এবার কি দলে ‘হাইব্রিডের’ দৌরাত্ম্য কমবে

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:৪৪ পিএম

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের অপকর্মকারী নেতাদের বিরুদ্ধে পুলিশি অভিযান শুরু হয়েছে। দলের এই ‘দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযান’ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে পরিচালিত এই অভিযান নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ দেশের সুধীমহলে রয়েছে নানা প্রশ্ন। ‘এ অভিযান কয়দিন চলবে?’ ‘আরও আগেই তো শুরু হওয়ার দরকার ছিল। রাঘব-বোয়ালরা ধরা পড়বে তো?’ ‘অভিযান কি শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, না জেলা-উপজেলা পর্যায়েও বিস্তৃত হবে?’ এমন নানা প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। তবে সংশয়ের মধ্যেও আওয়ামী লীগের মাঠের নেতারা এই অভিযান নিয়ে খুশি।

 

আওয়ামী লীগে ‘হাইব্রিড’ ‘অনুপ্রবেশকারী’ ও ‘কাউয়া’ শব্দগুলো বহুল পরিচিত। বিশেষত ‘হাইব্রিড’ ও ‘কাউয়া’ শব্দ দুটি কয়েক বছর আগে সামনে নিয়ে আসেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। মূলত যারা সুযোগ-সুবিধার জন্য বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন তাদেরই তিনি ওই দুই নামে অভিহিত করেন। এই ‘নব্য আওয়ামী লীগার’দের কারণে অনেক জায়গাতেই পুরনো আওয়ামী লীগাররা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। নির্বাচনের আগে যেমন ‘পরিস্থিতি’ আঁচ করতে পেরে বিএনপি ও জামায়াত থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন অনেকে, তেমনি দল ভারী করার জন্যও আওয়ামী লীগের অনেক সংসদ সদস্য প্রার্থী ও নেতা তাদের আওয়ামী লীগে যোগদানে বাধ্য করেছেন। ফলে দেশের

তৃণমূল পর্যায়ে এখন পরিচয় দেওয়ার মতো বিএনপি-জামায়াত কর্মী খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার এবার টানা

তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় পর্যায়ে যেন সবাই আওয়ামী লীগ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি এমন যে কোথাও কোথাও নব্য আওয়ামী লীগারদের হাতে আওয়ামী লীগ বা তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা মার খাচ্ছিলেন।

 

আওয়ামী লীগে কীভাবে এত দুর্বৃত্ত ঢুকে পড়ল, তা নিয়ে প্রশ্ন অনেকের। এ জন্য স্থানীয় অনেক নেতাকে কেন্দ্রীয় নেতাদের দুষতেও দেখা গেছে। দলের ভেতরে অপশক্তির তৎপরতা নিয়ে ‘বড় ফোরামে’ কথা বলতে পারেননি বা বলতে দেওয়া হয়নিÑ এমন অভিযোগ-অনুযোগও দলের অনেকের কাছ থেকে শোনা যাচ্ছে।

 

আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ দিয়েই এই ‘শুদ্ধি অভিযানের’ শুরু হয়েছিল। কয়েক দিন ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নকাজ থেকে কমিশন দাবি, টাকা নিয়ে কমিটিতে পদ দেওয়া, ক্ষমতার অবৈধ প্রদর্শনসহ ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আসতে থাকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৪ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে পদ থেকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা আসে। ওই সভাতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুবলীগের একাধিক নেতার কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

 

১৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে ওই দিন মতিঝিলের ইয়ংমেনস ফকিরেরপুল, ওয়ান্ডারার্স, মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়াচক্র ও বনানীর গোল্ডেন ঢাকা ক্লাবে অভিযান চালানো হয়। ক্যাসিনো ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে যুবলীগ, কৃষক লীগ ও আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রধানমন্ত্রী ১৯ সেপ্টেম্বর বলেন, ‘আমি কোনো নালিশ শুনতে চাই না। ছাত্রলীগের পর যুবলীগকে ধরেছি। একে একে সব ধরব।’ এরপর ঢাকার একাধিক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে হানা দিয়ে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চট্টগ্রামেও একাধিক অভিযান চলে।

 

চলমান ‘দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযানে’ যাদের আটক করা হয়েছে, দেখা যাচ্ছে তাদের প্রায় সবাই ‘হাইব্রিড’ আওয়ামী লীগ। সর্বশেষ আটক লোকমান হোসেন ভূঁইয়াও ছিলেন খালেদা জিয়ার নিরাপত্তা কর্মকর্তা। আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করে তিনি শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন, বিসিবির পরিচালক হয়েছেন। এর আগে জিকে শামীম, খালেদ ভূঁইয়া থেকে শুরু করে ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির সঙ্গে যারা জড়িত ও ধরা পড়েছে এরা প্রত্যেকেই আওয়ামী লীগে উড়ে এসে জুড়ে বসা লোক। ছাত্রদল, যুবদল, ফ্রিডম পার্টি, শিবির থেকে এরা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনে অনুপ্রবেশ করেছে। এরা অনুপ্রবেশ করেছে মূলত টাকা উপার্জন ও ক্ষমতার জন্য। এ ধরনের অনুপ্রবেশকারী সারা দেশে ভরে গেছে। ইউনিয়নের ওয়ার্ড থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ে সব জায়গায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ প্রতিটি অঙ্গ সংগঠনের নেতৃত্বে এখন অনুপ্রবেশকারীরা। এই অনুপ্রবেশকারীরা কমিটি দখল করেছে, এমপি হয়েছে, মন্ত্রীও হয়েছে। শুধু দলেই নয়, প্রশাসনেও এমন ‘অনুপ্রবেশকারী’দের দৌরাত্ম্য অব্যাহত রয়েছে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যে সরাসরি শিবির বা ছাত্রদল করেছে প্রশাসনে ঢুকে তারা এখন আওয়ামী লীগের বড় সমর্থক। এ পরিচয়ে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত।

 

অনেকদিন ধরে দলের ভেতর আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে এসেছে এই স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। তাদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড সবার জন্যই ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। টাকা আর টাকাÑ এটাই ছিল তাদের একমাত্র চাওয়া। আর এ টাকা আয় করতে দল ছিল মেশিন। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস, খুন-ধর্ষণ, মাদক-ব্যবসাসহ হেন কোনো অপকর্ম নেই, যা তারা করেনি। তারা দলকে স্রেফ স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ারে পরিণত করেছিল।

 

একথা অনেক দিন ধরেই বলা হচ্ছিল যে, এই অনুপ্রবেশকারী হাইব্রিডদের কারণে একদিন আওয়ামী লীগ বড় বিপদে পড়বে। তখন দলের অনেক নেতা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। সাফাই গেয়েছিলেন। এখন খোদ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে অভিযান শুরু হওয়ার পর তারাও উল্টো কথা বলছেন। তারাও বলছেন যে, আওয়ামী লীগে এই শুদ্ধি অভিযান অনিবার্য হয়ে পড়েছিল!

 

প্রশ্ন হলো, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত আওয়ামী লীগের মতো একটা প্রাচীন দল এতদিন কেন এই দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি? এরা যে দল-সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকরÑ এটা কেন বুঝতে পারেনি? এখনো কি বুঝতে পেরেছে?

 

২০১৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সংসদের অধিবেশন শেষে অধিবেশন কক্ষেই দলের কয়েকজন নেতাকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনাকে ছাড়া আওয়ামী লীগের সব নেতাকে কেনা যায়।’ প্রধানমন্ত্রীর এই উক্তিই প্রমাণ করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নৈতিক চরিত্র। আওয়ামী লীগে এখন অনেক নেতাই আছেন যারা সুবিধাবাদিতায় আচ্ছন্ন। নিজের প্রভাব-বলয়কে সংহত করতে তারা বহিরাগত, হাইব্রিড, উড়ে এসে জুড়ে বসা সন্ত্রাসী-দুর্বৃত্তদের দলে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন। অনেকে টাকার কাছে বিক্রি হয়ে এই দুর্বৃত্তদের নেতা বানিয়েছেন। দুর্বৃত্তদের অবৈধ টাকার ভাগ পেয়েছেন। এই শ্রেণির নেতাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। এমন নেতাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে অন্যায়কে প্রশ্রয়দানকারীরা লাই পেয়ে যাবেন। তাদেরও দল থেকে বহিষ্কার করা দরকার। আর শীর্ষ নেতৃত্বকেও একটু গা-ঝাড়া দেওয়া দরকার। দলের মধ্যে ঠাঁই পাওয়া আগাছা-পরগাছাগুলোকে উপড়ে ফেলা দরকার। আমাদের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শীর্ষ নেতারা দলের তৃণমূল নেতাদের সম্পর্কে সঠিক ধারণা পান না। তাদের আসল অবস্থা জানতে দেওয়া হয় না। শীর্ষ নেতৃত্বের চারপাশে যারা ভিড় করে থাকেন, তারা সাধারণত শীর্ষ নেতৃত্বের মনোরঞ্জনের জন্য কেবল ‘ভালো খবর’ সরবরাহ করেন। তারা আসল সত্য চাপা দিয়ে রেখে ‘সব ঠিকঠাক চলছে, ভালো চলছে’ বলে শীর্ষ নেতৃত্বের মন জুগিয়ে চলার চেষ্টা করেন। খুশি করার চেষ্টা করেন।

 

এই ‘খুশি’ করার ব্যাপারটা এখন আমাদের রাজনীতিতে বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। ক্ষমতাকে খুশি করার এই ঝোঁক অবশ্য বেশ প্রাচীন। আগে মোসাহেবরা রাজা-রানী-জমিদারদের খুশি করতেন। রাজা-রানীরা চলে গেছে। কিন্তু আজকের গণতন্ত্রের যুগেও খুশি-পলিটিক্স একই রকম গুরুত্বপূর্ণ। রাজধানীতে বিভিন্ন পোস্টার-ফেস্টুন দেখুন। অমুক নেতা কিংবা তমুক নেত্রীর বন্দনা ছাড়া কিছুই খুঁজে পাওয়া যাবে না। এসবের একটা সাদা বাংলা নাম আছে। তেল দেওয়া। তেলের সমস্যা হলো, যতক্ষণ সেটা বাঁশে দেওয়া হয়, পাটিগণিতে দেখেছি, অসুবিধা বাঁদরদের। কিন্তু যখন সেটা গিয়ে পড়ে নেতা-নেত্রীর পায়ে, অনেকে বলেন, তাতে নাকি তাদের চোখের ‘কোলেস্টেরল’ বেড়ে যায়। তখন দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসে। মানে অনেক কিছু, যা দেখা জরুরি, তখন আর দেখা যায় না! তবু ভালো যে শেখ হাসিনা দলে দুর্বৃত্তদের ফুলে-ফেঁপে ওঠার দৃশ্য শেষ পর্যন্ত দেখেছেন এবং এর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছেন। ভালো ফসল চাইলে আগাছা নির্মূল করতে হয়। আদর্শ কৃষক কখনো ক্ষেতে আগাছা জমতে দেন না। প্রধানমন্ত্রী দলের আগাছা-পরগাছা দূর করতে কতদিন এবং কতদূর পর্যন্ত নিড়ানি চালান এখন সেটাই দেখার বিষয়।

 

লেখক

লেখক ও কলামনিস্ট

[email protected]

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত