বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, ছাত্রলীগের নির্যাতনের ভয়ে তারা রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ করতে ভয় পান। তাদের অভিযোগ, হলে র্যাগ নিষিদ্ধ হলেও নানারকম নির্যাতন করেন হলের ছাত্রলীগ নেতারা। ফাহাদ হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ছাত্রদের বিভিন্নভাবে নির্যাতন করার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। আবাসিক ছাত্ররা বলছেন, বিরুদ্ধ মতপ্রকাশ করলে অকারণে ছাত্রদের ছাত্রশিবির সন্দেহ করে নির্যাতন করা হয়।
এ সময় শিক্ষার্থীরা দেশ রূপান্তরের কাছে বুয়েটের র্যাগের ভয়াবহ অবস্থার কথা তুলে ধরেন। শিক্ষার্থীরা বলেন, র্যাগের নামে আবরার হত্যাকান্ডের সঙ্গে অভিযুক্তরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের নানাভাবে নির্যাতন করত। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি র্যাগ দিত ১৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী অমিত সাহা। ছাত্রলীগ শেরেবাংলা হলের যে ২০১১ নম্বর কক্ষে বিভিন্নজনকে টর্চার করত, অমিত সাহা ওই কক্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী। সে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের উপ-আইন বিষয়ক সম্পাদক।
সরেজমিনে বুয়েটের বিভিন্ন আবাসিক হলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আবাসিক হলে বিভিন্ন ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ছাত্রলীগ। যদিও হলে সিটের জন্য ছাত্রলীগের নেতাদের দ্বারস্থ হতে হয় না তবুও ছাত্রলীগের বিভিন্ন প্রোগ্রামে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের যেতে বাধ্য করেন। এ ক্ষেত্রে কেউ প্রোগ্রামে না গেলে তাকে ‘শিবির ট্যাগ’ দিয়ে মারধর করে পুলিশে দিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়াও হলের বিভিন্ন ইস্যুতে সমালোচনা করলে শিবির ট্যাগ দেওয়া হয় বলে জানান শিক্ষার্থীরা। মূলত এ ভয়ে শিক্ষার্থীরা ভয়ে কথা বলতে পারেন না। এছাড়াও র্যাগের নামে সিনিয়ররা জুনিয়র শিক্ষার্থীদের থাপ্পড় এবং শারীরিক নির্যাতন করেন বলে জানা যায়।
এমনি এক অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের তৃতীয় বর্ষের ১৬তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি যখন প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী তখন রাজনৈতিক প্রোগ্রামে যেতে আমাকে বাধ্য করা হয়। একবার প্রোগ্রামে না যাওয়ায় আমাকে থাপ্পড় মারা হয়। ক্লাস ওয়ানে সর্বশেষ আমার বাবা আমাকে মেরেছেন। অথচ বিশ^বিদ্যালয়ে এসে আমাকে থাপ্পড় খেতে হয়। প্রশাসনকে জানিয়ে লাভ হয় না, তাই বলা হয় না।’
জানতে চাইলে শেরেবাংলা হলের আবাসিক শিক্ষার্থী রাশেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন তো ছাত্রলীগ চালায় হল। আমরা তো মানুষ। আমাদের বিভিন্ন সময় বাইরে থাকতে হয়। কিন্তু প্রোগ্রামে না গেলে তারা হলে থাকতে দেবে না বলে হুমকি দেয়।’
১৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের উপ-আইন বিষয়ক সম্পাদক অমিত সাহার বিরুদ্ধে র্যাগের বিস্তর অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার জুনিয়র ব্যাচ ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অমিত র্যাগের নামে ভয়াবহ নির্যাতন করে। গত বছর ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের আগে বুয়েটে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা আগমন উপলক্ষে প্রোগ্রামে ডাকা হয়। কিন্তু সেখানে তাদের সহপাঠী ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক বিষয়ে অধ্যয়নরত এক শিক্ষার্থীকে প্রোগ্রামে না যাওয়ায় হলের ছাদে পিটিয়ে তার হাত ভেঙে ফেলে অমিত। কিন্তু বড় ভাইরা তার চিকিৎসার কথা বলে বিভিন্ন হুমকি দিয়ে তাদের চুপ করিয়ে দেয়। যদিও তার চিকিৎসার খরচ পরে আর দেওয়া হয়নি।
ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেসের (ইসকন) সদস্য অমিত সাহা। ইসকনের ব্যানারে তিনি বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ম নিয়ে বিভিন্ন স্ট্যাটাস দিতেন। তবে ঘটনার পর থেকে তার ফেইসবুক ডিঅ্যাকটিভ আছে। তার মোবাইল নম্বরও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। অভিযোগের বিষয় জানতে অমিতের মুঠোফোনে কয়েকবার চেষ্টা করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।
এদিকে র্যাগের নামে বিভিন্ন শিক্ষার্থীকে নির্যাতন করার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। যদিও হলগুলোর গেটে ‘র্যাগ অপরাধ’ ‘র্যাগকে না বলুন’ ইত্যাদি বিভিন্ন স্লোগানসহ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ থেকে ব্যানার টানানো হয়। সেখানে বিভিন্ন শিক্ষকের নাম্বারও দেওয়া আছে। যদিও হলের শিক্ষার্থীরা বলছেন খাতা-কলমে লেখা থাকলেও বাস্তবে র্যাগ দেওয়া হয়। র্যাগের নামে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করা হয়।
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, ছাত্রদের বিভিন্ন ধাপে র্যাগ দেওয়া হয়। প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী যখন হলে আসে তখন তার সিনিয়ররা বিভিন্ন সময়ে তাকে ডাকে। গান গাইতে বলে। মাথায় পানি দিতে বলে। বিভিন্ন সমস্যা উল্লেখ করে ধমক দেয়। উদ্দেশ্য, সিনিয়রকে যেন ভয় পায়। এছাড়াও ছাদে ডেকে বিভিন্ন সময় থাপ্পড় দেয়, শারীরিক নির্যাতন করা হয়।
জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বুয়েটের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘র্যাগের নামে শিক্ষার্থীদের থাপ্পড় ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়। মূলত প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা র্যাগের শিকার হয়। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কালচার হতে পারে না। বন্ধ করা উচিত।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চেয়ে বুয়েট ছাত্রকল্যাণের পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমানের মুঠোফোনে কয়েকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
