জান্নাতিকে বেতন দিত না, নির্যাতনের কথাও বলতে দেয়া হতো না

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০১৯, ১২:০৫ এএম

মাইনে ছাড়াই গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত শিশু জান্নাতি (১২)। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাঈদ আহম্মেদ (৪২) ও তার স্ত্রী  রুকসানা পারভীন (৩৮) শিশুটির বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে তার বিয়ের যাবতীয় খরচ জোগানোর লোভ দেখিয়েছিলেন। জান্নাতির দরিদ্র বাবা-মা তাদের এই প্রলোভনে পড়ে শিশু জান্নাতিকে তাদের হাতে তুলে দেন। চার বছর ধরে বিভিন্ন ভাবে নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও জান্নাতি কখনো সেই নির্যাতনের কথা তার বাবা-মায়ের কাছে প্রকাশ করতে পারেনি। কারণ জান্নাতিকে কখনো তারা একা ছাড়েননি। মাঝে-মধ্যে মোবাইল ফোনে বাবা-মার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দিলেও জান্নাতি কখনোই মন খুলে কথা বলতে পারেনি। গৃহকর্ত্রী রুকসানা পারভীন তার নিজের মোবাইল ফোন লাউড স্পিকারে দিয়ে তাদের কথোপকথন শুনতেন। তাই জান্নাতি তার নির্যাতনের কথা প্রকাশ করতে পারেনি।

শনিবার জান্নাতির ঘনিষ্ঠ স্বজনরা দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। তারা জানান, রুকসানা পারভীনের দাদা কাসেম চেয়ারম্যানের বাড়ি জান্নাতিদের একই গ্রামে। এই এলাকা থেকে আরও একাধিক মেয়েকে তারা নিয়েছিলেন গৃহকর্মী হিসাবে। তাদের অনেকেই মারধরের শিকার হয়ে ফিরে এসেছেন। একজনের ক্ষেত্রে বিয়ের খরচ বহন করলেও তাকেও মারধর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন।

জান্নাতির মামা আরিফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, জান্নাতির ওপর দীর্ঘদিন ধরেই নির্যাতন করা হয়েছে। কিন্তু সেই কথা বলার সুযোগ পায়নি মেয়েটি। ঈদের সময় বাড়িতে নিয়ে আসলেও তাকে কখনো একা ছাড়েনি তারা। মাঝে-মধ্যে মোবাইল ফোনে কথা বলার সুযোগ দিলেও রুকসানা পারভীন সামনে বসে থাকতেন। এ কারণে শিশুটি মন খুলে কথা বলতে পারেনি। এদিকে জান্নাতিকে হারিয়ে তার মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। গত শুক্রবার বগুড়ার গাবতলী তেলিহাটি ফকিরপাড়া কবরস্থানে জান্নাতিকে কবর দেওয়ার পর থেকেই তিনি বিলাপ করছেন। 

জানু মোল্লা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার বড় মেয়ে ছিল জান্নাতি। তার সুখের কথা চিন্তা করে বড় ঘরে দিয়েছিলাম। কিন্তু দিনের পর দিন তার ওপর যে এভাবে মারধর করা হয়েছে আমার মেয়েকে তা কোনোভাবেই জানতে পারি নাই। মেয়েটি আমার না জানি কত কষ্ট পেয়ে মারা গেছে। আমি এই হত্যার বিচার চাই।

গত ২৩ অক্টোবর রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসায় গৃহকর্ত্রী রুকসানা পারভীন শিশুটির চুলের মুঠি ধরে মেঝেতে একাধিকবার আঘাত করে প্রথমে রান্নাঘর, তারপর বাথরুমে ফেলে রাখে। একপর্যায়ে সপরিবারে বাসার বাইরে গিয়ে রাতে ফিরে এসে দেখেন জান্নাতির মুখ ও নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে। সেই রাতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান আগেই মারা গেছে।

গৃহকর্ত্রী কারাগারে, গৃহকর্তা পলাতক: জান্নাতিকে পিটিয়ে  মারার সময় রুকসানার স্বামী ও পিরোজপুরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাঈদ আহম্মেদ (৪২) ঘটনাস্থলে ছিলেন। এ কারণে তাকেও আসামি করা হয়েছে। তবে জান্নাতি হত্যাকাণ্ডের চার দিন পেরিয়ে গেলেও তার অবস্থান শনাক্ত করতে পারেননি তদন্তকারী মোহাম্মদপুর থানা-পুলিশ।

এর আগে গত শুক্রবার সাঈদের স্ত্রী রুকসানা পারভীন ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে শিশুটিকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয় আদালত।

তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিদর্শক আবদুল আলীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, রুকসানা পারভীনের স্বামী সাঈদ আহম্মেদকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। শিশুটি হত্যাকাণ্ডের আগে ধর্ষণের শিকার হয়েছিল কি না-তাও পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জান্নাতির বাবা জানু মোল্লা রুকসানা-সাঈদ দম্পতিসহ অজ্ঞাতনামা আরও একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করেন। মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, প্রায় চার বছর ধরে রুকসানা পারভীন ও সাঈদ দম্পতির কাছে তার মেয়েটি গৃহকর্মীর কাজ তরতো। সর্বশেষ তাদের ঢাকার বাসা মোহাম্মদপুরের ৬/৫  স্যার সৈয়দ রোডের দ্বিতীয় তলার এ/১ নম্বর ফ্ল্যাটে থাকাকালে জান্নাতির অসুস্থতার খবর দিয়ে রুকসানা তাকে ফোন করেন। খবর পেয়ে তিনি গত বুধবার রাতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল মর্গে গিয়ে মেয়ের লাশ শনাক্ত করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত