নাগরী খ্রিস্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেড নিয়ে লিখেছেন ও ছবি তুলেছেন আমিনুল ইসলাম
এ এক পরিবর্তনের কাহিনী, অবিশ্বাস্য জয়ের গল্প। ভাঙা-গড়ার শুরুতে ফিরতে হলে যেতে হবে পঞ্চাশে। ব্রিটিশরা চলে গেলেন, পাকিস্তানের শাসন হলো শুরু। তখন আমাদের এই দেশের মানুষ খ্রিস্টানরা সংখ্যায় কম থাকলেও জীবন ছিল কষ্টে ভরা। একেবারেই গরিব তারা। কোনোমতে চলেন। বিদেশ থেকে ও আমাদের দেশের মানুষ খ্রিস্টান পরার্থে কাজ করা মিশনারিদের দানেই অনেকটা জীবন চলে তাদের। প্রতিটি ধর্মপল্লীতে তখন ছিল ‘ইরমা’ নামের বিশেষ সাহায্য তহবিল। নানাভাবে সাহায্য চেয়ে এনে তাতে দান করতেন মিশনারি ফাদার, ব্রাদার ও সিস্টাররা। তবে তাতে হতো না। কয় টাকা আর পেত এক একটি পরিবার? তাই কর্জ করে, কোনো না কোনোভাবে ধার এনে অথবা মহাজনের চড়া সুদে ঋণ জোগাড় করে ছেলেমেয়ে, সংসারের হাল বাইতেন মা-বাবা। পরে আবার সেগুলো ফেরত দিতে না পেরে নানা ধরনের বিপদের মধ্যে পড়তে হতো। সবাই কমবেশি আক্রান্ত হতেন। এমন জীবন আর ভালো লাগল না তাদের অভিভাবক আর্চবিশপ লরেন্স লিও গ্রেনার, সিএসসির। ১৯৫৩ সালে তিনি ফাদার চার্লস জে. ইয়াং নামের ঘনিষ্ঠ ফাদার ও মানবতাবাদীকে পাঠালেন কানাডাতে। তিনি সমবায় কীভাবে গড়ে তুলে মানুষের ভাগ্য বদলে ফেলা যায়, সে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরলেন উন্নত দেশ থেকে। বছর দুই পরেই তাদের হাত ধরে জন্ম নিল বাংলাদেশের ঢাকা ও আশপাশের এলাকার পিছিয়ে পড়া খ্রিস্টান জনগণের ভাগ্যবদলের স্বপ্নবাদী এক প্রতিষ্ঠান। নাম ‘দি খ্রিস্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন অব ঢাকা’। মুখে মুখে ছড়াল সংক্ষেপে ‘ঢাকা ক্রেডিট’।
ফাদার চার্লস তার সহকর্মী, বন্ধু নাইট ভিনসেন্ট রডরিক্স নামের আরেক মানবতাবাদীকে নিয়ে নামলেন কাজে। গাজীপুরের ভাওয়ালের নানা গ্রামের গরিব, সারা দেশের ধর্মপল্লীর ভেতরে বাস করা অসহায় খ্রিস্টান মা-বোনদের বলতে থাকলেন- কীভাবে সমবায় গড়ে তুলতে তারা পারেন নিজেরাই, তার সুফলই বা কী? গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের খ্রিস্টানদের একটি মিশনারি বা পরহিত কার্যক্রম আছে; সেখানে গির্জাও আছে স্বাভাবিকভাবে; সেই মিশনের প্রধান ফাদার গেডার্ট, সিএসসি উদ্যোগে অসাধারণ অনুপ্রাণিত হলেন। তাদের মানুষের ভাগ্যবদলের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে এলেন ফাদার চার্লসকে। সেন্ট নিকোলাস হাই স্কুলের বিখ্যাত মাঠে হলো সাধারণ মানুষ ও সমবায়ীদের প্রথম সভা। তাতেই উৎসাহ পেয়ে ১৯৬২ সালের ২৮ আগস্ট ১৫ জনের একটি কার্যকরী কমিটির মাধ্যমে জন্ম নিল এখন এক লাখের বাস খ্রিস্টানের প্রধান ও তাদের জন্য গড়া ‘নাগরী খ্রিস্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন’।
শুরু থেকে তারা সংসারের প্রধান ও সঞ্চয়ের পোকা নারীদের নিয়ে কাজ শুরু করলেন। তবে তখন তাদের কোনো আলাদা জায়গা ছিল না কাজের। ফলে ইয়াং সেই টাকা রাখতে বললেন সম্মানিত ফাদার গেডার্টের কাছে। প্রথম দিকে মিশনের অধীনে বাস করা মানুষরা মাসে ৫০ পয়সা করে জমা রাখতেন। তাদের জন্য মাটির তৈরি ঘর বানিয়ে দিলেন ফাদার। এই সমিতিকে অন্য মিশন ও গির্জা এলাকাগুলোতে ছড়ালেন ভিনসেন্ট রডরিক্স। তার এই কাজের স্বীকৃতি এসেছে সারা বিশ্বের খ্রিস্টানদের প্রধান পরম সম্মানিত ষষ্ঠ পোপের কাছ থেকে। ১৯৭৬ সালে পোপ মহোদয় তাকে ‘নাইট অব সেন্ট সিলভেস্টার’ উপাধিতে সম্মানিত করেছেন। এখনো সমিতির অফিসে ভিনসেন্ট রডরিক্সের মোজাইক ছবি আছে। ফাদার চার্লস আছেন সেখানে।
প্রথম থেকেই সমিতিতে আছে আলাদা কার্যক্রম পর্যবেক্ষক কমিটি। ধীরে ধীরে তাদের ডাল ছড়াল। পরে পুরনো হোস্টেল ভবন, যেখানে নিকোলাস হাই স্কুলের আবাসিক ছাত্ররা আগে বাস করতেন; সেটি দেওয়া হলো সমবায় সমিতিকে। এরপর তাদের এই জায়গায় নিয়ে এলেন ঢাকার আর্চ বিশপ ফাদার মাইকেল রোজারিও। ২০০৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, আজ থেকে ১৬ বছর আগে এই ভবনে এসেছে সমিতি। তাদের সবার টাকাতেই তৈরি ভবনটি ও সব সুবিধা। পোপের প্রতিনিধি পল চ্যাং ও আর্চবিশপ মাইকেল রোজারিও নিজে থেকে ভবন উদ্বোধন করলেন। সবার শ্রমে, সাহায্যে ও সবার অধিকারে থাকা ভবনের নামটি রাখা হলো তাদের স্বপ্ন ছড়ানো মানুষ ভিনসেন্ট রডরিক্সের নামে– ‘নাইট ভিনসেন্ট ভবন।’ আছে বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো বিখ্যাত সেন্ট নিকোলাস গির্জা চত্বরে। গির্জার বামে এই ভবন। আছে তাদের নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা।
দোতলা সমবায় ভবনের ভেতরে প্রথমেই সমিতির সদস্যদের সেবা কাউন্টার। দোতলায়ও সেবা বুথ। অনেকগুলো বুথের এই ভবনে আছে– টাকা জমা দেওয়া বা সঞ্চয় হিসাব খোলা, টাকা তোলা, নতুন সদস্য হওয়াসহ সব ধরনের কাজের আলাদা কেন্দ্র। এখন সবই আধুনিক হয়েছে। এক টুকরো ময়লা কোথাও নেই, কোলাহল নেই কোনো। কারণ পাশেই তাদের পবিত্রতম জায়গা, সেই আলো ছড়িয়েছে এখানেও। আছে তাদের প্রধানদের আলাদা জায়গা। তিন বছর পর পর এই আলাদা কমিটিগুলোর ভোট হয়, নতুনরা নির্বাচিত হয়ে আসেন। ব্যবস্থাপনা পর্ষদ আছে; তাতে ১২ সদস্য। ঋণ দেওয়ার কমিটি আছে পাঁচ জনের, অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিরীক্ষা বা অডিটের কমিটি আছে, সব কার্যক্রম পর্যবেক্ষক ও সাহায্যের জন্য কমিটি আছে। তারা সবাই সমাজের সম্মানিত মানুষ। পুরো সমিতিতে ৩১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। বিশাল সমিতিটির মোট সদস্য এখন পাঁচ হাজার ছয়শ তিনজন। তাদের দুই হাজার ৮১৮ জন পুরুষ; বাকি দুই হাজার ৭৮৫ জন নারী। সমিতির পূর্ণ সদস্যদের বাইরে আছেন মোট এক হাজার ১৬৩ জন সহযোগী সদস্য। একসময় তারা সমিতির পূর্ণ সদস্য হবেন। ৫৭ বছর পরে এসে তিলে তিলে বাবুই পাখির মতো জমানো মূলধন গড়েছেন মোট ১২৩ কোটি টাকা। কত মানুষের শ্রম লেগে আছে সেখানে। কত ইতিহাস আর ভাগ্যবদলের কাহিনী!
যেকোনো ঋণের ওপর লাখে ১২ টাকা হারে সরল সুদ নেয় সমিতি। সেই টাকা ফেরত দিতে না পারলে পরে আরও সময় বাড়ানো হয়। সুদের টাকা অন্য খাতে ঋণের জন্য তারা ব্যয় করেন। জানা গেল কথা বলে। তাদের ভাগ্যবদলের পাশে অর্জনও আছে। সমিতির প্রথম নারী সেক্রেটারি শর্মিলা রোজারিও। তিনি গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত ভাইস সেক্রেটারি এখন। সভাপতির দায়িত্বে আছেন সুমন এল রোজারিও। বললেন, ‘আমাদের প্রথম থেকেই স্লোগান– ‘সঞ্চয় আমাদের মূল লক্ষ্য, দারিদ্র্য দূরীকরণ আমাদের স্বপ্ন।’ এই স্বপ্ন ছড়াচ্ছি, মানুষের দারিদ্র্য দূর করছি সবাই মিলে। কেবল খ্রিস্টানরাই আমাদের সদস্য হতে পারেন। কারণ সেখানেই আমাদের যত কাজ। নারীরা আমাদের অন্যতম প্রধান টার্গেট। ফলে আলাদা উপ-কমিটি আছে তাদের জন্য। তাদের কাজের ব্যবস্থা নিজেরাই যেন করতে পারেন, সেজন্য প্রশিক্ষণ, ঋণের ব্যবস্থা আছে; তাদের নেতৃত্ব ও ক্ষমতায়নের জন্য আলাদা কমিটি ও প্রশিক্ষণ এবং কাজের ব্যবস্থা আছে।’ আরও বললেন তিনি, ‘‘এখন আমাদের প্রকল্প আছে–‘শেয়ার সঞ্চয়’, ‘দীর্ঘমেয়াদের সঞ্চয়’, ‘মাসিক মুনাফার সঞ্চয়’, ‘তিন মাসের সঞ্চয়’, ‘ছাত্র সঞ্চয়’, ‘সঞ্চয় প্রকল্প’, ‘হাউজিং ডিপোজিট বা বাড়ি তৈরির জন্য সঞ্চয়’, ‘বয়স্ক সঞ্চয়’, ‘উৎসব সঞ্চয়’, ‘বিয়ে সঞ্চয়’, ‘সহযোগী সদস্য সঞ্চয়’, ‘স্বাস্থ্যসেবা সঞ্চয়’, ‘মাদার ডেলিভারি কেয়ার (মায়ের সন্তান জন্মদানের সময় যত্ন) সঞ্চয়’, মিলিয়নিয়ার সঞ্চয় (সঞ্চয়ের টাকা নানা খাতে বিনিয়োগ করে কোটিপতি)’, ‘উচ্চ শিক্ষা সঞ্চয়’, ‘ব্যাংকঋণ শোধ সঞ্চয়’। এমন খাতগুলোতে আমাদের পাওয়া সঞ্চয় নানা খাতে ঋণ হিসেবে ব্যবহার করে এই মানুষদের ভাগ্য আরও উন্নতি করা হয়।”
তারা আজ পর্যন্ত সাধারণ খাতে ঋণ দিয়েছেন মোট ৭০ কোটি ৭৫ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৫ টাকা, উচ্চ শিক্ষার জন্য ঋণ দিয়েছেন ১ কোটি ৯২ লাখ টাকা, উচ্চ শিক্ষায় সহায়তা ঋণ দিয়েছেন ২৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা, মাদার ডেলিভারি কেয়ার প্রকল্পের মাধ্যেমে অন্যান্য মানুষকে ঋণ দিয়েছেন ১২ হাজার ১৫২ টাকা, দীর্ঘ মেয়াদের সঞ্চয়ী ঋণ আছে তাদের ৮৭ লাখ ৪৭ হাজার ৬৮২ টাকা, মাসিক মুনাফার ঋণ দিয়েছেন ৫ লাখ ৮২ হাজার ১৬০ টাকা আর মাসিক সঞ্চয় থেকে ঋণ দিয়েছেন ১৭ লাখ ২৮ হাজার ৫শ ৯ টাকা। সমবায় সমিতির কৃষি, পশু, খামার, গাড়ি–ইত্যাদি সদস্য ও মানুষের প্রয়োজনীয় সব খাতেই ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। তারা নানা ধরনের খেলার পৃষ্ঠপোষক। সমিতির টাকায় সেগুলোর আয়োজন হয়, নারীদের নানা ধরনের সাংস্কৃতিক উৎসবের জন্য টাকা দেয় সমিতি। এগুলো তাদের মানুষকে দেওয়া উপহার। এছাড়াও সমিতি তাদের লাভের, জমানোর টাকায় নাগরী খ্রিস্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়নের যেকোনো সদস্য, তার পরিবার এবং পরিজনকে প্রতিষ্ঠানের নিজেদের অ্যাম্বুলেন্সে, নিজেদের খরচে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা ও আশপাশে পৌঁছে দেয়। তাদের সদস্যদের বাড়িতে উন্নত পরিবেশ গড়ে দেয় নিষ্কাশন ব্যবস্থা তৈরি করে দিয়ে। গির্জা ও পুরো গাজীপুরের যেকোনো কবরের উন্নয়নে তাদের সাহায্য আছে। যেকোনো সদস্য মারা গেলে তারা সেই পরিবারকে প্রয়োজনীয় উন্নত জীবনের জন্য সাহায্য দেয়। গাজীপুরের বিভিন্ন খেলার মাঠ তৈরির পেছনে তাদের দান আছে। বিভিন্ন স্কুল, কলেজের কম্পিউটার তাদের দেওয়া। গরিব মানুষের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখার খরচ দেন তারা যেকোনো ধর্মের; তাদের উন্নত প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ দেন নিয়মিত।
নাগরী খ্রিস্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেডের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে ছেলে, মেয়েদের লেখাপড়া, বাড়ি তৈরি, ব্যবসার মূলধন সংগ্রহ, নিজের ও পরিবারের স্বাস্থ্যসেবা, গাড়ি কেনা, মাছের চাষ, পশু পালন, কৃষিজ ফসল, প্রযুক্তি কেনা, বিয়ে সবই করছেন তারা বছরের পর বছর। লাখের বেশি সদস্য তাদের ভোক্তা। এত সাফল্যে এবার তারা দেশের সেরা সমবায়ী হয়েছেন। আরো সাফল্য আছে তাদের অসাধারণ পালকে। ১৯৯৭ সালে এবারের মতো সেরা সমবায় সমিতি হয়েছেন। ১৯৮৭ সালে হয়েছেন ঢাকা বিভাগের দ্বিতীয় সেরা সমবায় সমিতি। সেন্টু গোমেজ নামের তাদের অন্যতম সমবায়ী ২০০৮ সালে দেশের সেরা দক্ষ সমবায়ী ব্যক্তি হয়েছেন। পেয়েছেন স্বর্ণপদক। ২০১০ সালে তারা হয়েছেন দেশ সেরা সমবায় সমিতি।
