নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে আটক হওয়া জঙ্গি সংগঠন ‘নব্য জেএমবির’ সদস্যরা চলতি মাসেই পুলিশের ওপর নতুন করে হামলার পরিকল্পনা করছিল বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মনিরুল ইসলাম। ফতুল্লার ওই অভিযানে আটক হওয়াদের মধ্যে দুজনকে এর আগে রাজধানীতে পুলিশের ওপর বোমা হামলা এবং নারায়ণগঞ্জের ওই ‘জঙ্গি আস্তানার’ সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়ায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। গত সোমবার ফতুল্লায় অভিযানের পরদিন গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসে এসব তথ্য জানান সিটিটিসি প্রধান। ফতুল্লার ওই অভিযানে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক পাওয়া গেছে, যার সঙ্গে ঢাকায় পুলিশের ওপর হামলায় ব্যবহৃত বিস্ফোরকের মিল রয়েছে বলে জানিয়েছিলেন সিটিটিসি প্রধান মনিরুল। ২০১৬ সালে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে দেশের বিভিন্ন জায়গায় অনেক জঙ্গি আস্তানার সন্ধান মেলে এবং নিহত হন শীর্ষ জঙ্গি নেতারা। তখন পুলিশ কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন, তারা জঙ্গিদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু গত কয়েক মাসে রাজধানীতে পুলিশকে লক্ষ্য করে পাঁচটি বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর জঙ্গি তৎপরতার বিষয়টি ফের আলোচনায় চলে আসে। এসব ঘটনায় জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হলেও স্পষ্ট কোনো ধারণা মিলছিল না। এরই মধ্যে গত রবিবার মধ্যরাতে ফতুল্লার সেয়াচর এলাকার ওই বাড়িটি ঘিরে অভিযান চালায় পুলিশ। বাড়িটিতে তিনটি ইমপ্রোভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) এবং বোমা তৈরির বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও রাসায়নিক পাওয়া যায় বলে জানান সিটিটিসি কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় বাড়ির মালিকের ছেলে ফরিদউদ্দিন রুমিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি ঢাকার আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ও প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক।
মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনে সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আটককৃত জঙ্গিরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছে। এই মাসেই পুলিশের ওপর হামলার প্রস্তুতি ছিল তাদের। এজন্য তিনটি আইইডি রেডি করা ছিল যা উদ্ধার করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের ওপর হামলার বিষয়ে জঙ্গিরা বলেছে, দেশের প্রচলিত আইনকানুন তারা সমর্থন করে না। সংবিধানকে তারা বিশ্বাস করে না। ফলে আইন প্রয়োগকারী পুলিশকে তারা আইডিওলোজিক্যালি শত্রু বলে মনে করে। পুলিশের অভিযানের কারণে তাদের অনেক শীর্ষ নেতা মারা গিয়েছে বা গ্রেপ্তার হয়েছে। তামিম চৌধুরীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তাদের সাংগঠনিক কাঠামো বিধ্বস্ত হয়ে গেছে বলে তারা পুলিশের ওপর হামলা করে। এ ছাড়া তারা মনে করে যে এ ধরনের হামলা হলে পুলিশের মনোবল ভেঙে যেতে পারে, ভীতসন্ত্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি সাধারণ জনগণও ভীত হতে পারে। পুলিশের ওপর গত ৫ মাসে যে হামলাগুলো পরিচালিত হয়েছে এর প্রত্যেকটি ঘটনাতে যেসব আইইডি ব্যবহার করা হয়েছিল সেগুলো রিমোট কন্ট্রোল ডিভাইসের মাধ্যমে অর্থাৎ দূর নিয়ন্ত্রিত।’
চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল রাজধানীর গুলিস্তানে আইইডি হামলায় তিন পুলিশ সদস্য আহতের বিষয়টি উল্লেখ করে সিটিটিসি প্রধান বলেন, ‘আটক দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদে আমরা জানতে পেরেছি যে গত ৫টি হামলার ঘটনাতে মোট ৫ জনের একটি সেল কাজ করেছে। এদের দুজনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। এরা হলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফরিদউদ্দিন রুমি এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার মিশুক খান ওরফে মিজান। বাকিদেরও চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে, তাদের গ্রেপ্তারের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।’
ফতুল্লায় উদ্ধার হওয়া আইইডিগুলো পুলিশের ওপর হামলায় ব্যবহৃত আইইডিগুলোর চেয়ে শক্তিশালী উল্লেখ করে পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল বলেন, ‘ফতুল্লায় আমরা যে তিনটি ডিভাইস ধ্বংস করেছি সেগুলো আগেরগুলোর চেয়ে শক্তিশালী। এই সেলই হামলার পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নে আইইডি তৈরি করে। তবে যে আইইডিগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল সেগুলো একেবারেই লো-কোয়ালিটির। তাদের বোমা তৈরির কোনো প্র্যাকটিক্যাল প্রশিক্ষণ নেই। এদের বিরুদ্ধে ফতুল্লা থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। গুলিস্তানে গত ২৯ এপ্রিল পুলিশের ওপর যে হামলা হয়েছিল সেই হামলায় সরাসরি জড়িত হওয়ায় আমরা তাদের ওই মামলায় ফরোয়ার্ড করছি।’
গ্রেপ্তার দুজনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের কোনো যোগসূত্র আছে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মনিরুল বলেন, ‘আমরা মনে করি, সর্বশেষ যে ৫টি ঘটনা ঘটেছে এর সঙ্গে আইএসের কোনো যোগসূত্র নেই। তবে তারা আন্তর্জাতিক যে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো আছে তাদের আইডিওলোজি শেয়ার করে। তাছাড়া আইএসের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বা অর্থ সাহায্য পাওয়ার জন্য তাদের সামর্থ্য প্রকাশের চেষ্টা করে।’
গ্রেপ্তার দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদে তাদের সংগঠনের একজন আমির রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে জানিয়ে সিটিটিসি প্রধান বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি, এখানে তাদের একজন আমির রয়েছে। ঘটনা ঘটিয়ে এরা সেই আমিরের কাছে তথ্য দেয়। সেখান থেকে সাইট ইনটেলিজেন্সে যায়। এরা সেই আমিরের মাধ্যমে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। গ্রেপ্তার দুজনকে রিমান্ডে নিয়ে সেই আমির সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করা হবে।’
