‘জামায়াত নেতার’ বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন!

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০১৯, ১২:২৫ এএম

দেশে চলমান ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের শুরু থেকেই আলোচনার তুঙ্গে থাকা ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও তার সহযোগী আরমানকে গতকাল রবিবার ভোরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের আলকরা ইউনিয়নের একটি বাড়ি থেকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে র‌্যাব। ভারত সীমান্তবর্তী কুঞ্জশ্রীপুর গ্রামের ওই বাড়িটির মালিক মনির হোসেন চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি, যিনি এলাকায় জামায়াত নেতা ও ছক্কা মিয়া নামে পরিচিত। সপরিবারে থাকেন

ফেনীতে। বাবা প্রয়াত শামসুদ্দিন। বর্তমানে স্থানীয় রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হলেও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় জামায়াতের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে এলাকায় পরিচিতি ছিল এই মনির চৌধুরীর। তিনি পরিবহন ও ফিলিং স্টেশন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে।

র‌্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্যাসিনো ও জুয়াবিরোধী অভিযানের পর আত্মগোপনে চলে যান ঢাকার ক্যাসিনোসম্রাট হিসেবে পরিচিতি পাওয়া ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। তাকে আটক করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর থাকায় চৌদ্দগ্রামের কুঞ্জশ্রীপুর গ্রামের মনির চৌধুরীর বাড়িতে তিন দিন ধরে আত্মগোপনে ছিলেন সম্রাট ও তার সহযোগী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সহসভাপতি এনামুল হক আরমান (আরমান আলী)।

সরেজমিনে দেখা যায়, ভারত সীমান্ত থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে জামায়াত সমর্থক-অধ্যুষিত কুঞ্জশ্রীপুর গ্রামে মনির চৌধুরীর আলোচিত ওই বাড়িটির অবস্থান। এলাকাবাসী জানায়, বাড়িটি দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ ছিল। র‌্যাবের অভিযানের কয়েক দিন আগে বাড়িটিতে অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা লক্ষ করা যায়। কয়েক দিন ধরে অপরিচিত লোকজন বাড়িটিতে আসা-যাওয়া করেছে। বাড়ির বাইরেও অনেককে ঘোরাফেরা করতে দেখেছে গ্রামের বাসিন্দারা। এলাকার এবং ওই বাড়িতে আসা নতুন অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য থাকা লোকজন জানত, ঢাকা থেকে কিছু মেহমান বেড়াতে এসেছেন। সেখান থেকে ভারতে বেড়াতে যাবেন তারা।

আলকরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম ফারুক হেলাল দেশ রূপান্তরকে জানান, মনির হোসেন এলাকায় জামায়াত নেতা হিসেবে পরিচিত। তিনি স্টার লাইন পরিবহনের একজন পরিচালক এবং সম্রাটের দূরসম্পর্কের খালাতো ভাই। মনিরের ভগ্নিপতি ফেনী পৌরসভার মেয়র হাজি মো. আলাউদ্দিন স্টার লাইন পরিবহনের মালিক। আলাউদ্দিন একসময় জাতীয় পার্টি করলেও এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আছেন।

চেয়ারম্যান গোলাম ফারুক বলেন, ‘যে বাড়িতে সম্রাট আশ্রয় নিয়েছিলেন ওই বাড়ির মালিক মনির চৌধুরী জামায়াতের সমর্থক। ছাত্রজীবনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জামায়াতের নেতাদের বিভিন্ন রকম দায়িত্ব থাকে, মনির চৌধুরী জামায়াতে ইসলামীর সব কাজে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করতেন।’

মনির চৌধুরীর জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য জানিয়েছেন আলকরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মতিন। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে জামায়াতে ইসলামীর কর্মকাণ্ডে মনির চৌধুরীকে অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে।

এ ছাড়া এলাকার বিভিন্ন বয়সী মানুষ জানান, মনির চৌধুরী জামায়াতের সমর্থক। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় বসবাস না করলেও গত শুক্রবার আলকরা মসজিদে এসে নামাজ পড়েন তিনি।

যে বাড়ি থেকে যুবলীগ নেতা সম্রাটকে আটকের কথা বলছে র‌্যাব, তার পাশেই থাকেন রাজমিস্ত্রি শহিদুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে মনির চৌধুরীর বাড়িটি বন্ধ ছিল। তবে গত কয়েক দিনে বেশ কয়েকজনকে যাতায়াত করতে দেখেছি। বাড়ির ভেতরে থাকা দুটি পুকুরে মাছ ধরতেন চার-পাঁচজন লোক। মাঝেমধ্যে মাছের খাবারের জন্য বাড়ির পাশের দোকানে আসতে দেখেছি। তবে তাদের কেন আটক করা হয়েছে তা জানি না।’

বাড়ির মালিক মনির চৌধুরীর বোন নাজু বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘র‌্যাব যাদের ধরে নিয়ে গেছে তারা চার দিন আগে এই বাড়িতে এসে দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে ওঠেন। সেখানেই তাদের খাবার দেওয়া হতো। কখনো বাসার বাইরে বের হতেন না। আমাদের জানানো হয়, তারা বেড়াতে এসেছেন।’

র‌্যাবের অভিযানের সময় মনির চৌধুরী ওই বাড়িটিতেই অবস্থান করছিলেন বলেও জানান নাজু বেগম।

মনির চৌধুরীর ভাই মানিক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শনিবার রাত ৯টায় দুটি গাড়ি এসে বাড়ির সামনে দাঁড়ায়। আধা ঘণ্টা পর বেশ কয়েকটি র‌্যাবের গাড়ি বাড়ির সামনে অবস্থান নেয় এবং র‌্যাব সদস্যরা পুরো বাড়ি ঘিরে ফেলে। রাত ১২টার কিছুক্ষণ পর সম্রাট ও আরমানকে নিয়ে চলে যায় র‌্যাব সদস্যরা। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সকাল পর্যন্ত বাড়ির সামনে অবস্থান নেয়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত