প্রাথমিক শিক্ষায় বিনিয়োগ কেন জরুরি

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০১৯, ১০:৫৯ পিএম

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সবচেয়ে অবহেলিত কিন্তু‘ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।  গত ২৩ অক্টোবর সেই শিক্ষকরা একটু বেতন বৃদ্ধি, আরেকটু সম্মান বৃদ্ধির আশায় শহীদ মিনারে দাবি জানাতে এসেছিলেন। কিন্তু‘ সরকারের নির্দেশে রাষ্ট্রের পুলিশ তাদের দাঁড়াতেই দেয়নি। তাদের লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। পুলিশের এহেন মারমুখী আচরণে বেচারা শিক্ষকরা তাদের দুঃখের কথা, তাদের দাবির কথা জানাতে পারেননি। কী অমানবিক! দাবি জানানোর জন্য জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অবস্থিত শহীদ মিনার। সেখানেও তারা নিরাপদ না। এই রাষ্ট্রের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্রছাত্রীরা কেউ তাদের পাশে দাঁড়াল না। এটা বড়ই মর্মান্তিক। শুধুই কি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এই রকম নির্যাতনের শিকার? আমরা তো প্রায় প্রতিদিনই এই রাষ্ট্রের কোথাও না কোথাও কোনো না কোনো পর্যায়ের শিক্ষকদের ওপর ঘটে যাওয়া নানা বঞ্চনা, লাঞ্ছনা, অপমানসহ হামলা-মামলার সংবাদ পাই। দৈনিক সংবাদপত্রের পাতায় এটা এখন নিয়মিত সংবাদের অংশ হয়ে গিয়েছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এটি কোনো নতুন দাবি ছিল না বরং এটি ছিল ২০১৭ সালের প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়নের দাবি। সেই যৌক্তিক দাবি না মেনে তাদের লাঠিপেটা করা হয়েছে ও হুমকি দেওয়া হয়েছে, যেটি নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। ভাবতে পারেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের মর্যাদা হলো দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা। আর সাধারণ শিক্ষকরা তৃতীয় শ্রেণির। আপনার, আমার আমাদের সকলের আদরের সোনামণিদের যাদের কাছে পাঠাই তারা যদি এরকম অসম্মানিত জীবনযাপন করেন– কী করে তারা আমাদের সোনামণিদের ভালো পড়াবেন? সমস্যা হলো আমরা শিক্ষাব্যবস্থায় এমন একটি shun পদ্ধতি বা বিকল্প রাস্তা চালু করেছি যাতে সমাজের শাসক ও ধনিক শ্রেণির সন্তানদের ওই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে না হয়।  এমন একটি সমাজ আমরা তৈরি করেছি যেখানে সবচেয়ে নিম্নবিত্তের ছেলেমেয়েরা যাবে কওমি মাদ্রাসায়, তার পরের অংশটির ছেলেমেয়েরা যাবে আলিয়া মাদ্রাসায়, অর্থবিত্তের দিক থেকে এর পরের অংশটি যাবে প্রাথমিক বিদ্যালয় বা বাংলা মাধ্যমে, তার পরের অংশটি যাবে ইংরেজি ভার্সনে এবং এর পরের অংশটি যাবে ইংরেজি মাধ্যমে। এই শেষের অংশটিই অর্থবিত্ত ও ক্ষমতায় সমাজের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষ। একটি সমাজের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি এরকম একটি বিভাজিত পরিবেশে বড় হয় যেখানে এক শ্রেণির ছেলেমেয়ের সঙ্গে আরেক শ্রেণির ছেলেমেয়ের কোনো দেখা-সাক্ষাৎই হয় না, সেই সমাজ কীভাবে সুস্থ স্বাভাবিক হবে? আজ যদি আমাদের সমাজের ক্ষমতাবান উচ্চবিত্তের সন্তানরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ত তাহলে কি সরকার পারত তাদের আদরের সন্তানদের শিক্ষকদের ওপর এরকম চড়াও হওয়ার নির্দেশ দিতে?

