৮ মামলার ৭টিরই অভিযোগপত্র হয়নি

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০১৯, ০২:৫১ এএম

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা সদরে হিন্দুপল্লীতে তাণ্ডবের ঘটনার তিন বছর পার হলো গতকাল বুধবার। তবে এই সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির ও বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে করা আট মামলার মধ্যে সাতটির অভিযোগপত্র তৈরি হয়নি।

নাসিরনগর থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের রসরাজ দাসের ফেইসবুক আইডি থেকে ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর দেওয়া ধর্মীয় অবমাননাকর একটি পোস্ট ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরে ২৯ অক্টোবর রসরাজকে আটক করে তার বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনে মামলা করেন নাসিরনগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কাউসার হোসাইন। রসরাজ তখন পুলিশের কাছে দাবি করেন ওই পোস্ট তিনি দেননি। ওই ফেইসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে এদিন বিকেলে সুন্নি আন্দোলনের নেতাকর্মীরা নাসিরনগর-সরাইল সড়কে বিক্ষোভ করে। ৩০ অক্টোবর সকালে ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের’ উপজেলা শাখার নেতারা নাসিরনগর ডিগ্রি কলেজ মোড়ে বিক্ষোভের ডাক দেন। অন্যদিকে হেফাজত সমর্থিত ‘খাঁটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের’ নেতারা নাসিরনগর খেলার মাঠে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেন। পৃথক এই সমাবেশ চলার সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। সমাবেশে যোগ দেওয়া লোকজন এই হামলা চালিয়েছে বলে সে সময় স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেছিলেন।

মামলার নথিপত্র থেকে জানা যায়, মন্দির, বাড়িতে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় ৩০ অক্টোবর রাতেই গৌর মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্মল চৌধুরী, দত্তবাড়ির মালিক কাজল জ্যোতি দত্ত ও ২৬ নভেম্বর হরিণবেড় এলাকায় দয়াময় দাস বাদী হয়ে পৃথক মামলা দায়ের করেন। ৩০ অক্টোবরের তাণ্ডবের পর দুষ্কৃতকারীরা ফের ৪ ও ১৩ নভেম্বর রাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তত ছয়টি ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। আগুন দেওয়ার ঘটনার পর নাসিরনগরের তৎকালীন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অঞ্জন দেব বাদী হয়ে ১৯ নভেম্বর, নাসিরনগর পশ্চিমপাড়ার ছোট্ট দাস বাদী হয়ে ১৩ নভেম্বর, এসআই সাধারণ কান্তি চৌধুরী বাদী হয়ে পৃথক মামলা করেন। হামলার ঘটনায় পুলিশ ও ক্ষতিগ্রস্তদের করা আটটি মামলায় অজ্ঞাত দুই হাজারেরও বেশি মানুষকে আসামি করা হয়। তখন হামলার ভিডিও ফুটেজ ও ছবি দেখে ১২৫ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা সবাই এখন জামিনে। আটটি মামলার মধ্যে ঘটনার ১৩ মাস পর ২০১৭ সালের ১০ ডিসেম্বর গৌরমন্দির ভাঙচুর মামলায় পুলিশ নাসিরনগর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল হাশেম ও হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান অঁাখিসহ ২২৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। গত বছর ২ নভেম্বর এই মামলাটি দায়ের করেন গৌর মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্মল চৌধুরী। তবে ঘটনার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও বাকি সাত মামলার তদন্ত কাজ শেষ করতে পারেনি পুলিশ। মামলাগুলোর তদন্ত কাজের অগ্রগতি সম্পর্কেও জানেন না ক্ষতিগ্রস্তরা।

মামলার বিষয়ে গতকাল নির্মল চৌধুরী বলেন, ‘আমরা হামলা-ভাঙচুরে অংশ নেওয়া অপরাধীদের কঠোর শাস্তি চাই।’

উপজেলা সদরের দত্তবাড়ি মন্দির ভাঙচুর মামলার বাদী কাজল জ্যোতি দত্ত বলেন, ‘হামলার পর পুলিশের কথায় বিচারের আশায় মামলা করেছিলাম। এরপর আর বিচারের কোনো লক্ষণ দেখছি না। শুনেছি, একটি মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। আমার মামলার অভিযোগপত্র এখনো দেওয়া হয়নি।’

উপজেলা সদরের গাঙকুলপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও ক্ষতিগ্রস্ত রতন চন্দ্র দাস বলেন, ‘আমাদের ওপর হামলার বিচার আমরা এখনো পাইনি। আটটি মামলার মধ্যে মাত্র একটি মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। বাকি মামলাগুলোর অভিযোগপত্র না দেওয়ায় অপরাধীদের বিচার হচ্ছে না।’

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ নেতাদের মতে, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে একটি চক্র ফেইসবুকের অপব্যবহার করে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটাচ্ছে। এ ব্যাপারে নাসিরনগর উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সুজিত চক্রবর্তী বলেন, ‘যারা নাসিরনগরের হামলার ঘটনার হোতা তাদের আইনের আওতায় আনা হয়নি। তাদের আইনের আওতায় আনলে ভোলার ঘটনা ঘটত না।’

মামলাগুলোর তদন্ত কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) মুহাম্মদ আলমগীর হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের তদন্ত কাজ শেষ পর্যায়ে। আসামি সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য সাক্ষ্য-প্রমাণগুলো আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করে দেখছি। যাচাই-বাছাই শেষে সাতটি মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত