কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতাল কতৃ©পক্ষ। আজ বুধবার তৈরি করা রিপোর্ট আদালতে জমা দেওয়া হবে। গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে এ কথা জানিয়েছেন বিএসএমএমইউর এক কর্মকর্তা। গত ২৮ নভেম্বর প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ বিএসএমএমইউ কতৃ©পক্ষকে এই আদেশ দিয়েছিল।
খালেদা জিয়ার সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা নিয়ে যে রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে সে বিষয়ে জানতে গতকাল দুপুরে বিএসএমএমইউর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে মাহবুবুল হকের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটা মিটিংয়ে আছি। পরে কথা বলি।’ পরে রাতে হাসপাতালের পরিচালক বলেন, ‘ইটস কনফিডেনশিয়াল। নো কমেন্টস।’
খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে বিএসএমএমইউ গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান, মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. জিলন মিয়া সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভালো আছেন খালেদা জিয়া। ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য নিয়ে জিলন মিয়া সরকারের বক্তব্যের বিষয়টি অবহিত করে সে সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওনারা চেয়ারপারসনের স্বাস্থ্য নিয়ে সত্য কথা বলেননি। খালেদা জিয়া দুজনের সহযোগিতা ছাড়া দাঁড়াতে পারেন না। হাঁটতে পারেন না। দুজন ধরে তাকে তুলে চেয়ারে বসাতে হয়। নিজে খেতে পারেন না। চামচ দিয়ে খাবার মুখে তুলে দিয়ে খাওয়াতে হয় তাকে।’
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএসএমএমইউর এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত সোমবার আদালতের নির্দেশের কপি বিএসএমএমইউ কতৃ©পক্ষের হাতে এসেছে। এরপর গতকাল দুপুরে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্যসহ সংশ্লিষ্টরা বৈঠক করে একটি মেডিকেল রিপোর্ট তৈরি করেছেন। ওই রিপোর্ট আজ বুধবার আদালতে পৌঁছানো হবে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, খালেদা জিয়ার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। নতুন করে যারা যুক্ত হয়েছেন তারা হলেন রেসপিরেটরি ডা. শামীম ও ডায়াবেটিকসের প্রফেসর ফরিদউদ্দিন আহমদ। এর আগে বোর্ডের সদস্য সংখ্যা ছিল পাঁচ।
খালেদা জিয়ার জন্য বিএসএমএমইউ গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক ডা. জিলন মিয়া সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা উন্নতির দিকে। গতকাল দুপুরের পর তারা তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। তখন তার ব্লাড প্রেসার ছিল ১৩০/৮০। তার ব্লাড সুগার ছিল ১২। তবে আর্থ্রাইটিসের ব্যথা রয়েছে।
তিনি বলেন, এর মধ্যে খালেদা জিয়ার ব্লাড সুগার ৭-এ নেমে এসেছিল। মাঝে ইনসুলিন কমিয়ে দেওয়ায় ব্লাড সুগার একটু বেড়েছে। আবার ইনসুলিনের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে সুগার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
‘কারও সাহায্য ছাড়া খালেদা জিয়া বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। হাঁটতে পারেন না’– পরিবারের সদস্যদের এমন অভিযোগের বিষয়ে জিলন মিয়া বলেন, ‘গত ১ এপ্রিল হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে যতদিন আমরা তাকে দেখতে গিয়েছি ততদিনই তাকে চেয়ারে বসে থাকতে দেখেছি। এ অবস্থায়ই আমরা তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি। গতকাল মঙ্গলবারও করেছি। হাঁটাচলা করতে পারলে তিনি একটু ভালো থাকতে পারতেন। চেষ্টা করলে পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা ফাতেমার সহযোগিতায় ধীরে ধীরে হাঁটতে পারেন। কিন্তু তিনি হাঁটেন না।’
গত ২৮ অক্টোবর বিএসএমএমইউ কতৃ©পক্ষ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে মাহবুবুল হক বলেন, হাসপাতালে ভর্তির পর গত সাত মাসে তার স্বাস্থ্যের কোনো অবনতি হয়নি। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ‘তার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্যদের খালেদা জিয়া সহযোগিতা করছেন না। বিশেষ করে তার আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসার জন্য ভ্যাকসিন দেওয়াসহ কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার ড়্গেত্রে রোগীর অনুমতি মিলছে না। সে কারণে চিকিৎসকরা এগোতে পারছেন না। ভ্যাকসিন নিলে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতেন।’
ভ্যাকসিন গ্রহণের জন্য খালেদা জিয়া রাজি হয়েছেন কি না জানতে চাইলে জিলন মিয়া সরকার গতকাল বলেন, ভ্যাকসিন নিতে তিনি রাজি হয়েছেন। শিগগিরই ভ্যাকসিন দেওয়া হবে।
গত ২৮ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় দণ্ডিত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে তার সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা জানতে মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদন চায় আদালত। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে ছয় বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত আপিল বেঞ্চ খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের ওপর শুনানি করে। পরে রাষ্ট্রপক্ষকে ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে ওই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে ওইদিন বিষয়টি পরবর্তী আদেশের জন্য রেখেছে সর্বোচ্চ আদালত।
গত ১ এপ্রিল খালেদা জিয়াকে পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বিএসএমএমইউতে ভর্তি করা হয়। তখন থেকে তিনি হাসপাতালের কেবিন ব্লকের ষষ্ঠ তলার ৬২১ নম্বর কেবিনে চিকিৎসাধীন।
