গ্যাসট্রিকসহ পেটের পীড়ার বিভিন্ন উপসর্গের চিকিৎসায় বহুল প্রচলিত ওষুধ রেনিটিডিন বাংলাদেশের বাজারেও নিষিদ্ধ হতে পারে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে আজ রবিবার জরুরি বৈঠক ডেকেছে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। যদিও বাংলাদেশ থেকে রেনিটিডিন গ্রুপের ওষুধ জ্যানটেক প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ নেই বলে গ্ল্যাক্সো স্মিথ ক্লাইন (জিএসকে) জানিয়েছে। তবে রেনিটিডিনে ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত তা নিষিদ্ধ করে বাজার থেকে তুলে নিয়েছে। আরও কয়েকটি দেশ এ বিষয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৫ শতাংশ রোগী এই গ্রুপের ওষুধ সেবন করেন।
বাংলাদেশের বাজার থেকে রেনিটিডিন ওষুধ প্রত্যাহার করা হবে কি না জানতে চাইলে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল
মো. মাহবুবুর রহমান গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রেনিটিডিন গ্রুপের ওষুধে ক্যানসারের উপাদান পাওয়ার খবর সম্পর্কে আমরা অবগত। বিভিন্ন দেশের বাজারে থাকা এ ওষুধ স্বেচ্ছায় কোম্পানিগুলো প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। আমাদের করণীয় কী হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে রবিবার বৈঠক ডাকা হয়েছে। ওই বৈঠকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে তা কার্যকর করা হবে।
তিনি বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন কোম্পানি এই গ্রুপের ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। আগে রেনিটিডিন গ্রুপের ওষুধের ব্যবহার অনেক বেশি ছিল। তবে এখন তা কিছুটা কমে গেছে। অনেকেই এখন ইসোমিপ্লাজল, ওমেগাপ্লাজল গ্রুপের ওষুধ ব্যবহার করছেন। তা সত্ত্বেও দেশের প্রায় ৫ শতাংশ রোগী এখনো রেনিটিডিন গ্রুপের ওষুধ সেবন করছে। আমরা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছি।’
রেনিটিডিন গ্রুপের ওষুধ জ্যানটেক বিভিন্ন দেশের বাজার থেকে জিএসকে প্রত্যাহার করে নিলেও বাংলাদেশ থেকে তুলে নেওয়ার কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই বলে গতকাল দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে জিএসকে বাংলাদেশ। দেশ রূপান্তরের প্রশ্নে ই-মেইলে কোম্পানিটি জানায়, বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর সারাকা ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড ও ড. রেড্ডি’স লিমিটেড থেকে নেওয়া এপিআইয়ে উৎপাদিত জ্যানটেকের সব ধরনের ডোজ সরবরাহ, বিতরণ বন্ধ রাখার পাশাপাশি জিএসকে তা বাজার থেকে তুলে নিয়েছে। তবে বাংলাদেশে জ্যানটেকের এপিআইর উৎস অর্চেভ, সারাকা বা ড. রেড্ডি’স লিমিটেড নয়। তাই বাংলাদেশ থেকে জ্যানটেক প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ নেই।
রেনিটিডিন গ্রুপের ওষুধ বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয়। ১৯৭৬ সালে রেনিটিডিন আবিষ্কার করে জিএসকে। ১৯৮১ সালে প্রথম বাজারে ছাড়ে ওষুধটি। জিএসকে বাংলাদেশেও এ ওষুধ উৎপাদন ও বিপণন করেছে। বাংলাদেশি ওষুধ কোম্পানি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের নিউটেক, একমি ল্যাবরেটরিজের রেনিডিন, এসেন্সিয়াল ড্রাগসসহ কয়েকটি কোম্পানির রেনিটিডিন, অফসোনিনের রেনিটিড এ গ্রুপের ওষুধ। আরও বেশ কয়েকটি বাংলাদেশি কোম্পানি বিভিন্ন নামে এ গ্রুপের ওষুধ উৎপাদন ও বিপণন করে থাকে।
জিএসকে বাংলাদেশ আরও জানায়, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চ্যালেঞ্জের মুখে ২০১৮ সালে জিএসকের ওষুধ উৎপাদন কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মূলত গত বছরের জুলাই মাসে ঘোষণা দেওয়ার পর ওই বছরের অক্টোবর থেকে বাংলাদেশে জিএসকে ফার্মার উৎপাদন বন্ধ আছে। তবে ক্যানসারের উপাদান পাওয়ার বিষয় নিয়ে জিএসকে আরও তদন্ত করছে। এই তদন্তেএপিআই সরবরাহকারীদেরও সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। রোগীর নিরাপত্তা আমাদের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং আমরা এ বিষয়টিকে খুবই গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। ক্যানসারের উপাদান পাওয়ার বিষয়ে জিএসকে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো থেকে যেসব বিষয়ে তথ্য চাওয়া হচ্ছে, সেগুলো দিয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, দুই সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন সংস্থা (এফডিএ) ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রাথমিক পরীক্ষায় বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ডের রেনিটিডিনের মধ্যে এনডিএমএর উপস্থিতি পাওয়ার পর সতর্কতা জারি করা হয়। তখন এই ওষুধের কোনো ব্র্যান্ডের মধ্যে এনডিএমএর ক্ষতিকর মাত্রা নিশ্চিত না হলেও সতর্কতা হিসেবে কানাডা, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি কোম্পানি রেনিটিডিন সরবরাহ বন্ধ করার ও বাজার থেকে তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেয়।
গত শুক্রবার ভারতের ওষুধ কোম্পানি স্ট্রাইডস এফডিএর অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রেনিটিডিন বিক্রি বন্ধ রেখে তাদের ট্যাবলেটে এনডিএমএর উপস্থিতি আছে কি না তা পরীক্ষা করছে। এর আগে গত সপ্তাহে ভারতের ওষুধ কোম্পানি ড. রেড্ডিস ফার্মাসিউটিক্যালস ও গ্ল্যাক্সো স্মিথক্লাইন পূর্ব সতর্কতা হিসেবে তাদের রেনিটিডিন বাজারে সরবরাহ বন্ধ করে দেয়।
ওষুধ শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব মো. হারুনুর রশিদ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রেনিটিডিন গ্রুপের মূল আবিষ্কারক জিএসকে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অনেক কোম্পানি এ ওষুধ তৈরি করছে। সমস্যা দেখা দিয়েছে, ভারতের একটি কোম্পানির ওষুধ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করলে তা পরীক্ষা করে ক্যানসারের উপাদান পাওয়ার পর। সব কোম্পানির এই গ্রুপের ওষুধে ক্যানসারের উপাদান আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।’
তিনি বলেন, ‘ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর করণীয় নির্ধারণে রবিবার জরুরি বৈঠক ডেকেছে। সেখানেই আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হবে, বাংলাদেশ কী করবে। তবে জীবনের চেয়ে ওষুধ তো বড় নয়। তাই রেনিটিডিনের ওষুধে সমস্যা থাকলে বাংলাদেশেও এটি নিষিদ্ধ করা হবে। বাংলাদেশের ৫০ থেকে ৬০ ভাগ লোকের গ্যাসট্রিকের সমস্যা রয়েছে। চার-পাঁচ বছর আগেও গ্যাসট্রিকের রোগীদের ৮০ ভাগই রেনিটিডিন গ্রুপের ওষুধ খেত। এখন এই গ্রুপের ওষুধ সেবনের হার কমেছে। এতে ক্যানসারের উপাদান থাকলে দেশের অনেক মানুষের ক্যানসার হয়ে যেত।’
তিনি আরও বলেন, ‘সত্যিকার অর্থেই রেনিটিডিন গ্রুপের ওষুধে ক্যানসারের উপাদান থাকলে বাংলাদেশেও এ ওষুধ নিষিদ্ধ করা হবে। তবে কোম্পানিগুলোর কাছে উৎপাদিত ওষুধের যে মজুদ আছে, সেগুলো তো আর ফেলে দেওয়া যাবে না। সেগুলো বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর আর কেউ যাতে উৎপাদন না করে, সেটি নিশ্চিত করা যেতে পারে। এতে পাঁচ-ছয় মাস সময় লাগবে।’
