ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অন্যতম সহযোগী সংগঠন যুবলীগে টালমাটাল অবস্থা বিরাজ করছে। অবৈধ ব্যবসাসহ রাজধানী ঢাকায় ক্যাসিনো পরিচালনার অভিযোগে ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হুঁশিয়ারি বার্তায় এ অবস্থায় পড়েছে যুব সংগঠনটি। এতে সংগঠনের অধিকাংশ নেতার ভেতরে কাজ করছে আতঙ্ক। ঢাকা মহানগর যুবলীগ উত্তর-দক্ষিণের অনেক নেতাই বিদেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছেন। তবে তারা যাতে বিদেশে না যেতে পারেন সেজন্য বিমানবন্দরে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোতে চলমান শুদ্ধি অভিযান আরও জোরদারের ইঙ্গিত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, ছাত্রলীগের পর যুবলীগ ধরেছি। একে একে সব ধরব। ক্যাসিনোতে যারা বিদেশি এনেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অবৈধ ক্যাসিনো কারবারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গত বুধবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। প্রভাবশালী এই নেতার গ্রেপ্তারের পরই মূলত সংগঠনে সবার মধ্যে ওই আতঙ্ক জেঁকে বসেছে। যুবলীগ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, তারা সংগঠনের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে আছেন। খালেদের মতো অন্যদের পরিণতি একই হয় কি না, তা নিয়ে সংগঠনের সবার ভেতরে ভয়ভীতি কাজ করছে। আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর দুজন সদস্য দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, পরিস্থিতি যেদিকে গেছে সেখান থেকে ফিরে আসার সুযোগ কম। ‘অ্যাকশন’ আরও চলবে।
বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠনটির ঢাকা মহানগরের দুই অংশের বর্তমান কমিটি থাকবে, না ভেঙে দেওয়া হবেÑ তা নিয়ে সংগঠনের অভ্যন্তরে চলছে ব্যাপক হিসাবনিকাশ। যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা সংগঠনের ভাবমূর্তির প্রশ্নে ইতিমধ্যে অভিযুক্ত নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সম্মত হয়েছেন। তবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, যে ‘অ্যাকশন’ শুরু হয়েছে তাতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নয়, প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভাপতি শেখ হাসিনা চান দুই অংশের কমিটি ভেঙে দিতে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গতকাল রাতে যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অন্তত যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণের কমিটি ভেঙে দেওয়া হতে পারে যেকোনো সময়। তারা বলেন, যেহেতু দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক গ্রেপ্তার হয়েছেন, অন্য নেতাদের বিরুদ্ধেও অবৈধ ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছেÑ সেক্ষেত্রে ভেঙে দিতে হবে কমিটি। ওই নেতারা বলেন, কমিটি ভেঙে দিতে হয়তো কয়েক দিন সময় নেওয়া হতে পারে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যেই কমিটি ভেঙে দেওয়া হোক সেই সিগন্যাল দিয়েছেন সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের। আওয়ামী লীগের ওই নেতারা আরও জানান, যুবলীগের কেন্দ্রীয় শীর্ষ এক নেতার সঙ্গে গত বুধবার এ নিয়ে কথাও বলেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা গণভবনে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি সবার প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন বলে জানিয়েছেন সেখানে উপস্থিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে দেশ রূপান্তরকে তারা বলেন, ‘কোনো নালিশ শুনতে চাই না। ছাত্রলীগের পর যুবলীগ ধরেছি। ইমেজ ধ্বংস করতে দেব না। সমাজের অসঙ্গতি এখন দূর করব। নীতি-আদর্শ নিয়ে সবাইকে চলতে হবে। সবার মাঝে আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। এখন আমি অপরাধী কাউকেই ছাড়ব না। দলের লোক হলেও না। উন্নয়ন অগ্রগতির প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী, দুর্নীতিবাজ কেউ রেহাই পাবে না। একে একে এসব ধরতে হবে। জানি কঠিন কাজ; কিন্তু আমি করব।’
গতকাল সন্ধ্যায় ছাত্রলীগের নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা তাদের সাংগঠনিক অভিভাবক আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গণভবনে যান। পরে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান জাহিদ তুষার সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
অনিয়মকারীদের কাউকে ছাড়া হবে না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ছাত্রলীগের পর এখন যুবলীগকে ধরেছি। সামাজিক যেসব অসঙ্গতি সেগুলো দূর করতে হবে। এই যে ক্যাসিনো নিয়ে মারামারি খুনোখুনি হবেÑ এগুলো টলারেট করব না। তিনি বলেন, আমি কষ্ট করে সব কিছু করছি দেশের জন্য। দেশের উন্নয়ন করছি। এর ওপর কালিমা আসুক সেটা আমি কোনোভাবে হতে দেব না। আমি কাউকেই ছাড়ব না। যদি কেউ বাধা দেয় কাউকে ছাড়া হবে না।
ক্যাসিনোতে যেসব বিদেশি কাজ করছে তাদের যারা এনেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্যাসিনোর সঙ্গে যেসব বিদেশি জড়িত, তারা এলো কীভাবে, তারা ভিসা পেল কীভাবে, তাদের বেতন দেওয়া হয় কীভাবেÑ ক্রেডিট কার্ডে না ক্যাশে। কে ভিসা দিয়ে আনল, সমস্ত কিছু তদন্ত করা হচ্ছে। সবই ধরা হবে।
যুবলীগের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়ামের এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, যুবলীগ ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ কমিটির মেয়াদ ইতিমধ্যে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এখন কোন প্রক্রিয়ায় দুই অংশের কমিটি ভেঙে দেওয়া যায় তা নিয়ে সংগঠনের ভেতরে আলোচনা চলছে। যুবলীগের ওই নেতা বলেন, সংগঠনের শীর্ষ নেতারা ভাবছেন অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে আপাতত পরিস্থিতি সামলে নেওয়া যায় কি না। পুরো কমিটি এখনই ভেঙে দেওয়া হলে যুবলীগ যে সুশৃঙ্খল সংগঠন হিসেবে এতদিন সুনামের সঙ্গে সংগঠন পরিচালনা করে আসছে তা ক্ষুণœ হবে। যদি অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয় তাতে সংগঠনের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি থাকবে। তাই দুই অংশের কমিটি ভেঙে না দিয়ে অপরাধীদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে চান যুবলীগের শীর্ষ নেতারা। তবে যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, তাতে কমিটি ভেঙে দেওয়াই উত্তম সিদ্ধান্ত।
কেন্দ্রীয় যুবলীগের এক সাংগঠনিক সম্পাদক দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংগঠনের অভিযুক্ত নেতাদের কী করা হবে সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ যাওয়ার আগে সংগঠনের শীর্ষ নেতারা সেই দিক-নির্দেশনা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ওই নেতা বলেন, হঠাৎ করে যুবলীগকে আলোচনায় নিয়ে আসা এক রকম ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন সংগঠনের শীর্ষ নেতারা। তাই আসল কারণ অনুসন্ধান করতে সংগঠনের নেতারাও কাজ করছেন। যদি ষড়যন্ত্র না হয়ে সত্যিই অপরাধ-অপকর্ম কেউ করে তাহলে যুবলীগ নিশ্চয়ই সাংগঠনিকভাবে যে ব্যবস্থা নেওয়ার তা নেবে।
