বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের সূত্র ধরে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার যে দাবি উঠেছে, তা নতুন করে এক পুরনো বিতর্ককে উসকে দিয়েছে। কেবল একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নয়, পুরো দেশে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিও এর আগে বিভিন্ন সময়ে শোনা গেছে। তবে সংগত কারণেই তা যেমন হয়নি, তেমনি আলোচনা-সমালোচনার বাইরে এই সংকট সমাধানে কোনো কার্যকর উদ্যোগও দেখা যায়নি। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তাই অনেকটা মাথাব্যথার চিকিৎসা না করে মাথা কেটে ফেলার প্রস্তাবের মতোই আত্মঘাতী ও অদূরদর্শী। বর্তমানে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে সংকটকে সাধারণভাবে ‘ছাত্ররাজনীতির সংকট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে তা আসল রোগ নয়; রোগের বহিঃপ্রকাশ বা উপসর্গ মাত্র। রোগটা আরও সর্বব্যাপী।
ছাত্ররাজনীতির আলোচনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও পরিচালনা সংক্রান্ত আলোচনা ছাড়া অর্থবহ হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য কেবল শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পাঠ দেওয়া নয়; বরং জ্ঞানচর্চা করা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিবিড় আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে সেই জ্ঞানের চর্চা হবে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণার মধ্য দিয়ে নতুন জ্ঞান বিকাশের পথ তৈরি হবে। এজন্য শ্রেণিকক্ষের মতো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও মুক্ত পরিসর সমান জরুরি। এই মুক্ত পরিসর কেবল ভৌত অর্থে স্থান নয়; বরং সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক জ্ঞানতাত্তি¡ক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পরিসর। কিন্তু আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই মুক্ত পরিসর ক্রমাগতই সংকুচিত হচ্ছে। বলা ভালো সংকুচিত হতে হতে তা বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত মৌলিক ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম দিন দিন প্রকৃত জ্ঞানচর্চা থেকে সরে এসে অনেকটাই ক্লাস-পরীক্ষা-সার্টিফিকেট বিতরণে সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। রাজনৈতিক মতাদর্শ, তা সে যে দলেরই হোক না কেন, যেদিন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমকে প্রভাবিত বা বাধাগ্রস্ত করতে শুরু করেছে সেদিন থেকেই এই সংকটের শুরু। রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের এই অপচর্চার দায় ছাত্ররাজনীতিতে সংশ্লিষ্টদের চেয়ে শিক্ষকরাজনীতিতে সম্পৃক্তদের কোনো অংশে কম নয়, বরং বেশি। কেননা, বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে পরিচালিত হবে তার প্রধান নিয়ামক ছাত্ররা নয়, শিক্ষকরাই। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন কি তাহলে শিক্ষকরা চালাচ্ছেন না? হ্যাঁ, শিক্ষকরাই চালাচ্ছেন। তবে এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক কাঠামোয় থাকা শিক্ষকরা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পক্ষাবলম্বনকারী বা অনুগত, অনেক ক্ষেত্রে তারা যথাযথভাবে নির্বাচিতও নন। অন্যদিকে, ক্ষমতার রাজনীতিকে আরও প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে শিক্ষক নিয়োগেও রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ দীর্ঘদিনের, যা এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। অর্থাৎ, আইনগতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন থাকলেও কার্যত বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে গণতন্ত্র চর্চার অভাব দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দশকের পর দশক ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ থাকায় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিরা অনুপস্থিত। এই সংকটের সুযোগ নিয়েই বিগত প্রায় তিন দশক ধরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থনপুষ্ট ছাত্র সংগঠনগুলোর একাধিপত্য দেখা গেছে।
ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ তো বটেই, স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশে নব্বইয়ের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে সামরিক স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ছাত্ররাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ভ‚মিকা ছিল। ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো পরবর্তী তিন দশকে ছাত্ররাজনীতি ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতাসীনদের একচেটিয়া আধিপত্যের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিন্নমতের রাজনীতির উত্থান বন্ধ করতে ক্ষমতাসীনরা নিজ দলের সমর্থক ছাত্র সংগঠনকে পেটোয়া বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা এ সুযোগে বড় দুর্বৃত্ত হিসেবে বেড়ে উঠছে। অন্যদিকে, জাতীয় রাজনীতির ক্ষমতা কাঠামোতে সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এক উল্লেখযোগ্য অংশই এখন শিক্ষা-গবেষণার প্রসারে নিজেদের দায়িত্ব-কর্তব্য ভুলে কেবল দলীয় সমর্থক প্রশাসকে পরিণত হয়েছেন। পরিস্থিতি যখন এই তখন ছাত্ররাজনীতির নামে কোনো একটি ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের হাতে একচেটিয়া ক্ষমতা তুলে দেওয়া হলে যা হওয়ার কথা ঘটছেও তাই। ফলে জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা ছাত্ররাজনীতির এই প্রত্যক্ষ যোগসূত্রের সুরাহা না করে ছাত্ররাজনীতির আজকের সংকটকে মোকাবিলা করার সুযোগ নেই। শুধু ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলে তা পরিস্থিতিকে আরও অগণতান্ত্রিক করে তুলবে।
বিদ্যমান বাস্তবতা পাল্টাতে হলে সবার আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সমাজের আর সব প্রতিষ্ঠানের মতো নানাভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠিত সব ধরনের দুর্নীতি-অনিয়ম, বলপ্রয়োগ, দমনপীড়ন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী বা শিক্ষক কোনো ফৌজদারি অপরাধ করলে কেবল ছাত্র সংগঠন বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার তার শাস্তি হতে পারে না। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার মধ্যে এই সংকটের সমাধান নেই, সমাধান কোনটি ছাত্ররাজনীতি আর কোনটি সন্ত্রাস সে পার্থক্য করতে পারার মধ্যে। এজন্য সব ছাত্র সংগঠনকেই শিক্ষা ও ছাত্র অধিকারমুখী কর্মকাণ্ডে মনোনিবেশ করতে হবে। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসগুলোতে সব ছাত্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সহাবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
