সাকিব আল হাসানদের রীতিমতো হুমকি দিয়ে রাখল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। ১১ দফা নিয়ে ক্রিকেটারদের যে বিদ্রোহ এবং ধর্মঘটে যাওয়া, সেটাকে স্রেফ ‘ষড়যন্ত্র’ মনে হচ্ছে বোর্ডপ্রধান নাজমুল হাসান পাপনের কাছে। গতকাল মঙ্গলবার জানিয়ে গেলেন, বিশ্ব অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভাবমূর্তি নষ্ট করতেই কাজটা করা হয়েছে। এটা ‘পূর্বপরিকল্পিত’। এর পেছনে কারা আছেন তাও খুব শিগগিরই বেরিয়ে আসবে বলে পাপনের প্রত্যয়ী উচ্চারণ।
সোমবার সাকিব আল হাসানের নেতৃত্বে জাতীয় দলের প্রায় সব ক্রিকেটার এবং দেশের শীর্ষ পর্যায়ের ক্রিকেটাররা ১১ দফা দাবি নিয়ে মিডিয়ার সামনে দাঁড়ান। দাবি উত্থাপন শেষে সাকিব সবার হয়ে ঘোষণা করেন, ‘যতদিন পর্যন্ত আমাদের এই দাবিগুলো পূরণ না হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত আমরা আর ক্রিকেটের কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকতে চাচ্ছি না।’
সোমবার দুপুরের ওই ঘটনার পর বোর্ডের কয়েকজন পরিচালককে নিয়ে রাতের দিকে সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বসেছিলেন। এরপর গতকাল দুপুর ১টার দিকে মিরপুরে বিসিবির হেডকোয়ার্টারে জরুরি বৈঠকে বসেন। বৈঠক হয় ঘণ্টা দুয়েক। এরপর এক ঘণ্টার কিছু বেশি সময়ের সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি সভাপতির কণ্ঠে ঘুরে-ফিরে এলো ষড়যন্ত্র, ইমেজ নষ্ট করা, পূর্বপরিকল্পিত, ইন্ধন জোগাচ্ছে কেউ, বেরিয়ে আসবে সব, খেলোয়াড়দের হয়তো ১/২ জন এই পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত, সবাই তা জানেও না এমন নানা বিষয়। এমনকি প্রশ্নোত্তর পর্বেও ওদিকটায় জোর দিলেন। আর শক্ত করে জানিয়ে দিলেন, ক্রিকেটারদের দাবির সবগুলো মানা কোনোভাবে সম্ভব নয়। তার চূড়ান্ত কথা, ‘খেলোয়াড়রা না খেললে খেলবে না! আমাদের কিছু করার নেই।’
তার মানে খেলোয়াড়দের আল্টিমেটামের পরও বোর্ড এমন হার্ডলাইন বেছে নেওয়ায় দুটি উপায় বেঁচে রইল আন্দোলনে যাওয়া খেলোয়াড়দের জন্য। প্রথমত, নিজেদের ইচ্ছায় বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত আলোচনায় বসে সমাধানের পথ খোঁজা। দ্বিতীয়ত, ২৪ অক্টোবর (আগামীকাল) থেকে শুরু জাতীয় লিগের তৃতীয় রাউন্ডের চার ম্যাচে খেলোয়াড়দের মাঠে ফিরে যাওয়া। তারপর ২৫ তারিখ থেকে শুরু জাতীয় ক্যাম্পে ভারত সফরের জন্য ঘোষিত দলের সবার যোগ দেওয়া।
কিন্তু এসব হবে কি হবে না তা এই মুহূর্তে অনিশ্চিত। যেমন অনিশ্চিত ৩ নভেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া প্রথম পূর্ণাঙ্গ ভারত সফর। আসলে সমস্যা যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরে রয়ে গেল। এখন খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয় তাই দেখার। যদিও গতকাল বিসিবি সভাপতি বললেন, ‘খেলোয়াড়দের কাউকে ফোন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ কেটে দিচ্ছে।’ তবে উল্টো অভিযোগটাও আছে।
১২/১৩ জনের পরিচালক দল নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসে বিসিবি সভাপতি পাপন শুরু করেছিলেন খুব আহত হওয়া, ধাক্কা খাওয়া মানসিকতা ও কণ্ঠে। ‘দাবি ওরা জানাতেই পারে। খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটির জন্য তারা স্ট্রাইকে গেছে, এটা এক্সট্রিমলি শকিং।’ কণ্ঠে অবিশ্বাসের ছোঁয়া নিয়ে পাপন বলে যান, ‘আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না আমাদের খেলোয়াড়দের কাছ থেকে এমন কিছু হতে পারে।’
বোর্ডপ্রধান বললেন, অন্য যেকোনো বোর্ডের চেয়ে এই বোর্ডের পরিচালকরা এবং তিনি নিজে এমনকি দেশের ক্রিকেটপ্রেমী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্যন্তও যেকোনো ক্রিকেটার সহজে পৌঁছাতে পারেন। তাহলে তাদের না জানিয়ে, তাদের কাছে না এসে এই উদ্যোগ নেওয়া কেন! সেই বিস্ময়ের সঙ্গে উদাহরণ দিয়ে পাপন টেনে আনেন বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়ের নাম। কার জন্য কী করেছেন তার একটা ছোটখাটো ফিরিস্তি।
বিস্ময়াহত চেহারায় পাপন বলেন, ‘ওদের (খেলোয়াড়দের) সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে। আমার চেয়ে বেশি মনে হয় না কেউ যোগাযোগ রাখে। সবকিছুতেই কথা হয়। আমি তো বহুদূর, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছেও ওদের অ্যাকসেস আছে। বলার কিছু থাকলে ওরা বলতে পারত।’ উল্লেখ করেন সাকিবকে সিপিএলে খেলার সময় তিনি দুবার ফোন করেছেন, সাকিব করেছেন একবার।
দাবিগুলো নিয়ে কেন তাদের কাছে আসা হয়নি সেই রহস্য উন্মোচনের মতো করে বিসিবি সভাপতি একপর্যায়ে বলেন ‘ওরা তো চাইলেই পাবে, আসেনি কেন! আমাদের কাছে চাচ্ছে না কেন! ফোন ধরছে না। সবকিছুর পেছনে কারণ আছে। আমাদের সুযোগ না দিয়ে মিডিয়ায় গিয়েছে। এটি বিশেষ একটি পরিকল্পনার অংশ।’
পাপন বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ একটা ভারত সফরের জন্য কত চাওয়া বাংলাদেশের। সেটা হতে যাচ্ছে প্রথম। এর মধ্যে ঘরোয়া লিগে ব্যস্ত শিডিউল। এমন একটা সময়ে ধর্মঘটে যাওয়ার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? ওরা বিশ্বের মাঝে দেশের ইমেজ নষ্ট করতে চেয়েছে।’ পাপন মনে করেন, ‘খেলোয়াড়রা এ পর্যন্ত সফল। দেশের ক্রিকেটের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে তো তারা সফল হয়েছে। ওরা কথা বলার কোনো সুযোগ রাখেনি। সব পরিকল্পনার অংশ। আমি মনে করি এটা গভীর ষড়যন্ত্র।’
ভাবমূর্তি নষ্ট করা এবং ষড়যন্ত্রের প্রসঙ্গে গিয়ে পাপন আরও বলতে থাকেন, ‘একজন লোকই আছেন যে বারবার এসব করছেন। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত চলছে। এই ষড়যন্ত্রের কথা সরকার থেকে শুরু করে সবাই জানে। সব ক্রিকেটার এটির সঙ্গে জেনেশুনে জড়িয়েছেন বলে মনে হয় না। ১/২ জন জানতে পারে। বের করা দরকার, কারা এই কাজ করছে। কিছুদিনের সময় চাচ্ছি আপনাদের কাছে। সব বের করে ফেলব।’
‘এই বিদ্রোহ করে খেলোয়াড়রা তাহলে তো বড় ধরনের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন। তাহলে তাদের বিপক্ষে কী ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন নেওয়া হবে’ এমন প্রশ্নে পাপনের জবাব, ‘দেখা যাক।’ আশাবাদী বোর্ড সভাপতি মনে করিয়ে দেন, ‘এর পেছনে কারা তা আমরা ঠিক বের করে ফেলব। বেশি সময় লাগবে না। আপনারাও জানবেন।’
১৭-এর জায়গায় ৩০ জনকে কেন্দ্রীয় চুক্তিতে আনার দাবি বোর্ড মানবে না। ‘বিশ্বের অন্যান্য দেশের হিসাবে আমরা ঠিক জায়গায় আছি। এটা বাড়ানো হবে না।’ পাপন বাতিল করে দেন খেলোয়াড়দের দাবির ৬ নম্বর পয়েন্ট। ৪ নম্বর দাবির ম্যাচ ফি আরও কিছুটা বাড়ানো যেতে পারে। ৩ নম্বর দাবিতে বিপিএলে বিদেশি-দেশি খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিকে সামঞ্জস্য ফ্র্যাঞ্চাইজির কারণে আনা সম্ভব নয় বলে সোজা নাকচ করে দেন।
ঘরোয়া নিচের দিকে লিগে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের যে অভিযোগ খেলোয়াড়রা তুলেছেন সে সংক্রান্ত এক প্রশ্নে পাপন বলেন, ‘আরও বের হবে। অপেক্ষা করেন না। দেখবেন।’ যোগ করেন, ‘আফগানিস্তানের কাছে আমরা হারব জানলে তো ওই টেস্ট আমি খেলতেই দিতাম না।’ জানান, ‘সব লিগে ক্যামেরা বসছে। সমাধান ক্যামেরাতেই।’ দুইয়ের বেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলার সুযোগ দিতে হবে ক্রিকেটারদের এ দাবিতে বিসিবি সভাপতি বলেন, ‘জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা খেলুক, দেব। চারটা দেব। (কিন্তু) দাবি আদায় করে টুর্নামেন্ট খেলবে না, এসব ভং চলবে না।’
আগামীকাল থেকে নির্ধারিত জাতীয় লিগের ম্যাচগুলোর কী হবে জানতে চাইলে পাপন বলেন, ‘দেখি কে কে খেলতে আসে।’ যদি তারা না আসে, ২৫ অক্টোবর থেকে জাতীয় ক্যাম্পেও যোগ না দেন, তাহলে? চ্যালেঞ্জের সুরে পাপন বলেন, ‘খেলোয়াড়রা না খেললে খেলবে না! আমাদের কিছু করার নেই। ওরা ক্যাম্পে গেলে ভালো, না গেলে যাবে না।’ আবারও বলেন পাপন, ‘ক্রিকেটারদের ব্যবহার করা হচ্ছে। তারা নিজেরাও জানে না। ২/১ জন জানতে পারে। আমার দুয়ার ওদের জন্য খোলা। ওরা যদি আমার কাছে আসে, অবশ্যই কথা হবে। আমি তো কথা বলতেই চাই।’ আর সঙ্গে বোর্ড সভাপতির আশাবাদ ‘আমি আশা করি ক্যাম্প চলবে, ভারত সফর হবে।’
