মহাসড়কে টোল প্লাজায় যানজটের বিড়ম্বনা নিত্যদিনের। ঈদের আগে-পরে যানবাহনের দীর্ঘ সারি কয়েক কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়। মূলত নগদ টাকায় টোল আদায়ে বাড়তি সময় ব্যয়ই এ যানজটের কারণ। তাই টোলযোগ্য সেতুতে টোল আদায় সহজ ও দ্রুততর করার মাধ্যমে যানজট কমাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রি-পেইড ইলেকট্রনিক কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল আদায়ের নির্দেশনা দিয়েছিলেন।
২০১৪ সালের ২৪ জুন অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে শেখ হাসিনা এ প্রসঙ্গে অনুশাসন দেন যে, ‘টোল আদায়ের নীতিমালা অনুযায়ী টোলযোগ্য সেতু নির্মাণের ড়্গেত্রে প্রি-পেইড ইলেকট্রনিক কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল আদায়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি এখনো। তবে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহাসড়কে টোল বসানোর অনুশাসন দেওয়ার পর তা বাস্তবায়নে কাজ শুরু হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। প্রি-পেইড কার্ড চালুর বিষয়ে জানতে গতকাল সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলামের মোবাইলে ফোন করা হলে তিনি ধরেননি। তবে একই বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবদুল মালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ ধরনের অনুশাসন থাকার কথা আগে কখনো শুনিনি। অনেক ড়্গেত্রে ই-টিকিটিং, ডিজিটালাইজেশন করার কাজ চলছে। তবে সুনির্দিষ্ট বলতে গেলে টোল দেওয়ার জন্য প্রি-পেইড ইলেকট্রনিক কার্ড চালুর কোনো উদ্যোগ আছে কি না, তা আমার জানা নেই।
রাজধানীর শাহবাগে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবার প্রাণহানির ঘটনার পর সরকার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বারবার আন্ডারপাস নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। তবে তা বাস্তবায়ন পর্যন্ত গড়ায় না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ২০১৬ সালের ২ ফেব্রম্নয়ারি সেখানে আন্ডারপাস নির্মাণে স্থানীয় সরকার বিভাগকে অনুশাসন দিয়ে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) ও বারডেমের সঙ্গে সহজ সংযোগ-চলাচলের জন্য শাহবাগের রূপসী বাংলা হোটেলের (বর্তমানে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল) কাছে একটি মুখ, পুরাতন রেডিও ভবনের কাছে আরেকটি মুখ এবং বিএসএমএমইউর কাছে আরেকটি মুখসংবলিত একটি আন্ডারপাস নির্মাণের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর এ অনুশাসনের পরও শাহবাগে আন্ডারপাস নির্মাণের কোনো উদ্যোগ নেই।
প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন দীর্ঘদিনেও বাস্তবায়ন না হওয়া প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া যেকোনো অনুশাসন অবশ্যই পালনীয়। কোনো অনুশাসন এখনো বাস্তবায়ন না হয়ে থাকলে সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তর পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করছি।
২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর একনেকের বিভিন্ন বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন গুরুত্বপূর্ণ অনেক অনুশাসনই এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। কোনো কোনো মন্ত্রণালয় বেশকিছু অনুশাসন বাস্তবায়নে যেমন উদ্যোগ নিয়েছে, তেমনি পুরনো অনেক অনুশাসন বাস্তবায়নের তাগিদও নেই তাদের মধ্যে।
২০০৯-১০ অর্থবছরে সদরঘাট থেকে আশুলিয়া নৌপথের নিচু সেতুগুলো উঁচু করার ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে অনুশাসন দেন শেখ হাসিনা। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালুসহ সব নদীর অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে তার পাড়ে ওয়াকওয়ে ও গার্ডেন নির্মাণের কথাও বলেন তিনি। পরে বিভিন্ন সময় এ বিষয়ে প্রকাশ্যে ও বৈঠকে নির্দেশনা দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ২০১০ সালের ১১ মে একনেক বৈঠকে মধুপুর-ভাওয়াল বনাঞ্চল দখলমুক্ত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শালবনের দখল করা জমি উদ্ধারের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং বন বিভাগের জমিগুলো সরকারের দখলে রাখতে হবে।’ গুরুত্বপূর্ণ এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি, বনও দখলমুক্ত হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
‘চামড়া শিল্পনগরী, ঢাকা (২য় সংশোধিত)’ প্রকল্পের আওতায় কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) স্থাপনে প্রধানমন্ত্রী অনুশাসন দিয়েছিলেন ২০১৩ সালের ৩০ জুলাই। সেই সিইটিপি এখনো পুরোপুরি চালু করতে পারেনি শিল্প মন্ত্রণালয়। এছাড়া দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে দুটি চামড়া শিল্পনগরী স্থাপনে উদ্যোগ নিতে শিল্প মন্ত্রণালয়কে ২০১৭ সালে অনুশাসন দিলেও তা বাস্তবায়নে এখনো কোনো উদ্যোগ নেই।
