সরকারি চিনিকলগুলো মৃতপ্রায়। প্রতি বছরই লোকসানের পাহাড় ভারী হচ্ছে। ব্যাংকের বাড়ছে পুঞ্জীভূত দেনার দায়। আখ কেনার টাকা নেই, নিয়মিত বেতন-ভাতা পরিশোধের অর্থও নেই চিনিকলগুলোর। ১৬ বছর আগে দেশে বেসরকারিভাবে চিনিকল চালু হওয়ার পর থেকে সরকারি ১৫ কলের ‘দম যায় যায়’ অবস্থা। সরকারি চিনিকলগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে জরুরি ভিত্তিতে ১২৭০ কোটি টাকা চেয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। এই টাকা সরকারের কাছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) পাওনা রয়েছে।
বিএসএফআইসির আওতায় বর্তমানে ১৫টি চিনিকল ও ১টি প্রকৌশল কারখানা রয়েছে। এই ১৫ চিনিকলের মধ্যে একমাত্র কেরু অ্যান্ড কোং বাদে বাকি ১৪টিই বড় ধরনের লোকসানে রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে এসব চিনিকলে উৎপাদিত দেশি আখের চিনি ও বিদেশ থেকে আমদানি করা চিনি দিয়ে দেশের চাহিদা মেটানো হতো। ২০০২ সাল থেকে বেসরকারি খাতকে বিদেশ থেকে র সুগার আমদানি করে চিনি উৎপাদনের অনুমোদন দেয় সরকার। তারপর থেকে এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উৎপাদন খরচে পেরে উঠছে না সরকারি কলগুলো। সরকারি ও বেসরকারি চিনিকলগুলো সরকার নির্ধারিত একই দরে বাজারে বিক্রি হওয়ায় উৎপাদন খরচের চেয়ে কমে বিক্রি করতে হচ্ছে সরকারি কলগুলোকে। এতে প্রতি বছরই আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিল্প সচিব মো. আবদুল হালিম।
গত ৭ নভেম্বর অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদারকে লেখা চিঠিতে শিল্প সচিব লিখেছেন, ২০১০-১২ সালে বিদেশ থেকে আমদানি করা চিনি কম দামে বিক্রি করায় বিএসএফআইসির বাণিজ্য ঘাটতি বা লোকসান হয় ৪৮৯ কোটি টাকা। সরকারের ১৫ চিনিকলে উৎপাদিত চিনি সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি হয়। সরকার যে দাম নির্ধারণ করে তা এসব চিনিকলের উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম। এ কারণে ২০০৬-০৭ থেকে ২০১২-১৩ অর্থবছর পর্যন্ত সরকার নির্ধারিত দরে চিনি বিক্রি করে বিএসএফআইসির লোকসান হয় ১৪১৯ কোটি টাকা।
অর্থাৎ মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৯০৮ কোটি টাকা। আর বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তরের দাখিল করা বিশেষ নিরীক্ষা হিসাব অনুযায়ী ২০১২-১৩ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারের কাছে বিএসএফআইসির পাওনার পরিমাণ ১৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে অর্থ বিভাগ থেকে ৪৩০ কোটি টাকা মঞ্জুর ও ছাড় করা হয়েছে। বাকি ১২৭০ কোটি টাকা সরকারের কাছে এখনো পাওনা রয়েছে। তাছাড়া ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত মূল্য পার্থক্য (ভর্তুকি) বাবদ সরকারের কাছে বিএসএফআইসির পাওনার পরিমাণ ৩৪৮৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকারের কাছে করপোরেশনের মোট পাওনা রয়েছে ৪৭৫৩ কোটি টাকা।
আবদুল হালিম চিঠিতে লিখেছেন, ৫০০ কোটি টাকা মঞ্জুর ও ছাড়করণের জন্য ২০১৮ সালের ১২ আগস্ট শিল্পমন্ত্রী আধাসরকারি পত্র দেন অর্থমন্ত্রীকে। পরে আখচাষিদের আখের মূল্য পরিশোধ, শ্রমিক কর্মচারীদের বকেয়া বেতন-ভাতা, অবসরোত্তর পাওনাদি ও ব্যাংকঋণ পরিশোধ বাবদ ৫০০ কোটি টাকা মঞ্জুর ও ছাড় করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৯ ডিসেম্বর অর্থ বিভাগে চিঠি দেওয়া হয়। তারপর থেকে বারবার তাগাদা দিয়ে পত্র পাঠানো হচ্ছে। একাধিকবার অনুরোধ করা হলেও অর্থ বিভাগ থেকে কাক্সিক্ষত অর্থ না পাওয়ায় সময়মতো আখচাষিদের আখের মূল্য পরিশোধ, সরকার কীটনাশক সরবরাহ করতে না পারায় দিন দিন চাষিরা আখ উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। তাছাড়া চিনিকলে আখ সরবরাহের বদলে আখচাষিরা গুড় উৎপাদনে আখ ব্যবহার করছেন। ফলে চিনিকলগুলো প্রতি বছরই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আখ পাচ্ছে না। এতে চিনি উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
শিল্প সচিব জানান, আর্থিক সংকটের কারণে মিলের শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়মিতভাবে বেতন-ভাতা, অবসরোত্তর পাওনা (পিএফ ও গ্র্যাচুইটি), সরবরাহকারীদের বকেয়া পাওনা এবং ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় ক্রমপুঞ্জিত ঋণের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। অর্থ বিভাগের সহযোগিতা ছাড়া স্বাস্থ্যসম্মত আখের চিনি উৎপাদনকারী একমাত্র রাষ্ট্রীয় এ শিল্প রক্ষা করা দুরূহ হয়ে পড়ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, গত অর্থবছর ৮৫৪ কোটি টাকা লোকসান করেছে সরকারি চিনিকলগুলো। সরকারের শীর্ষ ১০ লোকসানি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চিনিকলই রয়েছে দুটিÑ রাজশাহী সুগার মিলস ও মোবারকগঞ্জ সুগার মিলস। এ দুটি প্রতিষ্ঠানের লোকসান ১৪৭ কোটি টাকা। এসব পুরনো চিনিকলের লোকসানে ভর্তুকি দিতে দিতে হয়রান হয়ে যান ২০০৯ সাল থেকে দুই মেয়াদে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি লোকসানি এসব চিনিকল বন্ধ করে দেওয়ার কথাও বলেছিলেন। চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের ব্যাংকঋণ ও দায়দেনার পরিমাণ সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এখন সংস্থাটির চাওয়া, লোকসান কমাতে ব্যাংকঋণ সুদসহ এককালীন মওকুফ করা হোক। ঋণ মওকুফের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে আবেদনও করেছে করপোরেশনটি।
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান অজিত কুমার পাল গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, লোকসান কমাতে চিনিকলগুলো আধুনিকায়নের জন্য একটি প্রকল্প প্রণয়ন করেছি। তাতে ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দরপত্র আহ্বানের পর সর্বনিম্ন ২৪০০ কোটি টাকার দরপত্র পাওয়া গেছে। ফলে ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। অর্থ মন্ত্রণালয়ে করা ঋণ মওকুফের আবেদনেও কোনো সাড়া মেলেনি বলে জানান তিনি।
