ক্রিকেটারদের দাবিনামার বিবেচনা জরুরি

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০১৯, ১০:১০ পিএম

দেশ-বিদেশের সীমানা পেরিয়ে কোটি বাঙালির আশা এখনো একটা স্থানেই এসে একসঙ্গে মেশে; সেটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের মাঠ। যত দিন যাচ্ছে ক্রিকেট যেন আরও ঐক্যবদ্ধ করছে, কাছে টানছে স্বপ্ন জয়ের দুঃসাহসী অভিযাত্রায়। তাই বাংলাদেশে ক্রিকেটের কোনো ভালো খবর যেমন পুরো জাতিকে উদ্বেলিত করে, তেমনি কোনো খারাপ খবরে মুষড়ে পড়ে সারা দেশের মানুষ। ক্রিকেট নিয়ে যখন দেশের মানুষ আশা আর ভালোবাসায় মেতে আছে তখন বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো দেশ-বিদেশের সংবাদ শিরোনাম হয়ে উঠল ক্রিকেটারদের আকস্মিক ধর্মঘটের খবর। এতে স্তম্ভিত হয়ে গেছে গোটা দেশ। মানুষ জানতে চায় কী হচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড-বিসিবিতে, কেন ধর্মঘটে যাচ্ছেন তাদের প্রাণপ্রিয় ক্রিকেটাররা।

এই পরিপ্রেক্ষিতে সবার আগে ক্রিকেটারদের ১১ দফা দাবিনামার যথাযথ পর্যালোচনা জরুরি। ক্রিকেটাররা তাদের প্রথম দাবিতেই খেলোয়াড়দের প্রাপ্য ‘সম্মান’ এবং ‘নেতা নির্বাচনের’ গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা বলেছেন।  তারা বলছেনÑ ‘ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ বা ‘কোয়াব’-এর নেতারা নিয়মিত নন, সাবেক খেলোয়াড় এবং তারা ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত নন। কোয়াব-এর সভাপতি ও সহসভাপতি দুজনই বিসিবির পরিচালক। দাবি-দাওয়া নিয়ে বোর্ডের সঙ্গে দেনদরবার করবে কোয়াব অথচ সেই সংগঠনের প্রধানরাই বিসিবির পরিচালকের দায়িত্বে। দ্বিতীয় দফায় ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের আগের নিয়ম ফিরিয়ে এনে খেলোয়াড়রা কোন ক্লাবে, কত টাকায় খেলবেন, সেই স্বাধীনতা চেয়েছেন।  বোর্ডের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত থেকে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশই দুনিয়ার মানসম্মত সব লিগের ঐতিহ্যবাহী রীতি হিসেবে স্বীকৃত। 

প্রথম দুটি দাবির পরই ক্রিকেটাররা দেশে সারা বছরের ক্রিকেট চর্চার জন্য জরুরি অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং খেলোয়াড়দের পাশাপাশি কোচ, আম্পায়ার, ফিজিওথেরাপিস্ট, ট্রেইনার, গ্রাউন্ডসম্যান তথা বৃহত্তর ক্রিকেট পরিবারের অন্য পেশাজীবীদের মানোন্নয়ন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবি তুলেছেন। যা একটি দেশের ক্রিকেটকে সামগ্রিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার জন্য জরুরি। দুঃখজনক বিষয় হলোÑ ভ্রমণ ভাতা, দৈনিক ভাতা, প্রথম শ্রেণির টুর্নামেন্টের সময় জিম, সুইমিংপুলসহ হোটেলে রাখা ও ভালো বাসে যাতায়াত নিশ্চিত করা এমনকি ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো ‘বল’ দিয়ে খেলার মতো বিষয়গুলোকেও দাবিনামায় অন্তর্ভুক্ত করতে হয়েছে ক্রিকেটারদের। এসব যে আর্থিক অসংগতির বিষয় নয় বরং ক্রিকেট ব্যবস্থাপকদের পেশাদারিত্ব ও দায়িত্ববোধের অভাবেই ঘটে তা সহজেই অনুমেয়। এসবের পাশাপাশি ক্রিকেটাররা যখন দেশীয় কোচ, আম্পায়ার ও গ্রাউন্ডসম্যানদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলিয়ে তাদের যথাযথ পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার দাবি তোলেন তখন বোঝা যায় যে, এই দাবিনামায় কেবল নিজের স্বার্থসিদ্ধি নয়, বরং পুরো ক্রিকেট পরিবারকে নিয়ে সামগ্রিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার বাসনা রয়েছে। 

ক্রিকেটারদের অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় ক্রিকেট লিগের ওয়ানডে ফরম্যাট চালু করা, বিপিএলের আগে টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট আয়োজন করা ও ঘরোয়া টুর্নামেন্টের নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার তৈরি করা।  ক্রিকেটের উন্নতির জন্য  এসব দাবির সঙ্গে কারোরই দ্বিমত করার কারণ নেই।  এছাড়া এবার বিপিএল আয়োজনকে স্বাগত জানালেও বিদেশি ক্রিকেটারদের সঙ্গে স্থানীয় ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিকের সামঞ্জস্য রাখার দাবি তুলেছেন ক্রিকেটাররা। মুজিব বর্ষ উপলক্ষে এবারের বিশেষ বিপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক না হলেও তা কেন ক্রিকেটারদের জন্য লাভজনক হবে না সেই প্রশ্ন অসংগত নয় মোটেই। বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তিতে বর্তমান ১৭ জনের বদলে ৩০ জন ক্রিকেটারকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ম্যাচ ফি অন্তত ১ লাখ টাকা করা, কিংবা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারদের বেতন কমপক্ষে ৫০ শতাংশ বাড়ানো, কিংবা একাধিক ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টুর্নামেন্টের ছাড়পত্রের যে দাবি খেলোয়াড়রা করেছেন তার সবগুলো যৌক্তিক না হলেও কিছু কিছু নিশ্চয়ই বিসিবি বিবেচনা করে দেখতে পারে। কিন্তু সময়মতো পাওনা পরিশোধের দাবিও খেলোয়াড়দের করতে হচ্ছে সেটা লজ্জাজনক তো বটেই।  

বাংলাদেশ ১৯ বছর ধরে টেস্ট খেলা জাতি। দেশের ক্রিকেট বোর্ড এখন বিশ্বের অন্যতম বিত্তশালী বোর্ড।  দেশ-বিদেশের মাঠে ক্রিকেটারদের ধারাবাহিক অগ্রগতি এবং উল্লেখযোগ্য সাফল্যও রয়েছে। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে অবকাঠামো থেকে শুরু করে দেশের সামগ্রিক ক্রিকেট-পরিবেশের কতটুকু উন্নতি হয়েছে সেই প্রশ্ন করাটা যে খুব অসংগত নয়, ক্রিকেটারদার আকস্মিক ধর্মঘট যেন সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে, ক্রিকেটারদের দাবিনামায় ক্রীড়াঙ্গনে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও অগণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অবসান চাওয়ার পাশাপাশি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন খেলোয়াড়দের পেশাদারি মনোভাবের পরিচয় ফুটে উঠেছে; যা শুধু ক্রিকেট নয় দেশের ক্রীড়াঙ্গনের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে জরুরি। কিন্তু বিগত সাত বছর ধরে দায়িত্বে থাকা বিসিবি সভাপতি এই বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে ক্রিকেটারদের ধর্মঘটের পরিপ্রেক্ষিতে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে, যে ভাষায় খেলোয়াড়দের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলেন তা যেমন দৃষ্টিকটু তেমনি অগ্রহণযোগ্য। বিসিবি সভাপতি বোর্ডের সঙ্গে কোনোরকম যোগাযোগ না করে ক্রিকেটারদের আকস্মিক ধর্মঘটকে যেভাবে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যায়িত করলেন সেটা অবশ্যই ওই পদের মানানসই বক্তব্য নয়। মনে রাখতে হবে, খেলোয়াড়দের সঙ্গে দূরত্ব ঘুচিয়েই এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে, খেলোয়াড়দের উপেক্ষা করে সমাধান আসবে না। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত