সব কুছ নরমাল হ্যায়! তাহলে সামরিক সরকার কেন? এ প্রশ্নের জবাব তৈরি করতে পূর্ব পাকিস্তানে লোক দেখানো হলেও একটি বেসামরিক সরকার বসানো অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। সাবেক মন্ত্রী পাকিস্তান মুসলিম লিগের ডাক্তার এ এম মালেক সম্মত হতে সময় নিলেন না, ৩১ আগস্ট ১৯৭১ তাকে গভর্নর করা হলো, তার নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিপরিষদ ৩ সেপ্টেম্বর শপথ নিল। তার সঙ্গী মন্ত্রীরা হলেন– আবুল কাশেম, এ এস এম সোলায়মান, নওয়াজেশ আহমদ, এ আহমদ, এম ইউসুফ, মো. ইসহাক, মুজিবুর রহমান, জসিমুদ্দিন আহমেদ, মো. ওবায়দুল্লাহ মজুমদার, এ কে মোশাররফ হোসেন, আব্বাস আলী খান।
শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে কর্মরত সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন– আবদুল মোনেম খান, সৈয়দ আজিজুল হক, ফজলুল কাদের চৌধুরী, খান এ সবুর, ইউসুফ আলী চৌধুরী, সুলতানউদ্দিন আহমদ, আবদুল জব্বার খান, গোলাম আযম এবং পীর মোহসেন উদ্দিন।
গভর্নরের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীই কার্যত এই বেসামরিক পুতুল সরকার পরিচালনা করতে থাকেন। এর আগে পরিস্থিতি সামাল দিতে চিফ সেক্রেটারিসহ বেশ কজন জ্যেষ্ঠ বেসামরিক আমলাকে পশ্চিম থেকে পূর্ব পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। যোগ দেন পশ্চিম পাকিস্তানি ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ এবং অন্তত দুজন বিভাগীয় কমিশনার।
পরে পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি জাস্টিস হামুদুর রহমানকে প্রধান করে গঠিত তিন সদস্যের কমিশনের কাছে
ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ এম এ কে চৌধুরী কমিশনের কাছে দেওয়া সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন, একাত্তরের মার্চ-এপ্রিলের সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানের দায়িত্বে ছিলেন একজন মিলিটারি গভর্নর আর বেসামরিক প্রশাসন সংক্রান্ত গভর্নরের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন একজন মেজর জেনারেল। আবার সব স্তরেই ছিল সমান্তরাল সামরিক আইন প্রশাসন। প্রাদেশিক সদর দপ্তরে পুলিশের আইজির সঙ্গে বৈঠক করার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে নিয়োজিত একজন পশ্চিম পাকিস্তানি ডিআইজিকেও স্থানীয় সামরিক আইন কতৃ©পক্ষ আসার অনুমতি দেয়নি।’
ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার সৈয়দ আলমদার রাজা বললেন, সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে ও তত্ত্বাবধানে অন্তত রুটিন কাজগুলো করাতে বেসামরিক কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তেমন কোনো বস্তুগত ফল পাওয়া যায়নি। যেসব বাঙালি অফিসারকে কাজে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, তাদের আস্থার অভাব ছিল এবং তাদের আনুগত্য নিয়ে যে সন্দেহ করা হচ্ছে না, এ ব্যাপারে তারা নিশ্চিত ছিলেন না। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছিল, এমনকি পূর্ব পাকিস্তান সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে কাউকে কিছু না জানিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছিল।
বেসামরিক গভর্নর ও মন্ত্রিপরিষদ গঠনের পরও প্রশাসনে সেনা সম্পৃক্ততার সমাপ্তি ঘটেনি।
আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠের দল– এই দাবিটি নাকচ করাকে অন্যতম লক্ষ¨ হিসেবে সামনে রেখে ৭৮টি জাতীয় পরিষদ সদস্য আসন ও ১০৫টি প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য আসন শূন্য ঘোষণা করা হয় এবং নির্বাচনের তফসিলও ঘোষণা করা হয়। অনুপস্থিত সবার বিরুদ্ধে পাকিস্তান দণ্ডবিধির ১২৪ (ক) রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ দায়ের করা হয়। অনেকের বিরুদ্ধে অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, খুন ইত্যাদির সুনির্দিষ্ট অভিযোগও করা হয়। ১২ ডিসেম্বর থেকে ২১ ডিসেম্বরের মধ্যে এই নির্বাচন সম্পন্ন করার কথা। সে সুযোগ পাকিস্তান সরকার ও নির্বাচন কমিশন পায়নি। তবে তার আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বহুসংখ্যক প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশের প্রতি ন্যূনতম আনুগত্য রয়েছে এমন কারোর এই উপনির্বাচনে অংশগ্রহণ করার কথা নয়। তবুও এই উপনির্বাচনের যথার্থতা/বৈধতা নিয়ে এমনকি জুলফিকার আলী ভুট্টোও পর্যন্ত প্রশ্ন করেছেন। জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের অনেক সদস্য পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে যোগসাজশ করেই হোক কি নিষ্ক্রিয়তার কারণেই হোক অভিযুক্ত হননি। তাদের কেউ কেউ বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান করেছেন। নারী সদস্যদের মধ্যে একমাত্র নূরজাহান মুর্শেদকে অভিযুক্ত করা হয়।
পশ্চিম পাকিস্তানের ভুট্টোবিরোধী নেতাদের উদ্ধ…ত করে পাকিস্তানের দৈনিক ডন লিখেছে, মূলত যার ষড়যন্ত্র প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও কারারুদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে ভাঙন ধরিয়েছে সেই ভুট্টোকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মেনে না নেওয়ারই কথা। একই সঙ্গে জেনারেল ইয়াহিয়া খানও সংবিধান প্রণয়নের প্রশ্নে নিজের দেওয়া একটি ডেডলাইনের মুখোমুখি। পশ্চিম পাকিস্তান এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভেতরের ইচ্ছা সমঝোতা নয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের অনুভূতিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে পার পেয়ে যাবেন- কূটনীতিকের দায়িত্ব থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাহিনীর দায়িত্ব তারা যেভাবে ছেড়ে দিয়ে বিক্ষোভ দেখাতে পেরেছেন তা কি এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ রয়েছে?
কেন্দ্রীয় প্রশাসনের চেহারায় সিভিলিয়ান প্রলেপ লাগাতে ৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাঙালি নূরুল আমীনকে প্রধানমন্ত্রী এবং সিন্ধুর জুলফিকার আলী ভুট্টোকে উপপ্রধানমন্ত্রী করা হয়। পরদিন ৮ ডিসেম্বর পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট তার ডায়েরিতে লিখেন :
নূরুল আমীনকে প্রধানমন্ত্রী এবং ভুট্টোকে উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ করা হয়েছে। আমি আশা করব, এ নিয়োগে প্রমাণিত হবে না যে পাকিস্তানের অন্ধকারতম দিন এসে গেছে, কারণ এই লোকটি– ভুট্টো অবর্ণনীয় সমস্যা সৃষ্টি করতে সক্ষম। ভুট্টো যতদিন বেঁচে আছে এবং পাকিস্তানে অবস্থান করছে– শািন্ত আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। নূরুল আমীন, এমনকি ইয়াহিয়ারও তাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা নেই। পাকিস্তানকে প্রতিনিধিত্ব করতে ভুট্টোকে জাতিসংঘে পাঠানো হয়েছে। ভুট্টো প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, কিন্তু সে তা করবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।
ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, রাত এবং এমনকি দিনেও বিমান আক্রমণের কারণে প্রচণ্ড উত্তেজনায় কাটছে, কিন্তু গত রাত বেশ শািন্তপূর্ণ ছিল। একটি-দুটি করে উড়োজাহাজ আসছে এবং লক্ষ্যহীনভাবে বোমাবর্ষণ করে যাচ্ছে, সাধারণ মানুষ নিহত হচ্ছে, আহত হচ্ছে।
পূর্ব পাকিস্তান থেকে পাওয়া সংবাদ মোটেও ভালো নয়। বিভিন্ন জায়গায় আমাদের বাহিনীকে পশ্চাদপসরণ করতে হয়েছে, তবে আমাদের সৈন্যরা সাহসের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে।
বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জাতিসংঘ পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং অপর দেশ থেকে নিজ নিজ সৈন্য প্রত্যাহারের প্রস্তাব পাস করেছে। এর পরে কী হয় দেখা যাক।
তিনি নিজেই এরপর লিখেছেন, সম্ভবত তেমন কিছুই হবে না।
কিন্তু লড়াই যে এক সপ্তাহের মধ্যেই চ‚ড়ান্ত ফয়সালার দিকে যাচ্ছে, তিনিও বুঝতে পারেননি। গভর্নর মালেক বুঝেছেন প্রেসিডেন্ট হাউজে বোমা বর্ষিত হওয়ার পর।
