সেই ব্যবস্থা করব। থানা থেকে ফেরার পথে যেন মানুষের মধ্যে এ আস্থা জন্মায় যে, আমি সম্পদ ও সম্মান ফিরে পাব। ন্যায়বিচার পাবÑ এই বিশ্বাস নিয়ে সাধারণ মানুষ যেন থানা থেকে ফেরত আসতে পারে।

শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মানুষের মধ্যে পুলিশভীতি দূর করতে কাজ করব। নিরপরাধ মানুষ যাতে থানায় গিয়ে হয়রানি ও পুলিশের চাঁদাবাজির শিকার না হয়, সেবার জন্য আর্থিক সুবিধা দিতে না হয় তার জন্য কাজ করব। কমিউনিটি পুলিশিং ও বিট পুলিশিং জোরদার করব। কোনো পুলিশ কর্মকর্তার অন্যায় আচরণের জন্য ছাড় দেওয়া হবে না এমনকি অফিসাররাও ছাড় পাবেন না।’

কমিশনার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানোর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শুধু সার্জেন্ট আর টিআইদের (ট্রাফিক ইন্সপেক্টর) ওপর নির্ভর করে থাকলে চলবে না। ট্রাফিকের ডিসি, এডিসি যারা থাকবেন তারা অন্তত সকালে অফিস সময়ে তিন ঘণ্টা এবং বিকেলে অফিস ছুটি হওয়ার সময় তিন ঘণ্টা রাস্তায় থেকে ডিউটি করতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে আমি অফিসারদেরও আট ঘণ্টা করে রাস্তায় ডিউটি নির্ধারণ করে দেব।’

তিনি বলেন, ‘যানজট পুলিশ একার পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। উন্নয়ন কাজ চলছে, রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি চলছে, অপ্রত্যাশিতভাবে সড়ক অবরোধ হয়, গার্মেন্টস শ্রমিক ও ছাত্ররা রাস্তায় বসে যায়। এগুলোও মাথায় রাখতে হবে। পরিস্থিতি যাই হোক, ট্রাফিক পুলিশের কারও দায়িত্ব পালনে অবহেলা বরদাশত করা হবে না।’

কমিশনারকে প্রশ্ন করা হয় ঢাকার বিভিন্ন থানার ওসি ঘুরেফিরে ঢাকাতেই থাকছেন। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগও রয়েছে। তারপরও পুলিশের ডিসি ও এডিসিদের বদলি করা হলেও তাদের কেন বদলি করা হয়নি? এ প্রসঙ্গে কমিশনার বলেন, ‘ডিএমপির থানাগুলো দেশের অন্যসব সাধারণ থানার মতো নয়। এখানে থানা চালাতে গেলে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন রয়েছে। ডিএমপিতে কাজ করার কৌশল জানা না থাকলে সমস্যা তৈরি হয়। এখানে কাজের ধরন আলাদা। অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের এক থানা থেকে অন্য থানায় ওসি করায় আইনগত বাধা নেই। এমন অভিযোগ যদি ওঠে তিনি ওই থানায় এই বাণিজ্য করে গেছেন, ওই থানায় গিয়ে আবার এই বাণিজ্য করছেন, জনসাধারণের সঙ্গে হয়রানিমূলক আচরণ করছেন তাহলে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোনো পুলিশের অসদাচরণের বিরুদ্ধে ছাড় দেওয়া হবে না। পুলিশের অসদাচরণ ও হয়রানির বিষয়ে আইজিপির তত্ত্বাবধানে আলাদা একটি সেকশন কাজ করে। ঢালাওভাবে না বলে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে তদন্ত করে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জঙ্গিবাদ সম্পর্কে তিনি বলেন, উগ্রবাদ এমন একটি বিষয়, কেউ একবার এই মতবাদে বিশ্বাস করলে সহজেই তার থেকে বেরিয়ে আসা যায় না। নতুন করে যাতে কেউ উগ্রবাদে না জড়াতে পারে আমরা সে বিষয়ে কাজ করছি। আমাদের গোয়েন্দা ইউনিট কাজ করছে। আর কারাগারে গ্রেপ্তার জঙ্গি যারা আছে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তারা যাতে মতবাদ থেকে সরে এসে স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে বেরিয়ে আসতে পারে সে বিষয়ে কাজ চলছে। তিনি আরও বলেন, পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আহলে হাদিসের লোকজন বেশি জঙ্গিবাদে জড়ায়। তাদের সুন্নি আলেম দিয়ে কাউন্সেলিং করলে হবে না। আহলে হাদিসের বিশেষজ্ঞ দিয়েই কাউন্সেলিং করতে হবে। জঙ্গিদের টার্গেট পুলিশ হওয়া সম্পর্কে শফিকুল ইসলাম বলেন, জঙ্গি হামলা এড়াতে পুলিশ প্রতিরোধমূলক ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।

মাদকের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি উল্লেখ করে কমিশনার বলেন, আমরা অভিযান করি মাদকের সরবরাহ চেইনের বিরুদ্ধে। এর মাধ্যমে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তাই যারা মাদকসেবী তাদেরই মাদক পরিহার করতে হবে। এতে মাদকের চাহিদা কমে যাবে, ব্যবসা বন্ধ হবে। পুলিশের কোনো সদস্য যদি মাদক কারবারির কাছ থেকে কোনো ধরনের সুবিধা নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় তাদের বিরুদ্ধেও মাদক কারবারির মতোই ফৌজদারি আইনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তারও গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যেতে হবে।

বংশালে একজন মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি দখলের পুলিশের সহযোগিতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় যে, ওই ঘটনার পর ডিসিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। কিন্তু ওসিকে বহাল রেখে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। এ বিষয়ে নতুন ডিএমপি কমিশনারের কথা, ‘কার দায় কতটুকু, তা বিবেচনা করা হয়েছে। আমি তদন্ত প্রতিবেদন দেখে ব্যবস্থা নেব।’

রাজনৈতিকভাবে পুলিশকে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিচয় দেখে কখন কে কী করেছে বলুন, কখন কী করা হয়েছে বলুন? পুলিশ আইনের মধ্যে থেকেই কাজ করে।’ নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় হেলমেটধারীদের হাতে সাংবাদিক নির্যাতন প্রসঙ্গে তার বক্তব্য, ‘তদন্ত রিপোর্ট দেখি আগে। অনেক পুরনো বিষয়।’

কমিশনার জেব্রা ক্রসিং ব্যবহারের বিষয়ে বলেন, জেব্রা ক্রসিং ও ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার করে রাস্তা পার হতে হবে। আমি নিজে বা আমাদের অফিসার কেউ রাস্তায় যাওয়ার সময় জেব্রা ক্রসিংয়ে দাঁড়াবেন। গানম্যানকে নামিয়ে দিয়ে জেব্রা ক্রসিং দিয়ে পথচারীদের পারাপারের সহায়তা করব। আমি সবাইকে এটা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছি।

সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম, মীর রেজাউল আলম, কৃষ্ণপদ রায়, মফিজউদ্দিন আহম্মেদ, আবদুল বাতেন, যুগ্ম কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহম্মেদ, আবদুর রাজ্জাক, আবদুল কুদ্দুস আমিন, ইমাম হোসেন, মাহবুব আলম ও মনির হোসেন, উপকমিশনার মাসুদুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত