দেড় যুগেরও বেশি সময় পর গঠিত সিলেট জেলা ও মহানগর যুবদলের কমিটি বাতিলের দাবিতে মাঠে নেমে এবার মামলার আসামি হয়েছেন সংগঠনটির পদপ্রত্যাশী শতাধিক নেতাকর্মী।
নতুন এই কমিটি বাতিলের দাবিতে গত শনিবার নগরীতে বের করা মিছিলের কারণে ‘জনসাধারণ ও গাড়ি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা এবং রাষ্ট্রীয় কাজে বাধা প্রদান করা হয়েছে’ অভিযোগে এই মামলা করেছে পুলিশ। ওইদিন রাতে মামলাটি করার পর থেকেই গ্রেপ্তার এড়াতে গা ঢাকা দিয়েছেন যুবদলের নেতাকর্মীরা।
এদিকে দীর্ঘদিন পর নতুন কমিটি গঠনের মাধ্যমে সংগঠন চাঙ্গা হওয়ার বদলে সিলেট যুবদলের কোন্দল চরমে উঠেছে। বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত সিলেট বিএনপি-যুবদলের একটি পক্ষের অধিকাংশ নেতাকর্মী নতুন এই কমিটিতে স্থান পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে অন্য পক্ষগুলোর খুব একটা জায়গা হয়নি। এ কারণে ক্ষোভ-অসন্তোষ শুধুমাত্র যুবদলে নয়, তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়েছে বিএনপিতেও।
স্থানীয় বিএনপি ও যুবদল নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘ ১৯ বছর পর সিলেট জেলা ও মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয় গত পহেলা নভেম্বর। কিন্তু যুবদলের স্থানীয় রাজনীতিতে অনেক দিন ধরে সক্রিয় থাকা নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ এতে ঠাঁই না পাওয়ায় শুরুতেই কমিটি নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। পদপ্রত্যাশীরা নতুন কমিটি প্রত্যাখ্যান করে তা বাতিলের দাবিতে সরব হন।
তাদের এই দাবির সঙ্গে একাত্ম হন সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি এবং সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীসহ সিলেট বিএনপির প্রভাবশালী একাধিক নেতা। কমিটি পুনর্গঠনের দাবিতে আরিফুল হক চৌধুরী, মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ক সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক এবং সহ-স্বেচ্ছাসেবক সম্পাদক সামসুজ্জামান জামান দল থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এই চার নেতা গত ৩ নভেম্বর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে পদত্যাগপত্র জমাও দেন। কিন্তু দলের মহাসচিব তাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে সিলেটে যুবদলের কমিটি নিয়ে উদ্ভূত বিরোধ সমাধানের আশ্বাস দেন।
কিন্তু ওই আশ্বাস বাস্তবায়নে বিলম্ব দেখে যুবদলের পদপ্রত্যাশীরা শনিবার নগরীতে বড় একটি মিছিল বের করলে পুলিশ তাতে বাধা দেয়। এ সময় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং পুলিশের লাঠিপেটায় আহত হন ২০-২৫ নেতাকর্মী। পরে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়ার ঘটনায় ওইদিন রাতেই নগরীর কোতোয়ালি থানায় এসআই অনুপ কুমার বাদী হয়ে বিএনপি-যুবদলের ৩০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৭০-৮০ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। এজাহারে অনুমতি ছাড়া মিছিল, জনসাধারণ ও গাড়ি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রীয় কাজে বাধা প্রদানের অভিযোগ করা হয়েছে।
আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সিলেট জেলা যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইকবাল বাহার চৌধুরী, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সাদিকুর রহমান সাদিক, মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আজমল হোসেন রায়হান ও মওদুদুল হক মওদুদ, জেলা বিএনপির সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মতিউল বারী খুর্শেদ এবং বিএনপি নেতা আমিনুল হক বেলাল ও মাহবুবুল হক চৌধুরী।
এ ছাড়াও যুবদল ও ছাত্রদল নেতাদের মধ্যে রয়েছেন বদরুল আজাদ রানা, আবদুল খালিক মিল্টন, মোস্তফা কামাল ফরহাদ, শাহজাহান চৌধুরী মাহি, লাহিন চৌধুরী, রুজেল আহমদ, গোলাম মোস্তফা সুমন, কোহিনূর আহমদ, খালেদুর রশিদ ঝলক, দেলোয়ার হোসেন, রাসেল আহমদ, শহিদুল কবির কাদির, মোবারক হোসেন ফাত্তাহ, ঝিনুক আহমদ, এমএ দিলোয়ার, ফয়জুর রহমান পীর, আবদুস সামাদ, তছির আলী, দেলোয়ার হোসেন দিলু, আজিজুল হোসেন আজিজ, আফজাল হোসেন ও আবদুল মান্নান।
এর আগে গত পহেলা নভেম্বর যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুল ইসলাম নীরব এবং সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু অনুমোদিত সিলেট জেলা ও মহানগর যুবদলের নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এর মধ্যে ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি সিদ্দিকুর রহমান পাপলুকে আহ্বায়ক এবং সাবেক ছাত্রদল নেতা মকসুদ আহমদকে সদস্য সচিব করে সিলেট জেলা যুবদলের ২৯ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। অন্যদিকে সাবেক ছাত্রদল নেতা নজিবুর রহমান নজিবকে আহ্বায়ক এবং শাহনেওয়াজ বক্ত তারেককে সদস্য সচিব করে মহানগর যুবদলের ২৭ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
কিন্তু উভয় কমিটিতে যুবদলের সক্রিয় অনেক নেতা বাদ পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পদপ্রত্যাশীরা বলছেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এবং গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ (সদর) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের পছন্দের নেতারাই যুবদলের কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। তার বিপক্ষের বলয়ের নেতাকর্মীদের এতে খুব একটা জায়গা হয়নি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আরিফুল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিলেটে যারা দীর্ঘদিন ধরে যুবদলকে চাঙ্গা রেখেছে তাদেরকে বাদ দিয়ে একজন বিশেষ নেতার পছন্দের লোকজনকে দিয়ে পকেট কমিটি করা হয়েছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না। এভাবে চললে দলের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। তাই দল বাঁচাতে বিএনপি ও যুবদল নেতাকর্মীরা আন্দোলনে নেমেছে। প্রয়োজনে আমরা সবাই গণপদত্যাগ করব।’
