প্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার ছেলে, কোটিপতি মেয়ের বাবার ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০১৯, ০২:৪০ পিএম

হুমায়ুন সাইফুল কবির। বয়স ৭২ বছর। জীবনের উচ্চশিক্ষা শেষ করে ১৯৭৮ সালে চাকরি নিয়েছিলেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের সুপারভাইজার হিসেবে। কিন্তু মাত্র ৩ বছরের মাথায় সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজে শুরু করেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ।

প্রথম শ্রেণির একজন ঠিকাদার হয়ে সততা আর সৎ থেকে সফলতার সঙ্গে দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে ঠিকাদারি করেছেন। জীবনের কঠোর পরিশ্রমের অর্থ দিয়ে এক ছেলে ও এক মেয়েকে পড়ালেখা শিখিয়েছেন। চেষ্টা করেছিলেন মানুষের মতো মানুষ করার। হুমায়ুন সাইফুল কবিরের ছেলেমেয়ে মানুষ হয়েছেন ঠিকই তবে প্রকৃত মানুষ হিসেবে সমাজের কাছে জন্মাতে পারেনি।

দু’চোখে আকাশভরা স্বপ্ন আর সন্তানদের মানুষ হওয়ার কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন তিনি।

কোটিপতি ছেলেমেয়ে থাকা সত্ত্বেও মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই হুমায়ুন সাইফুল কবিরের। শেষ ঠিকানা হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে!

ঢাকায় আটটি ফ্ল্যাট, ছেলে বিদেশে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, মেয়ে কোটিপতি হয়েও জন্মদাতা বাবার খোঁজ নেয়নি দীর্ঘ ১১ বছর ধরে।

দিনাজপুরের রাজবাটী শান্তি নিবাসে একা একা দিন কাটে হুমায়ুন সাইফুল কবিরের। এক সময়ের অঢেল টাকা, ছেলের বিদেশে চাকরি আর মেয়েকে উচ্চ শিক্ষিত করে বিয়ে দিয়েছেন তিনি।

বর্তমানে হুমায়ুন সাইফুল কবিরের ছেলে রাফিউল কবির কুয়েতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে চাকরি করেন। মেয়ে শারমিন কবির মিমি বাবার দেখানো পথে ঠিকাদারি করে কোটিপতি বনে গেছেন।

হুমায়ুন সাইফুল কবির বলেন, ‘আমি পড়ালেখা শেষ করে সড়ক ও জনপথ বিভাগে ঢাকা হেড অফিসে সুপারভাইজার পদে তিন বছর চাকরি করেছি। কিন্তু সেখানে দুর্নীতি থাকায় তিন বছর চাকরি করার পর সেটা ছেড়ে দিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু করি। সৎ পথে প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারি করে ছেলে রাফিউল কবির ও মেয়ে শারমিন কবির মিমিকে পড়ালেখা করিয়েছি। ছেলে বর্তমানে কুয়েতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে চাকরি করে আর মেয়ে শারমিন কবির ঠিকাদারি করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার ঢাকার মোহাম্মদপুরে ৭ তলা একটি ভবনে ৮টি ফ্লাট ছিল। ছেলেকে ৪টি এবং মেয়েকে ৪টি ফ্লাট লিখে দেই। বাকি অল্প একটু জমি সেগুলো মসজিদে দান করে দিয়েছি। ছেলে বিদেশে থাকে আর মেয়ে থাকে নোয়াখালীতে। দীর্ঘ ১১ বছর আগে ছেলেমেয়ের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। এরপর তারা আর আমার কোনো খোঁজ খবর নেয়নি। ঠিকাদারির সুবাদে আমি দিনাজপুরে দীর্ঘ ২৪ বছর থেকেছি। ছেলেমেয়েকে মানুষ করেছি। কিন্তু সেই ছেলেমেয়েরাই আজ আমার খোঁজ খবর নেয় না।’

তিনি বলেন, ‘আমি যখন সব হারিয়ে পথে বসলাম তখন আমার ছেলেমেয়েরা খোঁজখবর নেওয়া বন্ধ করে দিল। উপায় না পেয়ে আমি দিনাজপুরের শান্তি নিবাসে থাকছি। এখানে অনেক ভালো আছি। নিয়মিত জেলা প্রশাসক ও ইউএনও স্যার আমাদের খোঁজখবর রাখেন। আমাদের সন্তানের মতো দেখাশোনা করেন।’

‘নিজের সন্তানই যখন আমাদের ফেলে চলে গেছে তখন শেষ ভরসাস্থল হিসেবে শান্তিনিবাসে থাকতে পেরেই আমাদের জন্য বিরাট পাওয়া’ বলেন সাইফুল কবির।

তবুও সাইফুল কবির ৫ ওয়াক্ত নামজ পড়ে দোয়া কামনা করেন ছেলেমেয়েদের জন্য। তারা যেখানেই থাকুক ভালো থাকুক এই কামনাই করেন সাইফুল কবির।

হুমায়ুন সাইফুল কবিরের শেষ ইচ্ছার কথা তিনি দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের কাছে এভাবেই অনুরোধ করে বলেছেন, ‘আমি যদি এখানেই মারা যাই তাহলে আমার লাশটা যেন অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া না হয়। এই শান্তি নিবাসের আশপাশেই আমাকে যেন কবর দেওয়া হয়!’

দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের সার্বিক তত্ত্বাবধানে চলে দিনাজপুরের রাজবাটীর এই শান্তি নিবাস।

জেলা প্রশাসক (ডিসি) মাহমুদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যার পৃথিবীতে মা-বাবা নেই তারাই হয়ত মা বাবার কষ্ট বুঝেন। আবার যাদের মা-বাবা থেকেও তাদের প্রতি অবহেলা করেন তারা কেমন মানুষ আমি সেটা বলতে পারব না। তবে শান্তি নিবাসে থাকা বৃদ্ধ মা-বাবাদের যাতে কোনো ধরনের অসুবিধা না হয় এজন্য সার্বক্ষণিক তাদের খবর রাখা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত