রাজধানীর গুলশানের নিকেতন এলাকা থেকে যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায়বিষয়ক সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া (জি কে) শামীমকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। এ সময় সাতটি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআর (স্থায়ী আমানত) নথি, ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ও কয়েকটি মদের বোতলসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। এছাড়া গ্রেপ্তার করা হয়েছে তার সাত দেহরক্ষীকে। জি কে বিল্ডার্সের চেয়ারম্যান শামীম সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঠিকাদারির কাজ করেন। এদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী বলেছেন, জি কে শামীম কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা নন। যুবলীগের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। তবে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ বলছে, এই নামে তাদের কোনো সহসভাপতি নেই।
শামীমের সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া সাতজন হলেন শহীদুল ইসলাম (৩৬), মো. মুরাদ হোসেন (৩২), দেলোয়ার হোসেন (৩৫), জাহিদুল ইসলাম (৪১), আমিনুল ইসলাম (৩৪), সামসাদ হোসেন (৩৫) ও কামাল হোসেন (৪৯)। তাদের মধ্যে কামাল প্রধান দেহরক্ষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার প্রধান সহকারী হিসেবে কাজ করেন মুরাদ। র্যাব জানিয়েছে, অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহারের মামলায় তাদের আসামি করা হবে।
গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে নিকেতনের ‘ডি’ ব্লকের ৫ নম্বর সড়কের ১১৩ নম্বর বাসাটি ঘিরে ফেলে র্যাব। সেখান থেকে শামীমকে নিয়ে যাওয়া হয় নিকেতন ‘এ’ ব্লকের ১৪৪ নম্বর বাড়িতে জি কে বিল্ডার্সের কার্যালয়ে। সেখানে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত অভিযান চালায় র্যাব। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক সরওয়ার-বিন-কাশেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, শামীমের কার্যালয় থেকে জব্দ হওয়া ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআরের মধ্যে ১৪০ কোটি রয়েছে তার মায়ের নামে। বাকি ২৫ কোটি টাকা শামীমের নামে। ২৩টি ব্যাংকে এসব এফডিআর করা। তার কার্যালয় থেকে ৮২টি চেক উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়াও উদ্ধার করা হয়েছে ৯ হাজার ইউএস ডলার ও ৭৫২ সিঙ্গাপুরি ডলার। জব্দ করা হয়েছে সাতটি শটগান ও একটি পিস্তল। উদ্ধার করা অস্ত্রগুলোর লাইসেন্স আছে কি না, থাকলে সেটা সঠিক কি না তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, জি কে বিল্ডার্সের মালিক দেহরক্ষীদের মাধ্যমে অস্ত্র প্রদর্শন করে বিভিন্ন টেন্ডার ও ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ নিতেন। অবৈধ দখল বাণিজ্যেও এসব অস্ত্র প্রদর্শন করা হতো। তিনি বলেন, ‘গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আমরা জানতে পারি জি কে শামীমের কাছে কিছু অর্থ ও অস্ত্র রয়েছে। এছাড়া তিনি চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিতে ব্যস্ত ছিলেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা তার বাসা ঘেরাও করি। এ সময় তার সাতজন বডিগার্ডকে গ্রেপ্তার করি। তাদের কাছ থেকে সাতটি শটগান জব্দ করা হয়। বিপুল পরিমাণ গুলি উদ্ধার করা হয়। পরে তথ্য নিয়ে আমরা তার অফিসে অভিযান পরিচালনা করি।’
এক প্রশ্নের জবাবে র্যাব কর্মকর্তা কাশেম বলেন, ‘আমরা অবশ্যই স্বীকার করি, তার ঠিকাদারি ব্যবসা আছে। কিন্তু তার নামে টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আমরা মানি লন্ডারিং আইনে ফেলব। আমরা তদন্ত করে দেখব তার কাছে এত টাকা কীভাবে এসেছে।’
