ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত হত্যা

ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে জীবন শঙ্কায় বাবা

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০১৯, ০৩:২১ এএম

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাস হত্যার দুই বছর পার হতে চললেও এখনো আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিতে পারেনি পুলিশ। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত কয়েকজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও তাদের স্বীকারোক্তিতে উল্লেখ করা খুনের ‘নির্দেশদাতা’ এখন প্রকাশ্যে চলাফেরা করছে। এ পরিস্থিতিতে গত শুক্রবার ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন খুনের শিকার সুদীপ্তের বাবা শিক্ষক মেঘনাথ বিশ্বাস বাবুল। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে আমি আর আমার পরিবার আজ আমাদের জীবন নিয়ে শঙ্কিত।’ তবে চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বলছে, মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই চার্জশিট দেওয়া হবে।

এর আগে ২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর সকালে নগরীর দক্ষিণ নালাপাড়ার বাসা থেকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাসকে। এ ঘটনায় সুদীপ্তের বাবা মেঘনাথ বিশ্বাস বাবুল বাদী হয়ে সদরঘাট থানায় অজ্ঞাত পরিচয় সাত-আটজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। হত্যাকাণ্ডের এক বছর পর বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত পিবিআইকে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছরের নভেম্বর মাসে মামলাটির তদন্ত শুরু করে পিবিআই।

জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক সন্তোষ চাকমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুদীপ্ত হত্যা মামলায় ইতিমধ্যে ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে কয়েকজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। এই মামলার তদন্ত একদম শেষ পর্যায়ে, শিগগিরই চার্জশিট দেওয়া হবে।’

এদিকে ফেইসবুকে লেখালেখির কারণে দিদারুল আলম মাসুমের নির্দেশে সুদীপ্তকে খুন করা হয়েছে বলে সুদীপ্ত হত্যাকাণ্ডের পর থেকে নগর ছাত্রলীগের একাংশের নেতারা অভিযোগ করে আসছিলেন। এই মামলায় গ্রেপ্তার মোক্তার হোসেন ও ফয়সাল আহমেদ পাপ্পু বড় ভাইয়ের নির্দেশে সুদীপ্তকে পিটিয়ে হত্যা করেছে উল্লেখ করে আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়। তবে বড় ভাই হিসেবে তখন তারা কারও নাম উল্লেখ করেননি। তবে গত ১২ জুলাই মিজানুর রহমান নামে আরেক আসামি দিদারুল আলম মাসুমের নির্দেশে ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্তকে হত্যা করা হয়েছে বলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

পরে এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চট্টগ্রামের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে দিদারুল আলম মাসুমের দুটি অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করে জব্দের নির্দেশনা দেওয়া হয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লাইসেন্স বাতিল করে অস্ত্র দুটি জব্দের বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনারকে গত ৩১ জুলাই চিঠি দেন। পরে সিএমপির বিশেষ শাখা গত পহেলা আগস্ট খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অস্ত্র দুটি জব্দের নির্দেশ দেন। নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে পরদিন অস্ত্র ২টি জব্দ করতে মাসুমের বাসায় গিয়েছিল পুলিশ। তখন অস্ত্রগুলো না পেয়ে নোটিস দিয়ে আসে। তবে এর পরদিন ৩ আগস্ট মাসুম নিজে খুলশী থানায় গিয়ে অস্ত্র দুটি জমা দিয়ে আসেন। পরদিন ৪ আগস্ট রাতে সুদীপ্ত হত্যা মামলায় দিদারুল আলম মাসুমকে রাজধানী ঢাকার বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। পরে ৫ আগস্ট তাকে চট্টগ্রামের আদালতে হাজির করে সুদীপ্ত হত্যা মামলায় ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা। বিচারক ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। ৪২ দিন কারাগারে থাকার পর গত ১৫ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্ত হন মাসুম।

এদিকে গত শুক্রবার খুন হওয়া সুদীপ্তের বাবা মেঘনাথ বিশ্বাস ফেইসবুকে আবেগঘন বিশাল একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সেখানে তিনি ছেলে সুদীপ্তকে হত্যার নির্দেশদাতা দিদারুল আলমকে ইঙ্গিত করে লিখেছেন, ‘২০১৭ সালে ৫ অক্টোবর’ এই দিন শেষবারের মতো ছেলেটা আমাকে বাবা বলে ডেকেছিল। লক্ষ্মীপূজা ছিল। সকালে আমি বেরুচ্ছিলাম, এই সময় খুব সংকোচের সঙ্গে বাবা ডেকে ছেলেটা আমার কাছে ২০ টাকা চাইল। প্রায়ই চাইত। আমি ঝাঁঝিয়ে উঠলাম। আর কত দেব তোকে? পকেটে ভাংতি ৩০ টাকা ছিল, তাই দিলাম। ছেলেটার মুখে সেই আমার শেষ বাবা ডাক শুনা। শুধুমাত্র প্রতিবাদের কারণে লালখান বাজারের এক বড় ভাইয়ের নির্দেশে একদল তারই পালিত হায়েনা লোহার রড, হকিস্টিক, চাপাতিসহ অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। মানুষ মানুষকে এভাবে মারতে পারে? শরীরে এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে তাকে নির্মম-অমানুষিকভাবে আঘাত করা হয়নি। ডান হাতটা ভাঙা ছিল। সে কারণে একটুও প্রতিরোধ করতে পারেনি।’

প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি আরও লেখেন, ‘আমার ছেলেটা মহানগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক ছিল। সুস্থধারার রাজনীতি করত সে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং চট্টলবীর মরহুম এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরীর একনিষ্ঠ ভক্ত ছিল সে। কোনো টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজির সঙ্গে কখনো জড়িত ছিল না। আমার সেই ছেলেটাকে প্রকাশ্য দিবালোকে বরগুনার সেই রিফাত শরীফ হত্যার মতো একই কায়দায় অভিন্ন পন্থায় পিটিয়ে মারা হলো। হত্যার ভিডিও করা হলো। নির্দেশদাতা শুধু খুনিদের পাঠালেন না, নির্দেশ দিলেনÑ পেটানোর ভিডিও করবি। ওই ভিডিও আমি দেখব, তারপর নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যাব। কী বীভৎস!’

মেঘনাথ লেখেন, ‘ছেলেটাকে হত্যার পর ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় আকুলতা জানিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটা আবেদনপত্র দিয়েছিলাম। ভীষণ ব্যস্ততার মধ্যে প্রতিদিনে হাজারো চিঠির ভিড়ে আমার আবেদন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসবে সে রকম সৌভাগ্য নিয়ে আমার জন্ম হয়নি। মাননীয় যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাহেব বিচারের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু চার্জশিট এখনো দেওয়া হয়নি। কখন দেওয়া হবে বা আদৌ দেওয়া হবে কিনা জানি না।’

দিদারুল আলম মাসুমকে ইঙ্গিত করে সুদীপ্তের বাবা লেখেন- ‘কোথায় লালখান বাজার আর কোথায় নালাপাড়া। লোকটার নির্দেশে নালাপাড়া এসে আমার ছেলেকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে এনে দিবালোকে পিটিয়ে মেরে ফেলতে পারে তাদের পক্ষে সবই সম্ভব এবং তখন আমার পরিবারকে মানুষের কাছে হাত পাতা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। আপনার একটা অডিও টেপ ‘গ্রেপ্তারের সেই ভয়ংকর রাত’ নাম দিয়ে ফেইসবুকে ছেড়েছেন। ঘৃণায় সেটা শুনার মানসিকতা আমার নেই। চেহারা দেখার মানসিকতাও আমার নেই।’

ফেইসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসের বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় সুদীপ্তের বাবা মেঘনাথ বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার সন্তানের বিচার চেয়ে আমি একটা স্ট্যাটাস দিয়েছি। সেখানে আমি ডিটেইলস লিখেছি। হত্যাকাণ্ডের ২ বছর পার হলেও এখনো চার্জশিট দেওয়া হয়নি। আমার এখন শেষ বয়স। মৃত্যুর আগে অন্তত আমার ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে মরতে পারি। যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তাদের বিচারের পাশাপাশি জবানবন্দিতে নির্দেশদাতা হিসেবে যেই দিদারুল আলম মাসুমের নাম এসেছে, তারও শাস্তি চাই। বর্তমানে নিজ পরিবার ও জীবন নিয়ে শঙ্কা এবং নিরাপত্তাহীনতায় আছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত