বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘প্রাণীবৈচিত্র্য ও সবুজ রক্ষা নীতিমালা’

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:৪৯ পিএম

বাংলাদেশে এখন অধিকাংশ জেলাতেই কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়, বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়ীষ সেখানে ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। আর এই নতুন-পুরনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ গড়ে উঠেছে সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে ঘাস জমিতে এবং সাধারণত গড়ে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের আকার প্রায় কোনোটিই ১০০ একরের কম নয়। বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় যেমন রাজশাহী, ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, খুলনা, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আকার অনেক বেশি আর এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে অনেক ধরনের প্রাণবৈচিত্র্য- সবুজ বৃক্ষরাজির সমাহার। এই সবুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরকে শুধুমাত্র প্রাণচাঞ্চল্যেই ভরে তোলে নাশ শিক্ষার মনোরম পরিবেশ তৈরি করে সবুজের সঙ্গে জীবনের এক গভীর মর্মবোধ আর উপলব্ধি জাগিয়ে তোলে। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জায়গা যেখানে ছাত্রছাত্রীরা শুধু পড়ালেখাই করে না,

প্রকৃতির সঙ্গে নিরবচ্ছিন্নভাবে আলিঙ্গনের সুযোগ পায়। আর সব শিক্ষার সঙ্গে প্রকৃতিশিক্ষার একটি অন্য সংমিশ্রণ রয়েছে মোট কথায় পূর্ণাঙ্গ একটি ক্যাম্পাসের মধ্যে শিক্ষার বিবিধ মাধ্যমের সঙ্গে প্রকৃতি মিশে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। আর ক্যাম্পাসে অবস্থানকালে একজন শিক্ষার্থী এভাবেই জলবায়ুর প্রভাব সম্পর্কে, বৃক্ষরাজি আর প্রাণীবৈচিত্র্যের ইকোলজি সম্পর্কে শেখে। এ শেখার কোনো বিকল্প নেই।

 

দেশের বাইরের যে কটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় দেখার সুযোগ হয়েছে, প্রায় প্রতিটিতেই দেখেছি সেখানকার প্রাণীবৈচিত্র্যকে ধরে রাখার জন্য কী পরিমাণ তোড়জোড়। কত রকম ব্যবস্থাপনা। মনে পড়ে, যখন জাপানের জোক্কাইতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেলাম কিংবা টোকিও বিশ^বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে গেলাম, তখন দেখলাম প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই গড়ে উঠেছে সেখানকার উদ্ভিদ বৈচিত্র্য নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বোটানিক্যাল গার্ডেন। এমনকি প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই খুব যত সহকারে গড়ে তোলা হয়েছে মিউজিয়াম। এমন মিউজিয়ামে সবসময় ছাত্রছাত্রীদের আনাগোনা থাকে। ঘুরতে ঘুরতে তারা সব ধরনের প্রাণবৈচিত্র্য আর সবুজ উদ্ভিদের সমাহার সম্পর্কে শিক্ষালাভ করে। জ্ঞান কোষের এক উন্মুক্ত দ্বার খুলে যায় তাদের সামনে। ভালোবাসতে শেখে আশপাশের পরিবেশকে আর সেই থেকেই ঝাঁপিয়ে পড়ে পরিবেশ রক্ষার মহান ব্রতে। এমনও দেখেছি অনেক বছরের পুরনো গাছগাছালিকে কী করে যত সহকারে সংরক্ষণ করা যায় শত প্রচেষ্টা জড়িয়ে থাকে তার পেছনে। এমনকি তারা তাদের নিজস্ব ক্যাম্পাসে এ সবুজ বৃক্ষ-প্রাণিকুলকে কীভাবে পর্যাপ্তভাবে সংরক্ষণ করা যায়, তার জন্য তৈরি করে বিশেষ নীতিমালা এবং এইসব নীতিমালা কত বছরকে সামনে রেখে করা হচ্ছে সেগুলোও থাকে বিশেষ বিবেচনার মধ্যে।

 

আর এই নীতিমালাগুলোই পরবর্তী সময়ে ‘টেকসই উন্নয়নের’ ক্যাম্পাসভিত্তিক নীতিমালা হিসেবে বিশেষভাবে বিবেচিত হয়। পৃথিবীর সকল নামকরা এবং বিশ^খ্যাত বিশ^বিদ্যালয়গুলো পর্যালোচনা করলেই বিষয়টিকে সহজভাবে বোঝা যাবে। সেখানে ক্যাম্পাসের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উদ্ভিদ, প্রাণী এমনকি জীবনযাপনের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া থাকে। ইংরেজিতে একে বলা হচ্ছে ‘সাসটেইনেবল গ্রিন ম্যানেজমেন্ট ফর ইউনিভার্সিটি’।

 

এবার আসা যাক আমাদের বিশ^বিদ্যালয়গুলোর দিকে। কী হচ্ছে এখানে কিংবা উন্নয়নের রূপরেখা বা কেমন! বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই দেখা গেছে কোনো সুনির্দিষ্ট টেকসই পরিকল্পনা ছাড়াই গড়ে উঠছে স্থাপনা। এমনকি স্থাপনা তৈরির জন্য চিন্তাভাবনা ছাড়াই দেদার কেটে ফেলা হচ্ছে সবুজ বৃক্ষরাজি, যেগুলো তৈরি হতে হয়তো সময় লেগেছে বছরের পর বছর। আর কেটে ফেলা হচ্ছে রাতের অন্ধকারে চোখের নিমিষে আর বাধা দিতে গেলে একজন দোষ চাপায় আরেকজনের ঘাড়ে। ভরাট করা হচ্ছে ক্যাম্পাসের অগভীর জলাশয় লেক-পুকুর। আর যেসব স্থাপনা তৈরি হচ্ছে সেগুলোর মধ্যেও নেই কোনো ভারসাম্য বা স্থানীয় প্রতিবেশগত চিন্তাভাবনা। অনেক সময় এই ধরনের ভাবনার ছাপ নকশাতে থাকলেও বাস্তবায়ন হয় না বিভিন্ন অজুহাতে। এভাবে দিনের পর দিন অপরিকল্পিতভাবে উদ্ভিদ ও প্রাণীবৈচিত্র্যকে বাদ দিয়ে গড়ে উঠছে আমাদের নতুন নতুন প্রাণহীন ক্যাম্পাস।

 

আমাদের হাতেগোনা ২-৩টি ক্যাম্পাসকে বাদ দিলে আর কোনো সবুজে ঘেরা কিংবা টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রাখা ক্যাম্পাসের উদাহরণ দেখানো সত্যিই কষ্টকর। অথচ আমাদের ক্যাম্পাসগুলোই কিন্তু প্রাণী আর উদ্ভিদ বৈচিত্র্যে পৃথিবীতে সব থেকে এগিয়ে থাকার কথা। অথচ আমরা যাচ্ছি পিছিয়ে। দোষারোপ করছি একে অপরকে। নামেমাত্র একটি কমিটি তৈরি করে দিনের পর দিন পরিকল্পনার নামে অপরিকল্পনাই করে যাচ্ছি। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রাণবৈচিত্র্যে সজ্জিত করতে তাদের নিজস্ব ‘সুবজ রক্ষা নীতিমালা’ আছে কি? কিংবা আছে কি দেশের কোনো ক্যাম্পাসভিত্তিক উন্নয়ন নীতিমালা?  এখানেই আমাদের ব্যর্থতা। আজ যদি প্রতিটি ক্যাম্পাসে তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য প্রাণবিচিত্র্য আর সবুজকে ধরে রাখার নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকে এবং সেই নীতিমালার ভিত্তিতে যদি সকল উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালিত হয়Ñ তাহলে অযাচিত ঝামেলাগুলো সহজেই এড়ানো সম্ভব হতো। আমরা পেতে পারতাম একটি টেকসই সবুজ ক্যাম্পাস।

 

তবে হতাশ হলে চলবে না। শুধুমাত্র সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেই বসে থাকলে চলবে না কর্তৃপক্ষকে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিতে হবে। একটি উদাহরণ দিয়ে শেষ করছি। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজের জন্য যখন অনেক গাছ কাটার ফলে ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছিল, ঠিক তখন আমরা স্থাপত্য বিভাগের সকল শিক্ষক সরাসরি চলে গেলাম উপাচার্যের কাছে ‘সবুজ রক্ষা নীতিমালার’ প্রস্তাব নিয়ে। আমরা জানতাম স্থাপনার কারণে বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাণবৈচিত্র্যেও ক্ষতি হলেও তা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনেই তৈরি করতে হবে। তবে এই ক্ষতির পরিমাণ পুষিয়ে নেওয়া যাবে যদি ক্যাম্পাসে একটি ‘সবুজ রক্ষা নীতমালা’ প্রণয়ন করা হয়। উপাচার্য তখন এ সংক্রান্ত একটি কমিটি তৈরি করে দিলেন এবং প্রস্তাবনাগুলো কী কী হতে পারে তা তাড়াতাড়ি দিতে বললেন। আমাদের প্রত্যাশা ‘সবুজ রক্ষা নীতিমালা’ একদিন টেকসই উন্নয়নে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে।

 

লেখক : স্থাপত্য-পরিবেশবিষয়ক গবেষক এবং শিক্ষক, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত