‘জীবনে অনেক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক করেছি। কিন্তু একটা পচা মালের কাছে ফেঁসে গেছি।’ পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এমন ভাষায় স্বীকারোক্তি দিয়েছেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব
(সাময়িক বরখাস্ত) এ কে এম রেজাউল করিম রতন। মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজের এক ছাত্রীর করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করেছে হাজারীবাগ থানা পুলিশ। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গত রবিবার তাকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে বিচারক জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। বর্তমানে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন রেজাউল করিম রতন।
তিনি বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা। গত বছর কোটায় উপসচিব পদে পদোন্নতি পান। বর্তমানে তিনি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রন্থাগার অধিদপ্তরের উপসচিব (সাময়িক বরখাস্ত) হিসেবে কর্মরত। এর আগে মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন তিনি।
রতনকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের ধানমণ্ডি জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার আবদুল্লাহিল কাফি দেশ রূপান্তরকে জানান, এক ছাত্রীই শুধু নয়, মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজের আরও কয়েক ছাত্রী রতনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছে। হয়রানির প্রতিবাদ করায় রতন এক ছাত্রীকে রিকশায় করে যাওয়ার সময় মারধরও করেছেন। গত ১০ সেপ্টেম্বর এক ছাত্রীর বাসায় অবস্থানকালে তাকে হাতেনাতে আটক করে স্থানীয় লোকজন।
আবদুল্লাহিল কাফি বলেন, ‘শনিবার রাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর রতনকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় তিনি বহু নারীর সঙ্গে সম্পর্ক করার বিষয়ে স্বীকার করেন। একপর্যায়ে তার কাছে (রতন) জানতে চাওয়া হয় বিয়ে না করে কেন এসব সম্পর্ক করেছেন। এর জবাবে তিনি বলেন, বিয়ে হয়নি, তবে হবে। অনৈতিক বলে কিছু নেই। জীবনে বহু মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক করেছি। কিন্তু একটা পচা মালের (তার ছাত্রী) কাছে ফেঁসে গেছি।’
রতনের নির্যাতনের তথ্য তুলে ধরে মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজের এক ছাত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিনি প্রথমে শিক্ষক হিসেবে কথা বলেন। পরে ছাত্রীদের দুর্বল দিকগুলো জানার চেষ্টা করেন। ছাত্রীদের দুর্বল দিকগুলো খুঁজে বের করে কৌশলে তিনি সম্পর্ক স্থাপন করেন। দুর্বল কিছু মুহূর্তের ভিডিও করে রেখে সেগুলো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে তিনি পরে তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে বাধ্য করেন।’
রতনের বিষয়ে এক ছাত্রী পুলিশের কাছে বলেছেন, ২০১৬ সালের জুন মাসে তিনি মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হন। ভর্তির প্রক্রিয়া চলার সময় রতন তার সঙ্গে কথা বলেন এবং ফোন নম্বর নেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে ফোন করে তার (ছাত্রী) খোঁজখবর নিতে থাকে। একপর্যায়ে ২০১৭ সালে ওই ছাত্রীকে কলেজে তার (অধ্যক্ষ) কক্ষে ডেকে নেন। সেখানে তাকে কোকা-কোলা ও কেক খেতে দেন। কোকের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মেশানো ছিল। সেটা পান করার পর ওই ছাত্রী অচেতন হয়ে পড়েন। ছাত্রী বলেন, আমি যখন তার সঙ্গে বসে কথা বলছিলাম তখন চেয়ারে বসা ছিলাম। আমার যখন জ্ঞান ফেরে, তখন দেখি আমি সোফার ওপর শোয়া। আমার গায়ে কাপড় নেই। স্যারের (রতন) হাত আমার বুকের বিশেষ স্থানে। এ সময় তিনি আমার পাশেই চেয়ারে বসা ছিলেন। তিনি ঘামছিলেন এবং হাঁফাচ্ছিলেন। আমি তাকে বলি, আপনি আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ‘সর্বনাশ’ করেছেন। তখন তিনি বলেন, ‘আমি তোমাকে নানাভাবে অফার করেছি। তুমি রাজি হওনি। তাই বাধ্য হয়ে এটা করতে হয়েছে।’ ছাত্রী আরও বলেন, আমি বলি যে ঘটনা সবার কাছে প্রকাশ করে দেব। তখন তিনি (রতন) আমাকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘তোমার সবকিছু ভিডিও করে রেখেছি। বেশি বাড়াবাড়ি করলে সব ইন্টারনেটে ছেড়ে দেব।’
ছাত্রী আরও বলেন, ওই ঘটনার পর আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। দুদিন পরই স্যার (রতন) আমাকে আবার ফোন করেন। বলেন, ‘তোমার ভিডিওগুলো নিয়ে যাও।’ আমি ভিডিও নিতে গেলে তিনি আবারও জবরদস্তি করে আমাকে নির্যাতন করেন। এভাবে নানা কৌশলে তার নির্যাতন চলতে থাকে। খুব কষ্টের মধ্যে আমার দিন যেতে থাকে। আমি লজ্জায় রাস্তায় বের হতে পারি না। আমাকে রীতিমতো হুমকিও দেওয়া হয়। ছাত্রীর ভাষ্য, আমার বেঁচে থাকা কী যে কষ্টের, কাউকে বলে বোঝাতে পারব না। তিনি শিক্ষক হয়ে আমার জীবন শেষ করে দিয়েছেন। ওই ছাত্রী রতনের বিরুদ্ধে চলতি বছরের শুরুর দিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধানমণ্ডি থানায় একটি মামলা করেন। এ ছাড়া ওই ছাত্রী ৭ অক্টোবর হাজারীবাগ থানায় রতনের বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা করেন। রতনও পাল্টা ওই ছাত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। তিনি ওই ছাত্রীর বিরুদ্ধে পাল্টা একটি মামলা করার চেষ্টা করেন। পুলিশের কাছে দাবি করেন, ‘ওই ছাত্রী কামড়িয়ে তার ঠোঁট ছিঁড়ে ফেলেছে। তাকে মারধর করেছে। শরীরের বিভিন্ন স্থান কামড়িয়েছে এবং নখ দিয়ে আঁচড় দিয়েছে।’ কিন্তু তার দাবির পক্ষে প্রমাণ না পাওয়ায় পুলিশ তার মামলা নেয়নি।
ধানমণ্ডি থানার একজন পরিদর্শক জানান, উপসচিব রতন মামলার বিষয়ে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করেন। তিনি আগে প্রভাবশালী ব্যক্তির ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন। ওই সুবাদে পুলিশ ও জনপ্রশাসনে বহু কর্মকর্তা তার পূর্বপরিচিত। তাদের দিয়ে পুলিশের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন। এমনকি পুলিশের তার কাছে ১০ লাখ টাকা ঘুষ দাবিরও অভিযোগ তোলেন। থানমণ্ডি থানা পুলিশ রতনের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাটির তদন্তভার ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে পাঠায়। ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের তদন্ত কর্মকর্তা রতনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। পরে ওই মামলায় রতনকে জামিন দেয় আদালত।
রেজাউল করিম রতনের শাস্তি দাবি করে গত জুলাই মাসের শুরুর দিকে আন্দোলন শুরু করে মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা কয়েক দফায় সড়ক অবরোধ করেন এবং রতনের ফাঁসিসহ ৬ দফা দাবি জানান। ছাত্রছাত্রীদের দাবির মধ্যে আরও ছিল, দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রীদের নিরাপত্তা প্রদান, ধর্ষণ মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করা, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদান, কোনো প্রকার জামিন মঞ্জুর না করা। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এবং ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের একপর্যায়ে রতনকে সাময়িক বরখাস্ত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর রতন মামলার বাদী ওই ছাত্রীর ওপর চরমভাবে ক্ষিপ্ত হন। রতন ও তার স্ত্রীসহ কয়েকজন মিলে হাজারীবাগ এলাকায় রিকশায় যাওয়ার সময় ওই ছাত্রীর ওপর হামলা চালান ও মারধর করেন। যার কারণে ৭ অক্টোররের মামলাটি করা হয়। এই মামলার পর গত ১০ সেপ্টেম্বর রতন পুনরায় ওই ছাত্রীর বাসায় যান। এ সময় এলাকার লোকজন রতনকে অনুসরণ করে এবং আটক করে। হাজারীবাগ থানার মামলায় শনিবার রাতে রতনকে গ্রেপ্তার করে হাজারীবাগ থানা পুলিশ। রবিবার তাকে আদালতে পাঠানো হয়।
