যে কারণে ভিয়েতনামিরা এমন ঝুঁকি নেয়

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০১৯, ১২:৫৬ এএম

ইংল্যান্ডের এসেক্সে গত বুধবার একটি হিমায়িত ট্রাকের মধ্যে পাওয়া গেছে ৩৯ জন মানুষের লাশ। আশঙ্কা করা হচ্ছে, মর্মান্তিক এ ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত কিছু লোক ভিয়েতনাম থেকে যাওয়া। ট্রাকে সম্ভাব্য অভিবাসনপ্রার্থীর লাশ পাওয়ার সর্বশেষ এ ঘটনা বিশেষ করে ফ্রান্স হয়ে যুক্তরাজ্যে মানবপাচার নিয়ে নতুন করে আলোচনা উসকে দিয়েছে। শোকের ছায়া এসেছে ভিয়েতনামে। সরকারিভাবে এখনো পরিচয় নিশ্চিত না করা হলেও অনেক ভিয়েতনামি পরিবারেরই আশঙ্কা, তাদের পরিবারের ছেলেটিই হয়তো এভাবে বেঘোরে প্রাণ দিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক অবস্থা এখন তত খারাপ নয়। তাহলে কেন দেশটির মানুষ এমন ঝুঁকিপূর্ণ এমনকি প্রাণ হারানোর আশঙ্কা থাকা যাত্রায় আগ্রহী হয়? কীভাবেই বা তারা পশ্চিমে পাড়ি জমায়?

কেন তারা ভিয়েতনাম ছাড়ে?

বিবিসির ভিয়েতনামি সার্ভিসের প্রধান জিয়াং নিগেইন বলেন, ‘ভিয়েতনামের অর্থনীতি ক্রমবর্ধিষ্ণু। তবে সবাই এ থেকে উপকৃত হচ্ছে না।’ নিগেইনের কথায়, ‘ভিয়েতনামে বিশালসংখ্যক উদ্বৃত্ত শ্রমিক রয়েছে।’ জাতিসংঘের মতে, দেশটিতে জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেলেও জনগোষ্ঠী এবং অঞ্চলভেদে তা অসম। ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটির পাচারবিরোধী বিশেষজ্ঞ মিমি ভু বলেন, ‘ভিয়েতনাম থেকে ইউরোপ (মূল ভূখ-) এবং যুক্তরাজ্যে যাওয়া বেশিরভাগ অভিবাসী আসলে দেশটির গুটিকয়েক প্রদেশ থেকেই আসে।’ ‘ওই অঞ্চলগুলোতে গত দশক দুয়েক ধরে বৈধ-অবৈধ উভয়ভাবে বিদেশে অভিবাসন নিয়ে কাজ করতে যাওয়া এবং দেশে টাকা পাঠানোর একটা ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে,’ বলেন মিমি ভু। গত এক দশকে ভিয়েতনাম থেকে যুক্তরাজ্যে অভিবাসনের উৎস ছিল মূলত উত্তরাঞ্চলীয় শহর হাইফং এবং কোয়াং নিন প্রদেশ। তবে সম্প্রতি তিনটি মধ্যাঞ্চলীয় প্রদেশ এনগে আন, কোয়াং বিন এবং হা তিনহ থেকে অবৈধ অভিবাসন বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অঞ্চলগুলো তুলনামূলকভাবে দরিদ্র। ধারণা করা হয়, ভিয়েতনামের মানবপাচার চক্রগুলো বছরে প্রায় ১৮ হাজার লোককে ইউরোপে পাচার করে।

তারা কেন যুক্তরাজ্যে যেতে চায়?

ভিয়েতনামি অভিবাসীদের কাছে সম্ভবত যুক্তরাজ্যই ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্য। কথাটি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড-ব্রুকস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের প্রভাষক ড. তামসিন বারবারের। অভিবাসন এবং ব্রিটিশ-ভিয়েতনামি জনগোষ্ঠী বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তিনি। তামসিন বারবার বলেন, এরা জানে, যুক্তরাজ্যে যেতে পারলে মোটামুটি কাজ পাওয়ার নিশ্চয়তা আছে। আর তা হলেই দেশে থাকা পরিবারকে পাঠানো যাবে ভালো অঙ্কের অর্থ। এ ছাড়া ইতিমধ্যেই যুক্তরাজ্যে থাকা ভিয়েতনামিদের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে যারা আবাসন সুবিধা ও কাজের ব্যবস্থা করে নতুন আসা লোকদের সহায়তা করতে পারে। নবাগতরা যুক্তরাজ্যে আসার পরে ভিয়েতনামি রেস্তোরাঁ, নারীদের নখ সজ্জার সেলুন এবং অবৈধ গাঁজা কেনাবেচায় কাজ পেয়ে যায়। এসব খাতে অদক্ষ শ্রমিকদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। যুক্তরাজ্য থেকে ভিয়েতনামে ফিরে আসা লোকজনের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, বিদেশ যাওয়ার আগে তাদের সিংহভাগ কৃষিকাজ ও মাছ ধরার মতো অদক্ষ ও শারীরিক পরিশ্রমের কাজে নিয়োজিত ছিল। কেউ কেউ মৌসুমি বা নৈমিত্তিক কাজ করেছে কিংবা ছোটখাটো ব্যবসা চালিয়েছে। কেউ ছিল বেকার। প্রভাষক ড. বারবার বলেন, ‘এই মুহূর্তে স্বল্প দক্ষ ভিয়েতনামি অভিবাসীদের জন্য যুক্তরাজ্যে কাজ নিয়ে যাওয়ার কোনো আইনি পথ নেই। সুতরাং খুব ঝুঁকি এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই সেদেশে পাড়ি জমাতে হয় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের।’

খরচ কত পড়ে?

মিমি ভু জানালেন, সম্ভাব্য অভিবাসীরা যুক্তরাজ্যে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন অঙ্কের অর্থ দিয়ে থাকে। যাদের পয়সাকড়ি তুলনামূলকভাবে কম তারা ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার দেয়। এজন্য তাদের যাত্রা হয় বেশ কষ্টকর। যেমন, হয়তো মাঝে মাঝে রাতের বেলা বনের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হতে পারে। তবে যারা বেশি অর্থ দিতে পারে (৪০ থেকে ৫০ হাজার ডলার) তারা মূলত বিমানে ভ্রমণ করে। পাচারবিরোধী বিশেষজ্ঞ মিমি ভু বলেন, ভিয়েতনামের গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী কারও কারও জন্য ৪০ হাজার ডলার প্রায় ৪০ বছরের বেতনের সমান। ভুর মতে, এটি একটি আকাশছোঁয়া অঙ্ক। তবে কিছু পরিবারের বিশ্বাস, এটি যৌক্তিক কারণ, তাদের এবং সন্তানদের আরও ভালো ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার এটাই সেরা উপায়। ‘ভিয়েতনাম একটি খুব পরিবারকেন্দ্রিক সংস্কৃতি এবং পরিবারের জন্য এখানে সবকিছু করা হয়,’ বলেন মিমি ভু। জাতিসংঘের তথ্য অনুসারে, ভিয়েতনামি অভিবাসীরা ইউরোপে যাওয়ার জন্য পাচারকারীদের বছরে ৩০ কোটি ডলার পর্যন্ত দিয়ে থাকে বলে ধারণা করা হয়। বিদেশ যাওয়ার অর্থের জন্য অনেকে পরিবার এবং পরিচিতজনদের কাছ থেকে ঋণ নেয়। কেউ কেউ আবার অনানুষ্ঠানিক খাতের ঋণদাতাদের দ্বারস্থ হয়। সেখানে সুদের হার হয় ঋণদাতাদের মর্জির ওপর। যাত্রা ব্যর্থ হলে তাই অনেকেই আবার চেষ্টা করে। কারণ কষ্ট করে দালালকে দেওয়া টাকা তোলার সেটাই একমাত্র উপায়। ড. বারবার বলেছেন, কেউ কেউ জমিজমা বা অন্যান্য সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করেও অর্থ সংগ্রহ করে থাকে। তিনি বলেন, ভিয়েতনামের পরিবারগুলো এই ‘বিশাল ঝুঁকি’ নেয়। কারণ একে তারা পরিবারের একজন সদস্যের জন্য মোটা অর্থ উপার্জনের বড় সুযোগ হিসেবেই দেখে।

তারা যেভাবে যুক্তরাজ্যে যায়

‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট অ্যান্টি-স্লেভারি কমিশনার’-এর গবেষণা অনুসারে পাচারকারী দালালরা যুক্তরাজ্যে অভিবাসীদের পাচারের জন্য দুই ধরনের সেবা  দেয় প্রিমিয়াম ও ইকোনমি। পাচারকারীরা প্রিমিয়াম পরিষেবার ‘বিজ্ঞাপন’ হিসেবে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বলে, এটি ন্যূনতম ঝুঁকির যথাসম্ভব সরাসরি রুট। একটি ঘটনার ক্ষেত্রে অভিবাসীদের জন্য শেঙ্গেন ব্যবসায়ী ভিসার আবেদনের কাগজপত্র এবং প্যারিসে সরাসরি ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যুক্তরাজ্যে যাওয়ার আগে সেখানে তাদের নিরাপদ আবাসনে রাখা হয়। (প্রসঙ্গত, লুক্সেমবার্গের শেঙ্গেন শহরে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী এর আওতাধীন ২৬টি ইউরোপীয় দেশে সীমিত সময়ের জন্য ভিসা ছাড়াই চলাচল করা যায় অনুবাদক)। সস্তা বিকল্প অর্থাৎ ইকোনমি প্যাকেজে যুক্তরাজ্য পৌঁছতে তাদের কয়েক মাস পর্যন্ত লাগতে পারত। ‘তবে আপনি যে শ্রেণিতেই ভ্রমণ করেন না কেন, শেষ পর্যন্ত (যুক্তরাজ্যের) সীমান্তে পৌঁছে ট্রাকের পেছনে বা ফেরির ফাঁকফোকরে লুকিয়েই প্রবেশের চেষ্টা করতে হবে,’ সতর্ক করে দিয়ে বলেন মিমি ভু। ইউরোপে পৌঁছানো বেশিরভাগ ভিয়েতনামি প্রথমে রাশিয়া গিয়ে পূর্ব ইউরোপের মধ্য দিয়ে স্থলপথে অগ্রসর হয়। অতীতে অনেক ভুক্তভোগী পুলিশকে জানিয়েছে তারা চীনের ভেতর দিয়ে যুক্তরাজ্যের পথে পাড়ি জমিয়েছিল। বস্তুত যুক্তরাজ্যে যাওয়ার চেষ্টা করা ভিয়েতনামি অভিবাসীরা সাধারণত যে ট্রানজিট দেশগুলোর মধ্য দিয়ে পাড়ি দেয় তার মধ্যে রয়েছে চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, জার্মানি ও পোল্যান্ড। অনেকে ইউক্রেন বা পোল্যান্ডের মতো ট্রানজিট দেশগুলোতে থামতেও পারে। সেখানে তাদের যাত্রার পরবর্তী পর্যায়ের জন্য অর্থের সংস্থান কিংবা পাচারকারীদের জন্য অর্থোপার্জন করতে কঠিন পরিবেশে কাজ করতে হয়। যাত্রার শেষ সম্ভাব্য ধাপ ফ্রান্স থেকে শুরু হয়। এখানে অভিবাসনপ্রত্যাশী লোকেরা ট্রাকের গোপন কুঠুরিতে লুকিয়ে পার হওয়ার জন্য কোনো পাচারকারীকে অর্থ দিতে পারে। আবার বন্দরের কাছে অপেক্ষারত ট্রাকে চালকের অজ্ঞাতেও উঠে লুকিয়ে থাকতে পারে। ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তরের অর্থায়নে পরিচালিত এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাধ্যতামূলক শ্রম বা যৌন শোষণের জন্য ইউরোপে পাচার হওয়া ব্যক্তিরা কিংবা স্বেচ্ছায় পাচার হওয়া লোকেরা ভ্রমণের যাত্রাকালে শোষণের ঝুঁকিতে থাকে। এতে বলা হয়, বিশেষ করে নারীদের জন্য পাচারকারীদের হাতে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার ঝুঁকি খুব বেশি।

লেখক : বিবিসি ভিয়েতনামের সাংবাদিক

বিবিসি অবলম্বনে আবু ইউসুফ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত