অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনা করার অভিযোগে অস্ত্র ও মাদকসহ গ্রেপ্তার হওয়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে গুলশানে তিনটি ও মতিঝিলে একটিসহ মোট চারটি মামলা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার র্যাব বাদী হয়ে রাজধানীর গুলশান ও মতিঝিল থানায় এসব মামলা করে। তার মধ্যে গুলশান থানায় মানি লন্ডারিং আইনে একটি, অন্য দুটি অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে করা হয়েছে। আর মতিঝিল থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনসহ দণ্ড বিধির অন্যান্য ধারায় একটি মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া অবৈধ ক্যাসিনো চালানোর জন্য ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের নামে আরও একটি মামলা করা হয়েছে।
এর মধ্যে অস্ত্র ও মাদক আইনে দায়ের করা মামলাগুলো পরিচালনা করবে পুলিশের গোয়েন্দ শাখা (ডিবি)। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত পৌঁনে ১১টার দিকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (ডিবি উত্তর) মশিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানান।
মশিউর রহমান বলেন, খালেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে দায়ের করা মামলার তদন্ত করবে ডিবি উত্তর। মামলাগুলো ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। খালেদকেও ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। এখানেই তার জিজ্ঞাসাবাদ হবে।
গত বুধবার রাতে গুলশানের বাসা থেকে খালেদ মাহমুদকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। এদিকে কমলাপুরে খালেদের নির্যাতন কক্ষে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। সেখান থেকে মদ, বিয়ার, বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে।
গুলশান বিভাগের উপকমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, তিনটি মামলার মধ্যে দুটি তদন্ত করবে গুলশান থানা পুলিশ। এর মধ্যে অস্ত্র আইনে করা মামলায় সাত দিন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে করা মামলায় সাত দিন করে মোট ১৪ দিনের রিমান্ড চেয়ে খালেদ মাহমুদকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মানি লন্ডারিং আইনে করা মামলাটি তদন্ত করবে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। তাদের কাছে মামলার সিডি (কেইস ডকেট) পাঠানো হবে। তারা চাইলে নতুন করে রিমান্ডে নিতে পারে।
অস্ত্র ও মাদক মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার পরিদর্শক (অপারেশন) আমিনুল ইসলাম জানান, রাত সাড়ে ৮টার পর খালেদ মাহমুদকে আদালতে নেওয়া হয়েছে। তিনি রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করেন, গ্রেপ্তার হওয়ার পর আসামি খালেদ মাহমুদ অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তার অন্য সহযোগীদের শনাক্ত, তাদের নাম-ঠিকানা জানা ও গ্রেপ্তারের স্বার্থে তাকে দুই মামলায় সাত দিন করে রিমান্ড প্রয়োজন।
ডিএমপির প্রসিকিউশন শাখার উপকমিশনার জসিমউদ্দিন বলেন, রাস্তায় যানজটের কারণে খালেদকে নিয়ে আদালতে পৌঁছতে অনেক সময় লাগে। রাতে অস্ত্র মামলায় চার ও মাদক মামলায় তিন দিন করে সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
আদালতে আসামির কয়েকজন আইনজীবী খালেদের রিমান্ড আবেদন খারিজ করে জামিন আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষ রিমান্ড চায়। আদালত উভয়পক্ষের যুক্তি-তর্ক শেষে দুই মামলায় সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।
র্যাব জানায়, গ্রেপ্তারের সময় খালেদের বাসা থেকে ৫৫৮ পিস ইয়াবা, লকার থেকে ১০০০, ৫০০ ও ৫০ টাকার বেশ কয়েকটি বান্ডিল উদ্ধার করা হয়। সেগুলো গণনার পর ১০ লাখ ৩৪ হাজার টাকা পাওয়া যায়। এছাড়া ডলারেরও বান্ডিল পাওয়া যায়। টাকায় তা ৫-৬ লাখ টাকা হবে বলে জানায় র্যাব। এছাড়া তার কাছ থেকে একটি পিস্তল, একটি শটগান ও একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে একটি অস্ত্রের লাইসেন্স ছিল না। অন্য দুটি লাইসেন্সের শর্তভঙ্গ করে রাখা হয়েছিল।
অবৈধভাবে টাকা ও ডলার রাখায় খালেদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে, ৫৫৮ ইয়াবা রাখায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ও অবৈধ অস্ত্র রাখা এবং অস্ত্রের লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করায় অস্ত্র আইনে মামলা তিনটি করা হয়েছে।
র্যাব জানিয়েছে, গুলশান থানায় গতকাল অস্ত্র আইনে করা মামলাটির নম্বর ২৩, মাদকদ্রব্য আইনে করা মামলার নম্বর ২৪ ও মানি লন্ডারিং আইনে মামলাটির নম্বর ২৫। অন্যদিকে মতিঝিল থানায় একইদিন করা মাদকদ্রব্য আইনের মামলাটির নম্বর ৩১ ও অবৈধ ক্যাসিনো চালানোর জন্য ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের বিরুদ্ধে করার মামলাটির নম্বর ৩০।
র্যাব কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে মতিঝিলের ক্যাসিনো পরিচালনার বিষয়টি মতিঝিল থানা পুলিশ, মতিঝিল জোন, পুলিশ সদর দপ্তর ও ডিএমপি সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানতেন বলে দাবি করেন খালেদ। তবে পুলিশের সঙ্গে ক্যাসিনো পরিচালনার জন্য কোনো আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে কিছু বলেননি তিনি। খালেদ বলেছেন, তার ক্যাসিনোর বিষয়ে পুলিশ ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্য সংস্থা এবং রাজনীতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জানতেন। তাদের ‘ম্যানেজ করে’ ক্যাসিনো চালাতেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন তিনি।
কমলাপুরে নির্যাতন কক্ষে অভিযান : যুবলীগ নেতা খালেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা মতিঝিলের একটি নির্যাতন কক্ষে অভিযান চালিয়েছে র্যাব। সেখান থেকে শক দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত ইলেকট্রিক মেশিন, বেত ও কাঠের বেশকিছু লাঠি, ব্যাটারি, ১৯০ পিস ইয়াবা, বিয়ার, ৭০০ গ্রাম সিসা, সিসা খাওয়ার কয়লা দেড় কেজি, অস্ত্র পরিষ্কার করার তেলের বোতল দুটি ও সাড়ে ২৩ হাজার টাকা জব্দ করা হয়।
জানা গেছে, খালেদ কমলাপুরের ৬৪/৬৮, ইস্টার্ন কমলাপুর কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সের পঞ্চম তলার ৪০২ নম্বর কক্ষটি তার নির্যাতন কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করতেন। মতিঝিল, শাহজাহানপুর, খিলগাঁও, মুগদাসহ বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজিতে অস্বীকার করা লোকজনকে ধরে নিয়ে ওই বাড়িতে নির্যাতন করা হতো। এমনকি ইলেকট্রিক শকও দেওয়া হতো। এ বিষয়ে র্যাব মতিঝিল থানায় মামলা করেছে। মতিঝিল থানা পুলিশ জানিয়েছে, এ মামলায় খালেদকে শ্যেন অ্যারেস্ট দেখানো হবে।
গদফাদারদের নাম বলেছেন খালেদ : অবৈধভাবে ক্যাসিনো চালানোয় গ্রেপ্তার ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে বুধবার রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। দেশ রূপান্তরকে তারা জানিয়েছেন, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য দিয়েছেন ঢাকার ক্যাসিনো জগৎ নিয়ে। যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাদের ‘শেল্টারে’ দীর্ঘদিন ধরে ক্যাসিনো চালিয়ে আসছিলেন সাত নেপালি। এসব ক্যাসিনো কারবারি চালাতে দেওয়া চাঁদার টাকায় নিয়মিত ভাগ বসাতেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও কিছু সাংবাদিক। খালেদের দেওয়া এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করছে র্যাব। এদিকে ওই সাত নেপালিসহ খালেদের সঙ্গে জড়িত অন্যরা রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজধানীতে কোনো ক্যাসিনো চলতে দেওয়া হবে না। এসব জুয়ার বোর্ড, ক্যাসিনো পরিচালনার ক্ষেত্রে যত প্রভাবশালীরাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর। র্যাব অভিযান শুরু করেছে, পুলিশও করবে। ক্যাসিনোর সঙ্গে যারা জড়িত তাদের তালিকা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে একটি জোনের তালিকা সম্পন্ন হয়েছে। অন্য জোনের তালিকাও হচ্ছে।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যাম শাখার প্রধান ও র্যাব-১-এর পরিচালক সারোয়ার বিন কাশেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ধৃত যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদকে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। তদন্তের স্বার্থে সেসব তথ্য প্রকাশ করা যাচ্ছে না। খালেদ বেশ কয়েকজন ‘প্রভাবশালী’ ব্যক্তির নাম বলেছেন। রাজধানীতে কোনো ক্যাসিনো থাকতে দেবে না র্যাব। র্যাবের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, খালেদ জিজ্ঞাসাবাদে তার গডফাদারদের নামও বলেছেন। এসব গডফাদারকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্যাসিনো থেকে যারা নিয়মিত চাঁদা আদায় করতেন, তাদের তালিকা আছে আমাদের কাছে। তারা যেন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারেন সেজন্য দেশের সবকটি বিমানবন্দর ও সীমান্ত এলাকায় সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। তালিকায় যুবলীগ-স্বেচ্ছাসেবক লীগের অন্তত ১০০ নেতাকর্মীর নাম রয়েছে। সাত নেপালিকে খোঁজা হচ্ছে। তারাই মূলত ক্যাসিনো পরিচালনা করতেন। আর তাদের শেল্টার দিতেন ওইসব নেতা।
গোয়েন্দা তথ্য ও ক্লাবপাড়ায় সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের এক প্রভাবশালী নেতার নিয়ন্ত্রণে চলা ক্যাসিনো থেকে শুধু চাঁদা তোলার কাজ করে এখন কোটি টাকার মালিক একসময় কাকরাইলের বিপাশা হোটেলে বয়ের কাজ করা জাকির হোসেন; একই কাজ করে গুলিস্তানের হকার আরমানও এখন কোটি টাকার মালিক। নতুন মডেলের গাড়ি দাপিয়ে চাঁদা তুলত আরমান। দুটি ক্যাসিনোর মালিকানায়ও অংশ রয়েছে তার। কোন ক্যাসিনোর চাঁদা কত হবে যুবলীগের শীর্ষ নেতার সঙ্গে বসে তার পরিমাণও ঠিক করে দিত আরমান। আর জাকির চাঁদা তোলার পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গায় মাসোয়ারা পৌঁছে দিত। ক্যাসিনো ও ক্লাবপাড়ার সবাই তাদের ওই নেতার বন্ধু হিসেবেই চেনেন। সিঙ্গাপুরে অভিজাত ক্যাসিনো মেরিনা বে’তে গিয়ে তারা একসঙ্গে জুয়াও খেলে।
