প্রায়ই নানারকম স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ ও শিক্ষাসফরের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের খবর প্রকাশিত হচ্ছে সংবাদ মাধ্যমে। এসব প্রশিক্ষণ বা শিক্ষাসফরের বেশিরভাগই খুবই সাধারণ বিষয়ভিত্তিক। কখনো প্রশিক্ষণ, কখনো শিক্ষাসফর কিংবা সরজমিন পরিদর্শনের মতো নানা নামে নানা কারণ দেখিয়ে এমন বিদেশ সফরে উচ্চপদস্থ সচিব থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা পর্যন্ত কেউই পিছিয়ে নেই। বিগত বছরগুলোতে বিদেশ সফর নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হলেও কিছুতেই তা কমানো যাচ্ছে না। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, এখন কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই ওই প্রকল্পের বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তার বিদেশ সফরের বাজেট বরাদ্দ অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কোন পর্যায়ের কর্মকর্তারা কেন বা কোন বিষয়ে কী প্রশিক্ষণ নিতে কোন দেশে যাবেন সেসব উল্লেখ করা না হলেও তাদের বিদেশ সফরের জন্য বাজেট বরাদ্দটা আগেই নিশ্চিত করা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ঘটনা থেকে উন্মোচিত হয়েছে যে, কর্মকর্তাদের এমন বিদেশ সফরের বেশিরভাগই আদতে ‘প্রমোদ ভ্রমণ’ বৈ কিছু নয়।
গত মাসেই দেশ রূপান্তরে ‘জনপ্রতি ৬ লাখ টাকায় ২০০ কর্মকর্তার বিদেশ ভ্রমণ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রস্তাবিত সক্ষমতা জোরদারকরণ প্রকল্পে বিদেশ সফরের জন্য বিপুল বাজেট বরাদ্দের খবর প্রকাশিত হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে ‘মেশিন চালানো শিখবেন বিজ্ঞানীরা!’ শিরোনামের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়Ñ দেশের কৃষিপণ্য তথা আলু-পেঁয়াজ-পটোল বেচার কৌশল শিখতে একটি প্রকল্পের ৪০ কর্মকর্তা বিদেশ সফরে যাচ্ছেন। আর কৃষি যন্ত্রপাতি চালানোর কৌশল শিখতে অন্য আরেকটি প্রকল্পের আওতায় আরও ৪০ কর্মকর্তা বিদেশ যাবেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন ২০ জন বিজ্ঞানী। এজন্য প্রকল্পে মোটা অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের এই দুই প্রকল্পের আওতায় বিদেশ সফরে বাস্তবায়নকারী সংস্থার ব্যক্তিরা ছাড়াও মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) কর্মকর্তারও নাম রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্ঞান অর্জনের জন্য বিদেশ সফর জরুরি। উন্নত প্রশিক্ষণ না পেলে টেকসই উন্নয়ন করা যাবে না। তাই এসব সফর রাখা হয়েছে। তবে পরিকল্পনা কমিশন ও আইএমইডির কর্মকর্তারা কেন ওই সফরে যাবেন সেটা তারা জানেন না।
সরকার সম্প্রতি কৃষকের ভাগ্যবদল ও কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নে আলাদা দুটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে কৃষি বিপণন ব্যবস্থা জোরদারকরণে ১৬০ কোটি টাকা আর ধান চাষে যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ানোর দক্ষতা আনতে ৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট আলাদাভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে। এ দুটি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাবনা (ডিপিপি) পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দুটি প্রকল্পেই বিদেশ সফরকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। আগামী বছর এ দুটি প্রকল্পের কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর করার কথা। ডিপিপিতে বলা হয়েছে, কৃষিপণ্য বিপণনে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। এই কৃষিপণ্য বিপণনে আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যা, দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, চীন, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়ায় বৈদেশিক প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে। এই প্রশিক্ষণে প্রতি ব্যাচে ১০ জন করে তিনটি ব্যাচ মোট ৩০ জন বিদেশ যাবেন। এ তালিকায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের দুজন, আইএমইডি ও পরিকল্পনা কমিশনের একজন করে, প্রকল্প প্রণয়ন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা পাঁচজন থাকবেন। এছাড়া ভারতে শিক্ষা সফরে যাবেন ১০ কর্মকর্তা। এরা গৃহস্থালি পর্যায়ে শাকসবজি ও ফলমূল সংরক্ষণে প্রযুক্তির ব্যবহার দেখবেন।
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, এ ধরনের বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে নন-টেকনিক্যাল কর্মকর্তারাও টেকনিক্যাল বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ নিতে যাচ্ছেন। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, প্রশিক্ষণ শেষে সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা মানা হচ্ছে না। বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের জন্য যেমন সরকারি অনুমতির প্রয়োজন হয়, তেমনি কোন কর্মকর্তারা কোন দেশে কী কারণে কতদিন অবস্থান করেছেন তারও বিস্তারিত সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানোর বিধান রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ইতিপূর্বে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানোর নির্দেশনা জারি করেছিল। অথচ প্রায় কেউই এসব নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছেন না। সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না নিয়ে প্রমোদ ভ্রমণের ফলে শুধু দেশের অর্থই অপচয় হচ্ছে না, বাস্তব দক্ষতার বিকাশ থেকেও কর্মকর্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিভিন্ন প্রকল্প এবং দেশের ওপরই পড়বে। এ অবস্থায় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবশ্যই দেশের টাকার এমন অপচয় রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে অবশ্যই কর্মকর্তারা বিদেশে যাবেন, প্রশিক্ষণ নেবেন, পড়ালেখা করবেন, কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই শিক্ষাসফরের নামে প্রমোদ ভ্রমণে পর্যবসিত না হয়। বিদেশে এত এত প্রশিক্ষণ দেশের কতটা কাজে লাগছে সে বিবেচনা মাথায় রাখা জরুরি।
