অভিযান না চলায় বাড়ছে পেঁয়াজের দাম

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ০৩:৪৩ এএম

সাম্প্রতিক সময়ে সারা দেশে পেঁয়াজ মজুদবিরোধী অভিযানের সময় পণ্যটির দাম ১২০ টাকা থেকে তরতর করে কমা শুরু করেছিল। দাম কমার তৃপ্তিতে কয়েক দিন পর বাজার নজরদারি কার্যত বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। তখন থেকেই তেজ বাড়তে শুরু করে পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের। বাজারে পর্যাপ্ত থাকার পরও আমদানি কম, পচা পেঁয়াজ ইত্যাদি সুর তুলে দাম ফের আগের পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। গত দুদিনে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন খুচরা বাজারে কেজিতে দর বেড়েছে ২০ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত।

এদিকে ভারত রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ায় ১৪ দিন ধরে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি পুরনো এলসির বিপরীতে আমদানি করা পেঁয়াজের মজুদও শেষ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় হিলিতে আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে পেঁয়াজের বাজার। দুদিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা করে বেড়েছে।

বাজারে নজরদারি না থাকায় পেঁয়াজ নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, পেঁয়াজের আমদানি ফের কমেছে। ভারতীয়টা আসছে খুব কম। মিয়ানমারের আমদানিও কমেছে; যা আসছে তার বেশিরভাগ পচা। তুরস্কেরটা তেমন চলে না। আর দেশিটার সরবরাহ নেই বললেই চলে। তবে ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এ অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে ব্যবসায়ীরাই দায়ী। কয়েক দিন আগে অভিযানের সময় প্রশাসন দায়ীদের কঠোর শাস্তি দিলে এতটা সাহস পেত না। ব্যবসায়ীরা আগে খোলা ঋণপত্রের বিপরীতে আমদানি করা পেঁয়াজ এখন বাজারে ছেড়ে বেশি মুনাফা করছেন।

দর বাড়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজধানীর শ্যামবাজার পাইকারি পেঁয়াজ ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজি মো. মাজেদ গত রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে দৈনিক পেঁয়াজ লাগে সাড়ে ছয় হাজার টন। সেখানে মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আসে ৪০০ থেকে ৫০০ টন। এতে বাজারে পেঁয়াজের সংকট শুরু হয়েছে। তাই দামও বাড়ছে।

দাম বাড়ার আরেকটা কারণ শোনান তিনি। বলেন, মিয়ানমার থেকে আসা অর্ধেক পেঁয়াজই পচা। ৫০০ টন পেঁয়াজ এলে তার মধ্যে ২০০ টন পচা। সেগুলো

২০ টাকা কেজি দরেও আমরা পাইকারি বিক্রি করতে পারছি না। আর যেগুলো ভালো থাকে, তা ৭০-৭৫ টাকা দরে বিক্রি করছি।

গত মাসে ভারত যখন পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে, ওই সময় সারা দেশের পেঁয়াজের গুদামগুলোতে জরিপ চালিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশে ৫০ থেকে ৫৫ দিন চলার মতো পেঁয়াজ আছে। মন্ত্রণালয়ের ওই তথ্য জানানোর পরও মিয়ানমার, তুরস্ক ও ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। ফলে বাজারে পেঁয়াজের কোনো সংকট না থাকলেও আমদানি কম হওয়ার অজুহাতে দাম বাড়াচ্ছেন পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। গত মাসের ২৯ তারিখ পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করেছে ভারত, যার প্রভাব পড়েছিল দেশে। কিন্তু প্রায় ১৫ দিন হয়ে গেলেও পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের এখনো দেশি পেঁয়াজ বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে। মোটামুটি সব দোকানেই পাওয়া যাচ্ছে ভারতীয় পেঁয়াজ।

পেঁয়াজের দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে শ্যামবাজারের আমদানিকারক ও পাইকারি বিক্রেতা মো. হাফিজ বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে যেসব পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে সেখানে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ পেঁয়াজ নষ্ট বের হচ্ছে। প্রথম দিকে মিয়ানমার থেকে এভাবে পেঁয়াজ আনলেও এখন সেখানে খুব বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। যে কারণে সরবরাহে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এটাই দাম বাড়ার বড় কারণ।’ ১৫ দিন আগে বন্ধ হওয়ার পরও ভারতীয় পেঁয়াজ কোথা থেকে আসছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগের কেনা কিছু কিছু সবার কাছেই ছিল। সেগুলোই বিক্রি হচ্ছে।’