অভিযানে অংশ নেওয়া র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরোয়ার আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শামীমকে র্যাব-১-এর অফিসে নেওয়া হয়েছে। সেখানে উদ্ধার করা নথিপত্র যাচাই-বাছাই করে তার বিরুদ্ধে প্রযোজ্য ধারায় মামলা করা হবে। এরপর তাকে থানায় সোপর্দ করে আদালতে পাঠানো হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে শামীমকে ধরার জন্য অভিযান চালানো হয়েছে। তার অস্ত্রের লাইসেন্স থাকলেও অবৈধ ব্যবহারের অভিযোগ ছিল। এখন আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্দোষ প্রমাণিত হলে তিনি ছাড়া পাবেন।’
এফডিআরের অর্থের উৎসের বিষয়ে সারোয়ার আলম বলেন, ‘কোনো অবৈধ উৎস থেকে এ অর্থ এসেছে বলে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে। এ বিষয়ে তদন্ত করে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করা হবে। তাছাড়া এসব আয়ের উৎস তার ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক আয়করে উল্লেখ আছে কি না খতিয়ে দেখা হবে।’
এদিকে র্যাবের অভিযানকালে ছবি তোলার সময় শামীম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে ছবি তুইলেন না, আমাকে বেইজ্জতি কইরেন না। আমার একটা সম্মান আছে। এখানে যা হচ্ছে, আপনারা দেখছেন। কিন্তু আমাকেও আত্মপক্ষ সমর্থন করতে দিতে হবে।’ ছবি তোলার সময় শামীম হাত দিয়ে বারবার মুখ ঢাকছিলেন এবং দীর্ঘক্ষণ টেবিলের নিচে মাথা লুকিয়েও রাখেন। এ সময় র্যাবের এক কর্মকর্তা শামীমকে বলেন, ‘আপনি আমাদের সহযোগিতা করেন। আমাদের সহযোগিতার জন্য ও অভিযানের স্বচ্ছতার জন্য মিডিয়া আমাদের সহযোগিতা করছে।’
র্যাবের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, শামীমের নামে মানি লন্ডারিং আইন, অস্ত্র ও অবৈধভাবে মদ রাখার জন্য তিনটি মামলা করা হবে। এ বিষয়ে প্রস্তুতি চলছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, শামীমের কাছ থেকে একটি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এর কোনো বৈধতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া অভিযানে বিদেশি মদের বেশ কয়েকটি বোতলও উদ্ধার করা হয়েছে।
কে এই জি কে শামীম : নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার সম্মানদী ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়া গ্রামের আফসারউদ্দিন মাস্টারের ছেলে শামীম। তার বাবা ছিলেন হরিহরদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তার তিন ছেলের মধ্যে জি কে শামীম মেজো। বড় ছেলে গোলাম হাবিব নাসিম জাতীয় পার্টির রাজনীতি করেন। শামীম গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ঢাকায় চলে আসেন। তিনি বেড়ে ওঠেন রাজধানীর বাসাবো-সবুজবাগ এলাকায়।
সোনারগাঁ ও নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দারা জানান, শামীম সোনারগাঁ বা নারায়ণগঞ্জে তেমন একটা যান না। তার নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতির যে পদের কথা বলা হয়েছে সেটা মিথ্যা। জেলা আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, এ নামে জেলা আওয়ামী লীগে কোনো সহসভাপতি নেই। তিনি অবৈধভাবে এ পরিচয় দেন।
তারা আরও জানান, চারদলীয় জোট সরকারের সময় শামীম ছিলেন ঢাকা মহানগর যুবদলের সহসম্পাদক এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক গণপূর্তমন্ত্রী মির্জা আব্বাসের ঘনিষ্ঠ। ওই সময় থেকে তিনি গণপূর্ত বিভাগে টেন্ডার ও ঠিকাদারি করতেন। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে শামীম যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায়বিষয়ক সম্পাদক হন। পুলিশসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার সখ্য ছিল। বিপুল অর্থসম্পদের মালিক শামীম যেখানেই যান সঙ্গে থাকে ছয়জন অস্ত্রধারী দেহরক্ষী।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অভিযোগ রয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরী হত্যার নেপথ্যে শামীমের হাত রয়েছে। ৯৩ কোটি টাকার একটি টেন্ডার তার পক্ষে নিতে দিয়াজ বাধা হয়ে দাঁড়ান। পরে দিয়াজকে নিজ বাসায় হত্যার পর লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়।
