জাদুকরবিহীন গিটারের এক বছর

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ১১:৪৩ পিএম

দেখতে দেখতে আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর এক বছর পার হলো। তিনি চলে গেলেও তার গান প্রতিদিন বেজে চলেছে কোথাও না কোথাও। কেউ না কেউ গেয়ে উঠছে। প্রিয় শিল্পীকে নিয়ে বলেছেন তার কাছের শিল্পীরা

তার সংগ্রামের ইতিহাসও রোমাঞ্চকর

জেমস

আশির দশকের কথা। লিড গিটারিস্ট হিসেবে ফিলিংস ব্যান্ডে যোগ দিয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। তখন থেকেই আমাদের বন্ধুত্ব। তখনই  জেনেছিলাম, সংগীতের জন্য আইয়ুব বাচ্চু কতটা নিবেদিতপ্রাণ। তার পথচলা মসৃণ ছিল না। পরিবারের অসম্মতি আর অনেক বাধা পেরিয়ে দিনের পর দিন সংগ্রাম করেই শিল্পী হিসেবে তার প্রতিষ্ঠা। সে ইতিহাস গল্পের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। এও বলেছিলেন, ‘অনেকে প্রশ্ন করেন গানের চেয়ে গিটার বাজাতেই কি বেশি ভালো লাগে? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর কখনো দিতে পারিনি। কারণ উত্তরটা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। গিটার বাজানো বা গান গাওয়া কোনোটাই সংগীতের বাইরে নয়। এ কথা ঠিক, গিটার ছাড়া কোনো আয়োজনে অংশ নেওয়ার কথা আমি ভাবতেই পারি না।’ অনেকবার বলেছি, গিটার হলো আমার তৃতীয় হাত। গানের চেয়ে গিটার বাজানো আমার কাছে কোনো অংশেই কম নয়। এর চেয়ে বড় সত্য, গান নয় গিটার আমাদের ঘরছাড়া করেছিল। গিটার শিল্পী হওয়ার বাসনায় ঘর ছেড়ে সংগীতযুদ্ধে নেমেছিলাম। যদিও পরবর্তী সময়ে আমাদের একই ব্যান্ডের হয়ে গান করা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু সময়ের পালাবদলেও বন্ধুত্ব অটুট থেকেছে। শুধু তাই নয়, একসঙ্গে কাজ করতে করতে জুটি হিসেবেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলাম আমরা। জানি, শিল্পীর মৃত্যু নেই। গিটারের বরপুত্র আইয়ুব বাচ্চু বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন তার সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। তবু পুরনো দিনের স্মৃতি মনে আঁচড় কাটবেই।

 

অসময়ে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারি না

কুমার বিশ্বজিৎ

সংগীতে আমাদের সম্পর্ক ৪৫ বছরের। ‘রিদম ৭৭’ নামে একটা গানের দল করেছিলাম। সেই সময় থেকে হিসাব করলেও ৪১ বছর। একে অন্যের অনেক ক্রিয়েশনের সাক্ষী আমরা। অনেক আবেগ অনুভ‚তির ও দুঃখ বেদনার সাক্ষী। আইয়ুব বাচ্চু যখন প্রথম ঢাকায় আসে, আমার বাসায় ছিল। অনেক দিন আমরা এক বিছানায় ঘুমিয়েছি। দুই রুমের সেই বাসাটার এক রুমে সে প্র্যাকটিস করত, আরেক রুমে আমি করতাম। খাওয়া-দাওয়া করতাম একসঙ্গে। পরে আমার বাসার পাশেই বাসা ভাড়া নেয়। জানালা দিয়ে কথা হতো। আমার বাসায়  থেকে তার প্রেম হয়, এরপর পরিণয়। সেই বিয়ের বাজার পর্যন্ত করেছিলাম। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত একসঙ্গে ছিলাম। আমার মা বাচ্চুকে আরেকটা সন্তান বানিয়েছেন। সে আমার শুধু বন্ধু না, ভাইও। অসময়ে ভাইয়ের চলে যাওয়া আজও মেনে নিতে পারি না।

 

তার কারণেই ‘সোলস’ ফিরে আসে

পার্থ বড়ুয়া

আমাকে হাতে ধরে গিটার শিখিয়েছেন বাচ্চু ভাই। তারপর অনেকদিন তার সঙ্গে কিবোর্ড বাজিয়েছি। তিনিই আমাকে ঢাকায় নিয়ে এসেছেন। আমার  পেশাদার গানের জীবনের শুরুটাও তার হাত ধরে। আমাদের ‘সোলস’ ব্যান্ডের কার্যক্রম ২০০৩ সাল থেকে বন্ধ ছিল। এরপর বাচ্চু ভাইয়ের কারণে আবার শুরু করি। তিনি সাহস দিয়েছিলেন। বলছিলেন, পারবি। চেষ্টা কর। আবার গানের মঞ্চে ফিরলাম। বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গেই মেডিকেল কলেজের একটা শো করেছিলাম।যদি আমরা কোনো ধরনের সম্মানী ছাড়াই অনুষ্ঠানটি করি তারপরও বাচ্চু ভাই আমাদের তখন ৩০ হাজার টাকা সম্মানী দেন। বলছিলেন, এটা রাখ তোরা। জোর করেই দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, তার আগেই আমাদের মঞ্চে তোলেন। এত তাড়াতাড়ি তিনি চলে যাবেন, এটা কল্পনারও বাইরে। এই সময়টায় না গেলেই কি হতো না। খুব তাড়াতাড়িই চলে গেলেন বাচ্চু ভাই।

 

শিল্পীদের বিপদে সর্বদা পাশে থাকতেন

ফাহমিদা নবী

এত বড় মাপের শিল্পী সহজে পাওয়া যায় না। তিনি যেভাবে গান গাইতেন শত বছর আগে কিংবা শত বছর পরেও এমন শিল্পী আসেনি এবং আসবে না। শিল্পী হিসেবে দেশের প্রতি ছিল তার দারুণ ভালোবাসা। প্রতিটি অনুষ্ঠান শেষ করতেন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গেয়ে। আর তিনি শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবতেন না। আপদে-বিপদে ছোট কিংবা বড় যে কোনো শিল্পীর পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন। অন্যের জন্য নিজের সর্বোচ্চটুকু দেওয়ার চেষ্টা করতেন।

 

তার গানগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি

নকীব খান

আইয়ুব বাচ্চুর মতো শিল্পীর কারণে এ দেশের ব্যান্ড সংগীত জয় করেছে  শ্রোতার অন্তর। শরীরী মৃত্যু হলেও মননের তাড়নায় রেখে গেছেন অনেক কালজয়ী গান। তার গাওয়া সেই গানগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি। এ জন্য আমরা সব শিল্পী মিলে উদ্যোগ গ্রহণ করব, যাতে শত বছর পরের শ্রোতারাও শুনতে পায় সে সব গান।

আরও অনেক দেওয়ার ছিল তার

সামিনা চৌধুরী

সময়ের আগেই চলে গেছেন আইয়ুব বাচ্চু। এমন অসময়ের মৃত্যুকে মেনে নেওয়া যায় না। এই দেশ ও এ দেশের শ্রোতাদের আরও অনেক কিছু দেওয়ার ছিল তার। এই শিল্পীর গায়কির ধরন কিংবা গিটারের বাদন বড্ড বেশি মিস করবে নতুন প্রজন্ম।

তার জন্যই এ পর্যন্ত আসা

শফিক তুহিন

আইয়ুব বাচ্চু আমার গুরু। আমি তাকে বস বলে ডাকতাম। বস মাথার ওপর হাত না রাখলে হয়তো সংগীতের এই পর্যন্ত আসা হতো না আমার। আমি গান দিয়ে যতটুকু অর্জন করেছি তার সিংহভাগই আইয়ুব বাচ্চুর অবদান। তার অনুপস্থিতিতে আমার মনটা জ্বলে। আইয়ুব বাচ্চুর সুর, সাহস আর উদ্যোগে আমার কথায় প্রথম পুরো একটি অ্যালবাম প্রকাশ হয় ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে। ‘মন জ্বলে’ নামে সেই অ্যালবামটি প্রকাশের পর আমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। মূলত এসব স্মৃতি আর ঋণের জালে আটকা পড়েই তাকে নিয়ে আমি ‘গিটার জাদুকর’ নামের একটি গান করেছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত