কাউকে নেতা বানানোর তদবিরে নামতে এবার কেন্দ্রীয় নেতাদের মানা করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ প্রক্রিয়ায় কারও সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্কও করেছেন তিনি। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা দেশ রূপান্তরকে এ কথা জানিয়ে বলেন, গত মঙ্গলবার গণভবনে দলের সাধারণ সম্পাদকসহ কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতার সঙ্গে অনির্ধারিত এক বৈঠকে শেখ হাসিনা এ বিষয়ে সবাইকে হুঁশিয়ার করেন। বলেন, যারা নেতা বানানোর তদবির করবেন তাদের ‘নাম্বার’ কাটা যাবে। স্বচ্ছ, সৎ, যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব দিয়ে আগামী মার্চ থেকে মুজিববর্ষ উদযাপন শুরু করতে চায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এ লক্ষ্যে দলের সর্বস্তরে নেতৃত্বের পরিবর্তন আনতে শুরু করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত ‘ক্লিন ইমেজের’ নেতা নির্বাচন করেই মুজিববর্ষ থেকে নতুন আঙ্গিকে দল পরিচালনা করতে চান তিনি। এরই অংশ হিসেবে সহযোগী সংগঠনগুলোতেও বিতর্কমুক্ত নেতাদের পদ দিতে শুরু করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। আওয়ামী লীগের অন্যতম সহযোগী সংগঠন কৃষক লীগের নেতা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেই ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি।
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবার কে কোন বিবেচনায় নেতা হবেন তা নির্ধারণ করবেন একমাত্র দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা। অতীতে কে কোন পদ পাচ্ছেন তা সম্মেলনের আগেই অনেকটা চাউর হয়ে যেত। এবার সে বিষয়ে কেউই কিছু বলতে পারছেন না। সবাই একরকম অন্ধকারে আছেন। তিনি বলেন, নেতা নির্বাচনের ব্যাপারে দলের অন্য নেতাদের সঙ্গে আগে শলাপরামর্শ করলেও এবার কারও সঙ্গেই কথা বলছেন না শেখ হাসিনা।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী মুজিববর্ষ শুরু করতে চান বিতর্কমুক্ত নেতাদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দিয়ে। তাই ২০-২১ ডিসেম্বর জাতীয় সম্মেলনে আওয়ামী লীগেও আনা হবে স্বচ্ছ, সৎ, যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্বকে। বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির প্রায় অর্ধেক নেতা পরিবর্তন হবে এ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে। তাদের স্থলাভিষিক্ত হবেন তরুণ ও সম্ভাবনাময় নেতারা। কেন্দ্রীয় নেতারা আরও বলেন, যেখানেই বিতর্কিত নেতা আছেন, যত ক্ষমতাশালীই হোক তাকে বাদ দিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন শেখ হাসিনা। কারণ আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব বিতর্কমুক্ত করে সামনের দিকে পথ চলার কোনো বিকল্প নেই। তাই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দলের সভাপতি।
দলের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবারের জাতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে তারুণ্যনির্ভর দল হবে আওয়ামী লীগ। দলে কোনো দূষিত রক্ত থাকবে না এবার। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সর্বস্তরে ‘ফ্রেশ ব্লাডের’ নেতারা নেতৃত্ব দেবে। এককথায় সর্বস্তরে পরিবর্তন আসবে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা মনে করেন, আওয়ামী লীগকে ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে। আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবারই প্রথম নেতৃত্ব নির্বাচনের ব্যাপারে কারও কোনো পরামর্শ নিচ্ছেন না শেখ হাসিনা। সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্বের ব্যাপারেও একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন তিনি। সম্প্রতি কৃষক লীগের শীর্ষ দুই পদে একেবারেই নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দিয়েছেন। সম্পাদকম-লীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, সহযোগী সংগঠনের নেতা বানানোর তদবির নিয়ে তার দলের কেউ যেন সুপারিশ নিয়ে না যান এমন নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি। শেখ হাসিনাকে উদ্ধৃত করে আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর ওই সদস্য বলেন, প্রধানমন্ত্রী পরিষ্কার ভাষায় দলের নেতাদের জানিয়ে দিয়েছেন, কেউ কাউকে নেতা বানানোর এজেন্ডা নিয়ে মাঠে নামলে তার ‘কপাল পোড়া যাবে’। আমি তাদের নজরে রাখছি।
দলীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার আওয়ামী লীগের কোনো নেতাই জানেন না কে হবেন দলের কেন্দ্রীয় নেতা। শুধু তাই নয়, সহযোগী সংগঠনের সম্মেলন চলছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউই কোনোরকম পূর্বাভাস পাচ্ছেন না কাকে নেতা বানানো হবে। এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা কোনো নেতার সঙ্গেই পরামর্শও করছেন না। কেন্দ্রীয় নেতারা বলেন, নেতা বানানোর ব্যাপারে শেখ হাসিনা এবার একেবারেই নির্মোহ বিচার-বিশ্লেষণ করছেন। তারপর দায়িত্ব তুলে দিচ্ছেন।
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর আরেক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, কয়েক দিন আগে শেখ হাসিনা দলের প্রভাবশালী এক নেতাকে ডেকে বলেন, আমিও নাই, তুমিও নাই। কি ঠিক আছে? জবাবে ওই নেতা বলেন, ঠিক আছে। সম্পাদকমন্ডলীর ওই নেতা বলেন, নেতা নির্বাচনের ব্যাপারে একেবারেই নির্মোহ প্রধানমন্ত্রী। এ ব্যাপারে কারও অনুরোধ-আবদার গ্রহণ করবেন না।
দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের এবারের জাতীয় সম্মেলন অনেক অর্থবহ। সামনে মুজিববর্ষ। নতুন পথ পাড়ি দেবে আওয়ামী লীগ। দেশের কল্যাণে, জাতির কল্যাণে যে নেতৃত্ব প্রয়োজন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সে ধরনের নেতৃত্বই এবারের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে উপহার দেবেন।
