বেপরোয়া টেন্ডারবাজি ও ক্যাসিনো ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার যুবলীগ নেতা জি কে শামীমের অধীনে থাকা সব প্রকল্পের ঠিকাদারি বাতিল করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিতর্কিত ঠিকাদারদের কাজও পর্যায়ক্রমে বাতিল করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশের পর এ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে চলমান দুর্র্নীতিবিরোধী অভিযান আরও জোরদার হবে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের এ নির্দেশ দেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে আরও অনেক কিছু দেখতে পাবেন।’
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক বৈঠকে ৫টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার স্থাপন (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রস্তাব পাস হয়। এ নিয়ে এই প্রকল্পটি পঞ্চম দফায় মেয়াদ করা হলো। এ সময় প্রধানমন্ত্রী কেন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ শেষ হচ্ছে না জানতে চান এবং বেশকিছু নির্দেশনা দেন। নিয়ম অনুসারে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান একনেক সভা শেষে প্রকল্পের বিভিন্ন দিক ও প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। কিন্তু গতকাল জি কে শামীমের টেন্ডার বাতিল ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে কোনো কথা বলেননি তিনি। এরপর একনেক সভায় উপস্থিত ছিলেন এমন সচিব ও পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। তবে কেউই নাম প্রকাশ করতে চাননি।
দুর্নীতিবিরোধী অভিযান জোরদার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মনোভাব নিয়ে এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সভায় ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমি যেহেতু এই চেয়ারে (প্রধানমন্ত্রীর) আছি, এখান থেকে কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না। ভবিষ্যতে আরও অনেক কিছু দেখতে পাবেন।’
জি কে শামীমের বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেন, ‘কীভাবে একটি কোম্পানি এতগুলো কাজ পায়।’ জবাবে উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, অভিজ্ঞতা, সক্ষমতা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই শামীমকে কাজ দেওয়া হয়েছে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘জি কে শামীমের যত কাজ আছে সব বাতিল করতে হবে। সেটা যেন বিধি অনুসারে হয়। যত দ্রুত সম্ভব এগুলো পুনঃটেন্ডার করতে হবে। যেন কাজে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।’ একই সঙ্গে এরূপ যারা বিতর্কিত ঠিকাদার রয়েছে, সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ করছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলে ওই কর্মকর্তা জানান। এ সময় উপস্থিত কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে জানান, ইতিমধ্যে শামীমের এসব কাজ বাতিলের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন যেন একটি কোম্পানিকে এত কাজ না দেওয়া হয়। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেকোনো কোম্পানিই হোক না কেন, এক বা দুইয়ের বেশি প্রকল্পের কাজ দেওয়া যাবে না। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে আবারও নতুন কাজের জন্য বিবেচনা করা হবে।’ শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘অভিজ্ঞতার কথা বলে একই কোম্পানিকে বারবার কাজ দেওয়া যাবে না। নতুন নতুন কোম্পানিকে কাজ না দিলে তাদের অভিজ্ঞতা আসবে কোথা থেকে। এজন্য নতুন নতুন কোম্পানিকে কাজ করার সুযোগ করে দিতে হবে।’
পরে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের কাছে গেলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নিয়ম ও বিধি মেনেই সবকিছু সম্পাদন করতে বলেছেন। এ ক্ষেত্রে আমাকে (মান্নান) বলেছেন, দেখেন কীভাবে কী করা যায়।’ পরিকল্পনামন্ত্রী আরও বলেন, ‘প্রকিউরমেন্ট আইন অনুসারে এসব কাজ কীভাবে কী করা যায় সেটা দেখব। এছাড়া উন্নয়ন কাজে যেন ব্যাঘাত না ঘটে সেটাও গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে।’ পর্যায়ক্রমে বিতর্কিত ঠিকাদারদের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
জি কে শামীমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিকেবি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেডের কাছে সচিবালয়, র্যাব হেডকোয়ার্টার, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতালসহ ১৭টি প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে সচিবালয়ে ১৫০ কোটি টাকার অর্থ মন্ত্রণালয়ের নতুন ভবন, ১৫০ কোটি টাকার কেবিনেট ভবন, ৪০০ কোটি টাকার এনবিআর ভবন, ২০০ কোটি টাকার মহাখালী ডাইজেস্টিভ এবং বেইলি রোডে ৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প। এর পাশাপাশি জি কে শামীমের হাতে রয়েছে ২০-২৫ কোটি টাকার অ্যাজমা, ২০-২৫ কোটি টাকার ক্যানসার, ২০-২৫ কোটি টাকার সেবা মহাবিদ্যালয়, ৮০ কোটি টাকার নিউরো-সায়েন্স, ৮০ কোটি টাকার বিজ্ঞান জাদুঘর, ১২ কোটি টাকার পিএসসি, ৩০-৬০ কোটি টাকার র্যাব ফোর্স, ৬৫ কোটি টাকার এনজিও ফাউন্ডেশন এবং মিরপুর-৬-এ ৩০ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ। সব মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার ঠিকাদারির কাজ করছেন আটক হওয়া জি কে শামীম।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় চলমান রয়েছে ১৫৬৪টি প্রকল্প। এর মধ্যে বেশকিছু মেগা প্রকল্পও রয়েছে। এছাড়া অর্থবছর তিন মাসে আটটি একনেক সভা হয়েছে। এতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক নতুন প্রকল্প। এছাড়া ৫০ কোটি টাকার নিচে বেশকিছু প্রকল্প পরিকল্পনামন্ত্রী নিজ ক্ষমতাবলে অনুমোদন দিয়েছেন। এগুলোতে এখন টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে। আবার একেকটি প্রকল্পের একাধিক প্যাকেজও রয়েছে। দ্রুত কাজের সুবিধার্থে প্রতিটি প্যাকেজের জন্য আলাদা আলাদা ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়। এখন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে কাজ করলে, এসব উন্নয়ন প্রকল্প ও প্যাকেজের জন্য আলাদা ঠিকাদার প্রয়োজন হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সচিব আবুল মনসুর মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে ঠিকাদারের সংকট নেই। কেননা সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) সঙ্গে ৬০ হাজার ঠিকাদার চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। ফলে চলমান প্রকল্প বাস্তবায়নে ঠিকাদার কোনো সমস্যা না। বরং এটি নির্দিষ্ট সময়ে কাজ সম্পন্ন করতে আরও সহায়ক হবে।