গতকাল রাজধানীর কয়েকটি খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১০০-১১০ টাকায়, যা দুদিন আগে ছিল ৭৫-৮০ টাকা। তবে কোনো কোনো দোকানিকে ৯৫ টাকায়ও বিক্রি করতে দেখা গেছে। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে দাম বেড়েছে ২৫-৩০ টাকা। এদিকে আমদানি করা প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৯০-৯৫ টাকায়, যা আগে ছিল ৬৫-৭৫ টাকার মধ্যে। অর্থাৎ আমদানি করা পেঁয়াজেও কেজিতে দাম বেড়েছে ২০-২৫ টাকা।

একইভাবে পাইকারি বাজারেও পেঁয়াজের দাম বাড়তি। শ্যামবাজার ও কারওয়ানবাজারের আড়তগুলোতে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ গতকাল ৯২-১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৭৫-৮৫ টাকায়।

দেশি পেঁয়াজ কত টাকায় বিক্রি হচ্ছে তা জানতে চাইলে সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা আনিস বলেন, ‘দাম চাইলে ১১০ টাকা। যদি নেন, তবে একদাম ১০০ টাকা নিতে পারবেন। কারও কাছেই এর থেইকা কমে পাবেন না।’ দাম এত বেশি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা পাইকারি বাজার থেইকা আনি। তাগো গিয়া ধরেন, কেন তারা দুদিন পরপর দাম বাড়ায়।’

গুলশান গুদারাঘাটের মুদি দোকান রাফসান স্টোরে গিয়ে দেখা যায়, একটি বস্তা ও একটি ঝুড়ির মধ্যে পেঁয়াজ সাজিয়ে রাখা হয়েছে। পাশের আরও তিন-চারটি দোকানেও পেঁয়াজের কোনো ঘাটতি লক্ষ করা যায়নি। তবে সব দোকানিকেই বাড়তি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে দেখা গেছে।

এদিকে আমাদের চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, গতকাল দেশের অন্যতম বৃহৎ ভোগ্যপণ্যের আড়ত খাতুনগঞ্জে পাইকারিতে ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে মানভেদে কেজি ৭৫-৮০ টাকা। গত বৃহস্পতিবার থেকে দাম হঠাৎ বেড়েই চলেছে। গত সপ্তাহে শুরুতেও এই পেঁয়াজ ৫৫-৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। মিয়ানমারের পেঁয়াজ বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৬০-৭০ টাকা। কয়েক দিন আগে তা বিক্রি হয়েছিল কেজি ৪০-৪৫ টাকায়। মিসরের আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অতিরিক্ত লাভের আশায় টেকনাফ দিয়ে নদীপথে বেশি পরিমাণ পেঁয়াজ আসছে ট্রলারে করে, যা ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি। ফলে পানিতে ভিজে পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আর চট্টগ্রামে তুরস্কের পেঁয়াজের চাহিদা নেই। এ সুযোগটাই বারবার কাজে লাগায় একশ্রেণির অসাধু আড়তদার ও আমদানিকারকরা।

খাতুনগঞ্জ হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ থাকায় সারা দেশের ব্যবসায়ীরা এখন চট্টগ্রাম ও টেকনাফমুখী হয়ে পড়েছেন। আমদানিকারকরাও কৌশলে টেকনাফ থেকে পেঁয়াজ বিক্রি করে দিচ্ছেন। আর বর্তমানে মিয়ানমারের ওপর নির্ভরশীল পেঁয়াজের বাজার। এসব কারণে ফের পেঁয়াজের দাম বাড়ানো হচ্ছে। তিনি বলেন, টিসিবির মাধ্যমে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নিলে এই সংকট কাটানো সম্ভব হবে সহজভাবে। অসাধু ব্যবসায়ীরাও এই সংকটকে পুঁজি করতে পারবেন না।

নগরীর খুচরা বাজারে মানভেদে পেঁয়াজের কেজি ভারতীয় ৯০ ও মিয়ানমারের ৭৫-৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আন্দরকিল্লা এলাকার খুচরা কাঁচাপণ্যের বিক্রেতা মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, পেঁয়াজের পাইকারি দাম বেড়েছে। তাই কেজি ৯০ টাকা দরে বিক্রি করছি। আমাদের গাড়ি ভাড়া ও শ্রমিক খরচ দিয়ে পেঁয়াজ আনতে হয়, তাই পাইকারির সঙ্গে খুচরার দামের পার্থক্য থাকবে।

এদিন নগরীর বিভিন্ন খুচরা দোকানির সঙ্গে ক্রেতাদের বাগ্বিতণ্ডার নজরে এসেছে। বংশাল রোডের বাসিন্দা প্রবীর দাশ বলেন, গত সপ্তাহে পেঁয়াজ কিনেছি ৭০ টাকা দরে, তা এখন ৯০ টাকা। সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে ২০ টাকা। দেশি পেঁয়াজ বাজারে নেই বললে চলে।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের চট্টগ্রামের সভাপতি নাজের হোসাইন বলেন, জেলা প্রসাশনের শক্ত নজরদারির অভাবেই এমনটি হচ্ছে। অভিযানের সময় আড়তদাররা কমিশন এজেন্টের দোহাই দিয়ে বেশি লাভ করতে পারে না বলেছিল। মূলত খাতুনগঞ্জের আড়তদার ও আমদানিকারকরাই এই অস্থিরতার জন্য দায়ী। প্রশাসন জেল-জরিমানা করলে এতটা সাহস পেত না। ব্যবসায়ীরা আগে খোলা ঋণপত্রের বিপরীতে আমদানি করা পেঁয়াজ এখন বাজারে ছেড়ে বেশি মুনাফা করছে।

হিলিতে ফের অস্থিতিশীল বাজার : ভারত রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ায় ১৪ দিন ধরে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি পুরনো এলসির বিপরীতে আমদানি করা পেঁয়াজের মজুদও শেষ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় হিলিতে আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে পেঁয়াজের বাজার। দুদিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা করে বেড়েছে।

আমদানিকারকরা বলছেন, মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় দুদিন আগেও যে পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে তা এখন ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আমদানি না হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটির দাম আবারও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন তারা।

সরেজমিন দেখা গেছে, পুরনো এলসির বিপরীতে আমদানি করা পেঁয়াজ শেষ হয়ে যাওয়ায় গুদাম বন্ধ রেখেছেন অনেকে। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন পেঁয়াজ বিক্রেতা জানান, অনেকের গুদামে পেঁয়াজের মজুদ রয়েছে। ভারত থেকে আমদানি বন্ধ থাকায় সুযোগমতো সেগুলো বাজারে ছাড়বেন তারা। পেঁয়াজের দাম আরও একধাপ বাড়িয়ে নিতেই তারা এমনটি করছেন।

হিলিতে পেঁয়াজ কিনতে আসা পাইকার রফিকুল ইসলাম ও সুজন হোসেন জানান, কয়েক দিন আগেও হিলি থেকে তারা ৪০-৪৫ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ কিনেছিলেন। দুদিন আগেও ৫০-৫৫ টাকা দরে কিনেছেন। এখন তা কিনতে হচ্ছে ৭০ টাকা কেজি দরে।

হিলি বাজারের খুচরা পেঁয়াজ বিক্রেতা রেজাউল ইসলাম বলেন, আমরা যেমন দামে পেঁয়াজ কিনি তার সঙ্গে কিছু লাভ যোগ করে তা বিক্রি করি। তিন দিন আগে প্রতি কেজি পেঁয়াজ আমরা ৫০-৫২ টাকা কেজি দরে কিনে বিক্রি করেছিলাম ৫৫ টাকায়। গতকাল ৬৫ টাকা কিনে ৭০ টাকায় বিক্রি করছি। কেউ কেউ ৭৫ টাকা কেজি দরেও বিক্রি করছে।

হিলি স্থলবন্দরের পেঁয়াজ আমদানিকারক বাবলুর রহমান বলেন, ভারত থেকে আমদানি বন্ধ থাকায় ও চাহিদা বাড়ায় আবারও পণ্যটির দাম বাড়তে শুরু করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যদি ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে কোনো ব্যবস্থা করতে পারত তবে দাম কমত। একই কথা বলেন হিলি স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সভাপতি হারুন উর রশীদ হারুনও।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত