একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েও রেলের সেবার মান বাড়ানো যাচ্ছে না। তবে সড়কের পাশাপাশি রেলের সেবার মান বাড়াতে সম্প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরই অংশ হিসেবে ১ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে রেলের জন্য ২০০ নতুন বগি কেনা হবে। তবে প্রতিটি বগির দাম ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বেশি ধরা হয়েছে। সম্প্রতি রেল বিভাগ এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। প্রস্তাবের ওপর গত সপ্তাহে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। ব্যয়প্রস্তাবে আপত্তি তুলে তা সংশোধন করতে বলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
সভার কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, বাড়তি ব্যয়ের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে পরিকল্পনা কমিশন বলেছে, এটা অনেক বেশি, তা কমাতে হবে। শুধু তা-ই নয়, এ প্রকল্পে গাড়ি কেনা না হলেও রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে। এভাবে বিভিন্ন খাতে অযৌক্তিক ব্যয় ধরায় আপত্তি জানিয়ে তা সংশোধন করতে বলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
রেল বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ে ব্রডগেজে যাত্রীবাহী বগি বা কোচ প্রায় ৪৪ শতাংশ আয়ুষ্কালহীন। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে নতুন ২০০ বগি কেনার চিন্তা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। উন্নতমানের কোচ কেনার জন্য রেলপথ মন্ত্রণালয় একটি প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায়।
পিইসি সভার কার্যপত্র থেকে আরও জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার জন্য রেল বিভাগের নিজস্ব লোকবল দিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। অথচ সেই ব্যয় ও উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) প্রণয়ন, এমনকি চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যয়ও এ প্রকল্পে ধরা হয়েছে, যা মোটেই ঠিক হয়নি। তা সংশোধন করতে হবে বলে সভায় বলা হয়। শুধু তা-ই নয়, প্রতিটি ব্রডগেজ কোচে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। অথচ এবিডির অর্থে সমজাতীয় একই ধরনের ৫০টি ব্রডগেজ কোচের প্রতিটি ৪ কোটি ৬১ লাখ টাকায় কেনা। এ হিসাবে এই প্রকল্পের প্রস্তাবে প্রতিটি
কোচে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে। প্রস্তাবিত এই দর অত্যধিক ও অযৌক্তিক বলে সভায় উল্লেখ করা হয়।
এ বিষয়ে রেল বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সৈয়দ ফারুক আহমেদ বলেন, ‘অন্য প্রকল্পের সঙ্গে এর ব্যয় মিলবে না। কারণ এই প্রকল্পে ২০০ কোচের মধ্যে কয়েকটি হাইফাই কোচ কেনা হবে। এ ছাড়া ট্যুরিস্টদের জন্য ব্যয়বহুল কোচ কেনার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।’
পিইসি সভার কার্যপত্র থেকে আরও জানা যায়, প্রকল্প প্রস্তাবে কোনো গাড়ি কেনার কথা বলা না হলেও বিভিন্ন গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি বাবদ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এটা বিভ্রান্তিমূলক। তাই বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া দরকার বলে সভায় রেল মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়।
রেল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের ৪২৮টি ব্রডগেজ কোচ রয়েছে। এর মধ্যে ১৮৭টির আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে, যা মোট বগির প্রায় ৪৪ শতাংশ। ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে সব পুরনো কোচ হস্তান্তর করা হবে। এ ছাড়া পদ্মা সেতু, আলাদা যমুনা রেল সেতু চালু এবং পাশের দেশের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থাও চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য দুই থেকে চার বছরের মধ্যে প্রায় ৪০০ পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ যাত্রীবাহী ক্যারেজ (কোচ) বদলানো হবে।
তবে সার্বিক দিক বিবেচনা করে বর্তমানে আধুনিক, নিরাপদ ও উন্নতমানের ২০০ যাত্রীবাহী ব্রডগেজ কোচ যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে মন্ত্রণালয়। ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর বিভাগের মধ্যে চলাচলকারী ব্রডগেজে এসব কোচ ব্যবহার করা হবে। এ জন্য রেল মন্ত্রণালয় থেকে ১ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০ কোচ কেনা হবে। এতে ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের ঋণ ধরা হয়েছে ১ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। বাকি অর্থ সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয় করা হবে। চলতি বছর থেকে ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে এসব কোচ কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ জন্য রেলপথ মন্ত্রণালয় ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২০০ ব্রডগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ সংগ্রহ’ নামের এই প্রকল্পের পুনঃসংশোধিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে এলে যাচাই-বাছাই করে চ‚ড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হবে বলে জানা গেছে।