প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সত্যিকারের শিক্ষক পাবেন না। একদিকে সংখ্যা বাড়িয়ে শিক্ষকতার মানকে  dilute  করা হয়েছে। অন্যদিকে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে নিম্নমানের শিক্ষক দিয়ে সয়লাব করে ফেলা হয়েছে। এই নিম্নমানের শিক্ষকের সংখ্যা এত বেশি হয়ে গেছে যে শিক্ষক সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের ধারণা তৈরিতে এরাই মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ এখন শিক্ষক সমাজ নিয়ে খুবই নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে। গত ২৩ অক্টোবর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের লাঠিপেটা করার সংবাদটি যখন পরদিনের খবরের কাগজে প্রকাশিত হয়, সেই সংবাদের নিচে সাধারণ মানুষের মন্তব্য পড়ে আমি আকাশ থেকে পড়ি। একটা বড় অংশের ধারণা এই শিক্ষকদের পিটিয়ে ঠিকই করা হয়েছে, এরা ক্লাসে পড়ায় না, এরা ব্যবসা করে, কোচিং আর প্রাইভেট পড়ায় ইত্যাদি। জাতি হিসেবে আমরা এতই খারাপ যে আমরা কোনো কিছুই তলিয়ে ভাবি না। যেই বেতন দেওয়া হয় সেই বেতনে ওই শিক্ষকরা কীভাবে পড়াবে? ইউএনওর অফিসের দারোয়ান ও গাড়ির ড্রাইভারও তো প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকের চেয়ে বেশি বেতন পায়। যেই বেতন দেওয়া হয় সেই বেতনে ভালো ও আত্মসম্মানওয়ালা ছাত্ররা কেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চাইবে? এরা ভালো পড়ায় না, ফাঁকি দেয়, প্রাইভেট ও কোচিং পড়ায় এসবের অজুহাতে এদের আরও বেশি অবহেলা কি এর সমাধান? এর সমাধান কি এদের আরও অসম্মান করা?

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কিছু সমস্যার কথা উল্লেখ করা খুবই জরুরি। ১. প্রাথমিকের শিক্ষকদের কোনো প্রমোশন নেই। অর্থাৎ ভালো করলে উত্তরোত্তর উন্নতি বা ইনসেন্টিভের কোনো ব্যবস্থা নেই। ২. স্কুল-কলেজের ছুটি ৮৫ দিন হলেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছুটি ৭৫ দিন। ৩. এটি নন-ভ্যাকেশনাল ডিপার্টমেন্ট হওয়ায় তাদের অর্জিত ছুটি ভোগ করেও শান্তি নেই, পিআরএলে যাওয়ার সময় এ ছুটি তাদের বিয়োগ করে ল্যামগ্রান্ট হিসাব করার বিধান আছে। ৪. প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই সরকারি কাজে এখানে-সেখানে যাওয়া লাগে এবং সেখানে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হতে হয়।  কোনো অনুষ্ঠানে গেলে শিক্ষকদের বসার কোনো ব্যবস্থা পর্যন্ত রাখা হয় না। তাদের মাঠে-ঘাটে ঘুরে বেড়াতে হয় নতুবা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ৫. প্রত্যেক জাতীয় দিবসে শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে যেতে হয়, অথচ এ দিনগুলো ছুটি হিসেবে বিবেচিত। ৫. বিদ্যালয়ের বরাদ্দের সব কাজ করেন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি তার ইচ্ছামতো। অথচ অফিশিয়াল সব ঝামেলা পোহাতে হয় প্রধান শিক্ষককে। ৭. প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কর্মঘণ্টা  সকাল ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত নির্দিষ্ট করে দেওয়া। এই  সময়ে একেকজন শিক্ষককে প্রতিদিন ৭ থেকে ৯টা ক্লাসও নিতে হয়। এতগুলো ক্লাস একজন শিক্ষকের পক্ষে নেওয়া কি সম্ভব? আর নিতে গেলে ক্লাসের মান কখনো ভালো হওয়া সম্ভব না। জন্মনিবন্ধন, স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনসহ সরকারি অনেক কাজে তাদের ব্যবহার করা হয় অনেকটা বিনা পয়সায় খাটুনির মতোই।

ছোট বাচ্চাদের পড়ানো সবচেয়ে কঠিন। একেকজন বাচ্চা একেক রকম। তাদের মনস্তত্ত্ব স্টাডি করে একেকজনকে আলাদা কেয়ার নিতে হয়; যেটা উন্নত বিশ্বে করা হয় এবং সে জন্যই এই লেভেলের শিক্ষকদের ভালো বেতন দিতে হয়। ভালো বেতন দিলে ভালো শিক্ষকরা পড়াবেন। তারা ভালো পড়ালে আজকের ছাত্ররা আগামীতে আরও ভালো শিক্ষক হয়ে উঠবেন। এই সাইকেল কয়েক বছর চললে দেশ বদলে যাবে।  শিক্ষায় বিনিয়োগই শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ। আর শিক্ষার ভিত্তি রচিত হয় প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়েই। তাইতো উন্নত দেশের প্রাইমারি শিক্ষকদের বেতন বেশ ভালো। আমি জার্মানিতে যে বাসায় থাকতাম তার মালিক দম্পতির দুজনই কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক ছিলেন। এদের একজন অর্থাৎ স্বামী তখন মনোবিজ্ঞানে পিএইচডি করছিল এবং পিএইচডির পরও ওখানেই শিক্ষকতা করবেন বলে দুজনেই মনস্থির করেছিলেন। এবার বুঝুন জ্ঞানবিজ্ঞানে জার্মানরা কেন এত এগিয়ে।

এই রাষ্ট্রের তো টাকার অভাব দেখি না? রাস্তার হকার থেকেও কেউ হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে যায় বলেই দেখছি। ঘুষ, চুরি, দুর্নীতির জন্য টাকার অভাব নেই। অথচ শিক্ষকদের বেতন দিতে গেলে টাকা নেই, টাকা নেই শুনতে হয়। শিশুদের জীবনের ভিত্তি গড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্বটা যাদের ওপর ছেড়ে দিই তাদের এত অবহেলা কেন? মনে আছে যমুনা সেতু তৈরি করার সময় রাষ্ট্রের সকল সার্ভিসের সঙ্গে সারচার্জ যোগ করা হয়েছিল। যমুনা সেতু নির্মাণের জন্য জনগণের কাছ থেকে সারচার্জের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা আদায় করা হয়েছিল। আমার মতে সকল লাক্সারিয়াস পণ্যে এবং ইনকাম ট্যাক্সের সঙ্গে শিক্ষার জন্য স্পেশাল সারচার্জ আরোপ করে অর্জিত টাকা শিক্ষা খাতে বরাদ্দের ব্যবস্থা করা জরুরি। যেকোনো উপায়েই  হোক শিক্ষায় জিডিপির ন্যূনতম ৫.৫% বরাদ্দ খুব জরুরি। আর সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে অনুরোধ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যারা আছেন তারা দয়া করে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করুন। এটাকে কেবল একটি চাকরি মনে না করে সেবাদান মনে করুন।

২৩ অক্টোবর শিক্ষকদের ওপর হামলাই প্রথম না। এর আগেও বহুবার এই শিক্ষকদের ওপর হামলা হয়েছে।  প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর এই হামলার তীব্র নিন্দা জানাই এবং এই হুকুমদাতাদের শাস্তি দাবি করি। প্রাথমিকের শিক্ষকদের আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের ওপর প্রশাসনের কোনো খড়গ বরদাস্ত করা হবে না। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে, যাতে তাদের এভাবে রাস্তায় নামতে না হয়, প্রাইভেট বা অন্য উপায়ে অর্থের পেছনে ছুটতে না হয় এবং যাতে প্রাইভেট বা কোচিং বাণিজ্য রাষ্ট্র কর্তৃক নিষিদ্ধ করা যায়। এমতাবস্থায়, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে অনতিবিলম্বে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবি পূরণসহ শিক্ষার সকল স্তরে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য সরকারকে অনুরোধ করছি।

লেখক
অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত