২০১৬ সালের ১ জুলাই রাজধানী ঢাকার হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়ংকর জঙ্গি হামলা স্তম্ভিত করে দিয়েছিল পুরো বাংলাদেশকে। গুলশানের কূটনৈতিক এলাকায় দেশের ভয়াবহতম এ জঙ্গি হামলায় দেশি-বিদেশি ২০ নাগরিকের নিহত হওয়ার ঘটনা বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলে। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীর সক্রিয় উপস্থিতির আশঙ্কায় জনমনে তীব্র ভীতির সঞ্চার করেছিল ওই হামলা। একই সঙ্গে এ কথাও স্মর্তব্য যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সেনা কমান্ডোদের ত্বরিৎ অভিযানে দ্রুততম সময়ের মধ্যে হামলাকারী পাঁচ জঙ্গিকে হত্যা করে রেস্তোরাঁটিতে জিম্মি হয়ে থাকা ব্যক্তিদের উদ্ধার করার ঘটনাও দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছিল। হলি আর্টিজানে হামলা এবং হামলার পর দেশজুড়ে জঙ্গিদমন অভিযান নানা বিবেচনাতেই বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ইতিবৃত্তে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
চাঞ্চল্যকর এ মামলায় পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, হলি আর্টিজান হামলায় জড়িত গোষ্ঠীর নাম ‘নব্য জেএমবি’; যারা ঘটনার পর নিজেদের আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস (ইসলামিক স্টেট) বলে দাবি করেছিল। ওই হামলায় জঙ্গিদের নৃশংসতায় প্রাণ হারিয়েছিলেন দেশি-বিদেশি নারী ও শিশুসহ মোট ২০ জন নিরস্ত্র মানুষ। নিহতদের মধ্যে ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ১ জন ভারতীয় এবং ৩ জন বাংলাদেশি। ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। এরপর গত এক বছরে রাষ্ট্রপক্ষ এ মামলায় মোট ১১৩ জন সাক্ষী হাজির করেছে। মামলার রায়ে আট আসামির মধ্যে সাত জঙ্গিরই মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছে, খালাস পেয়েছেন এক আসামি। তবে পুলিশ জানিয়েছে, খালাস পাওয়া আসামির বিষয়ে আপিল করবে তারা।
পুলিশের তদন্ত, আসামিদের জবানবন্দি এবং মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণ থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, হলি আর্টিজানে হামলা চালানোর পেছনে জঙ্গিদের তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। রাজধানীর কূটনৈতিক এলাকায় হামলা করে নিজেদের সামর্থ্য জানান দেওয়া, বিদেশি নাগরিকদের হত্যা করে নৃশংসতার প্রকাশ ঘটানো এবং দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা। এ হামলার মধ্য দিয়ে জঙ্গিরা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ‘আইএস’-এর অস্তিত্ব জানান দিতে চেয়েছিল এবং জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে চেয়েছিল। তবে আশার কথা হলো, হামলার পর সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠোর অবস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একের পর এক অভিযানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় জঙ্গিদের অনেক আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। সে সময় এসব অভিযানে নিহত হয়েছেন হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার প্রধান পরিকল্পনাকারী তামিম চৌধুরীসহ হামলায় জড়িত গুরুত্বপূর্ণ আট জঙ্গি। এছাড়া আক্রমণকারী পাঁচ জঙ্গি ঘটনার পরদিন সকালেই সেনা কমান্ডোদের অভিযানে নিহত হয়।
হলি আর্টিজান হামলা এবং এ মামলার বিচার অবশ্যই বিস্তারিত পর্যালোচনার দাবি রাখে। এ ঘটনা একটা বিষয় স্পষ্ট করেছে যে, জঙ্গিবাদ এমন এক মতাদর্শিক রাজনৈতিক কৌশল যার মাধ্যমে বহু মানুষকে নানাভাবে সংযুক্ত করে বহু স্তরে বিন্যস্ত করে পরিচালিত করা সম্ভব। জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীগুলো নানা আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সর্বাধুনিক নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজেদের আড়ালে রেখে এ ধরনের হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। অন্যদিকে এটাও দেখা গেল যে, জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই এ ধরনের জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড নজরদারিতে এনে তাদের অনেকটাই নির্মূল করা সম্ভব। এ ড়্গেত্রে হলি আর্টিজান হামলা-পরবর্তী দেশব্যাপী জঙ্গিদমন অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব প্রশংসার দাবি রাখে। একই সঙ্গে জঙ্গিদের গ্রেপ্তার করতে পারা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পারা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ঘটনা। কেননা বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেমন যথাযথ তদন্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করা যায়, তেমনি বিচারের দৃষ্টান্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা জাগানোর পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করতে পারে। ইতিবাচক এ রায়ের সূত্র ধরে এই আশা ব্যক্ত করা যায় যে, অচিরেই দেশের অপরাপর জঙ্গি হামলাগুলোর বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে হলি আর্টিজান হামলার বিচার নিশ্চয়ই জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশের সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে ভুলে গেলে চলবে না যে, জঙ্গিবাদের মতাদর্শিক সন্ত্রাস শুধু বাংলাদেশ বা বিশ্বের কোনো একটি বিশেষ অঞ্চলের সংকট নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়েই জঙ্গিবাদের নানামুখী বিস্তার দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি, দেশে সামাজিক ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীন ও ধর্মীয় বিদ্বেষমুক্ত সমাজ গঠনের মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে জোর দেওয়া জরুরি। কেননা দেশ বা সমাজের এমন অসংগতিগুলোকে পুঁজি করেই তরুণদের বিপথগামী করার চেষ্টা চালায় জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো। ফলে এ হামলার বিচার ইতিবাচক হলেও আত্মপ্রসাদের কোনো সুযোগ নেই। সম্ভবত তারই ইঙ্গিত দেখা গেল রায় ঘোষণার দিন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি রায় ঘোষণার পর কীভাবে ‘আইএস’-এর প্রতীক সংবলিত টুপি পরে আদালত থেকে বের হলেন সেই রহস্য উদঘাটন করা যেমন জরুরি, তেমনি জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় সামাজিক সচেতনতা ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি গ্রহণও জরুরি