এ বিষয়ে শিল্প সচিব মো. আবদুল হালিম জানান, চেষ্টা থাকলেও অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে সিইটিপি সময়মতো সম্পূর্ণভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। আশা করছি, আগামী ডিসেম্বরে এটি পুরোপুরি চালু হবে।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পাঁচ বছর ও পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর মেয়াদকালে যারা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেননি এবং ঋণের সুদাসল আংশিক বা সম্পূর্ণ মওকুফ করানো হয়েছে, তাদের একটি তালিকা চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর ২১ জুলাই অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে এক মাসের মধ্যে ওই তালিকা করে তা একনেকে উপস্থাপন করতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অনুশাসন দিয়েছিলেন তিনি। তারপর ১০ বছর কেটে গেলেও এরকম কোনো তালিকা একনেকে পেশ করার খবর পাওয়া যায়নি।
সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজধানীর ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিভিন্ন সড়কে তাদের বসার ব্যবস্থা করা হয়, যার নাম দেওয়া হয় ‘হলিডে মার্কেট’। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ধীরে ধীরে হকাররা আবারও ফুটপাত দখল করতে থাকে। এ প্রেক্ষাপটে ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী একনেক বৈঠকে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে নির্দেশনা দেন যে, ‘ফুটপাতের দোকানদারদের পুনর্বাসনের জন্য সাপ্তাহিক বন্ধের দিনগুলোতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এলাকাভিত্তিক ‘সাপ্তাহিক বাজার’-এর ব্যবস্থা করতে হবে। হকারদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসনের জন্য ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানে বহুতল মার্কেট নির্মাণ করে তাদের পুনর্বাসিত করতে হবে। এ ড়্গেত্রে প্রকৃত হকারদের শনাক্তকরণের জন্য ছবি তুলে-ভিডিও করে রাখতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর এ অনুশাসনও বাস্তবায়ন হয়নি। ২০১৭ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি আবারও ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ করে ‘সাপ্তাহিক মার্কেট’ বসানোর দিন ধার্য করতে নির্দেশনা দেন। এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়া পরিবেশসম্মতভাবে রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, ড্রেনের পানি খালে যাওয়া বন্ধ করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে অনুশাসন দিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন সম্পর্কে আমরা অবগত। এগুলো বাস্তবায়নে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এখন যেগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সেগুলো করছি। যেগুলো পরে করতে হবে, সেগুলোর বিষয়ে উদ্যোগ নিচ্ছি। পর্যায়ক্রমে সবই বাস্তবায়ন করা হবে।
রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে মেয়র আতিক বলেন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আমরা স্থানীয় সরকার বিভাগকে চিঠি দিয়েছি। স্থানীয় সরকার বিভাগ এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে। সমন্বিত ড্রেনেজ বিষয়েও কাজ চলছে।
গত ২৬ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে বিসিকের চেয়ারম্যান মো. মোশতাক হাসান জানান, ঢাকার নবাবগঞ্জ, টাঙ্গাইল, যশোর, খুলনায় বিভিন্ন স্থানে ৫০টি নতুন শিল্পনগরী স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ ব্যাপারে স্পষ্ট অনুশাসন রয়েছে যে, নতুন করে দেশে আর শিল্পনগরী স্থাপনের দরকার নেই। বরং দেশের বিভিন্ন এলাকায় যে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন হচ্ছে সেখানে প্লট কিনে শিল্পনগরী স্থাপন করতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল বিসিক চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এ অনুশাসন আমরা পালন করছি। যেখানে বেজার অর্থনৈতিক অঞ্চল আছে, সেখানে প্লট নিচ্ছি। তবে যেখানে বেজার জমি নেই, সেখানে নতুন শিল্পনগরী স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২০১২ সালের ৮ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একনেকে অনুশাসন দিয়ে বলেন, ‘অভিজ্ঞ কর্মকর্তা-বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক্রমে সারা দেশে বৃক্ষরোপণের জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে এবং এ নীতিমালা অনুযায়ী দেশে বৃক্ষরোপণের ব্যবস্থা নিতে হবে।’ এ নীতিমালা প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় তখনকার পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়কে। ওই নীতিমালা প্রণয়নের কোনো উদ্যোগ আছে কি না– জানতে চাইলে পরিবেশ সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরী গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়ে এখনই কিছু বলতে পারছি না। বিষয়টি নিয়ে পরে কথা বলব।’
