খালেদার জামিন আবেদন সর্বোচ্চ আদালতেও নাকচ

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ০২:৩০ এএম

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় সর্বোচ্চ আদালতেও জামিন পাননি কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। মামলায় সাত বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত খালেদা জিয়ার জামিনের আবেদন খারিজ করে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে আপিল ও জামিনের আবেদন খারিজ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত ছয় বিচারপতির আপিল বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্তের কথা জানায়। তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়া উন্নত চিকিৎসা (অ্যাডভান্স ট্রিটমেন্ট) চাইলে ওই হাসপাতালের মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত তা দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে বলেছে আদালত। গত ৩১ জুলাই এ মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন খারিজের আদেশ দেয় হাইকোর্ট। ওই আদেশ বাতিল চেয়ে গত ১৪ নভেম্বর আপিল বিভাগে আবেদন করেন বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবীরা। এছাড়া খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে গণমাধ্যমে যেসব প্রতিবেদন এসেছে সেসব যুক্ত করে ২৪ নভেম্বর একটি সম্পূরক আবেদন করা হয়।

গত ২৮ নভেম্বর জামিন শুনানির দিন খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রতিবেদন দেখতে চায় সর্বোচ্চ আদালত। গত ৫ ডিসেম্বরের প্রতিবেদন না আসায় রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেড়্গিতে শুনানি পেছালে আপিল বিভাগের এজলাসে ব্যাপক হট্টগোল হয়। গতকাল শুনানিকে সামনে রেখে সুপ্রিম কোর্টে নেওয়া হয় বাড়তি নিরাপত্তা। এছাড়া মঙ্গলবার রাতেই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এক নম্বর এজলাস কক্ষে (প্রধান বিচারপতির এজলাস) প্রথমবারের মতো স্থাপন করা হয় ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা।

গতকাল খালেদা জিয়ার পক্ষে আদালতে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ও জয়নুল আবেদীন। তাদের সঙ্গে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জমিরউদ্দিন সরকার, মওদুদ আহমদ, এ জে মোহাম্মদ আলী, নিতাই রায় চৌধুরী, এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রমুখ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষে ছিলেন আইনজীবী খুরশিদ আলম খান। এছাড়া উভয়পক্ষের বিপুলসংখ্যক আইনজীবী এজলাসে উপস্থিত ছিলেন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ১০ বছর ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় ৭ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত খালেদা জিয়া কারা কতৃ©পক্ষের অধীনে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় জামিন খারিজ হওয়ায় এবং অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় আপিল বিভাগে করা আপিল ও জামিনের আবেদন বিচারাধীন থাকায় আপাতত তিনি কারামুক্তি পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।

শুনানিতে যা হলো : সকালে শুনানির শুরুতে আপিল বিভাগে তালিকাভুক্ত না হওয়া আইনজীবীদের এজলাসে প্রবেশে বাধা দেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এ নিয়ে সেখানে হট্টগোল হয়। বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। এরপর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের মতামতের ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন উভয়পক্ষের ৩০ জন করে মোট ৬০ জন আইনজীবীকে এজলাসের ভেতরে থাকার নির্দেশনা দেন। যদিও এ আদেশের পর সকাল ১০টার কিছু পরও বিপুলসংখ্যক আইনজীবীকে এজলাসে দেখা যায়। এ নিয়ে প্রধান বিচারপতি উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা ৩০ জন করে আইনজীবী থাকার কথা বলেছিলাম। কিন্তু আপনারা কেউ কথা রাখেননি।’ এরই মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. আলী আকবর এসে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা প্রতিবেদন আদালতের কাছে হস্তান্তর করেন। শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বক্তব্য দেন।

শুনানিতে জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘খালেদা জিয়া ভালো নেই। তার সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে না। এ প্রতিবেদনে যা এসেছে তা সঠিক নয়। এ প্রতিবেদন ভুয়া। তাছাড়া যে প্রতিবেদন এসেছে সেখানে কিন্তু বলা হয়নি যে তিনি চলাফেরা করতে পারছেন। কিংবা আগের চেয়ে ভালো আছেন।’ তিনি বলেন, ‘বলা হচ্ছে তিনি (খালেদা জিয়া) উন্নত চিকিৎসা পাচ্ছেন। কিন্তু এমনই উন্নত চিকিৎসা তিনি পাচ্ছেন যে এখন পঙ্গুত্বের দিকে যাচ্ছেন। ছয় মাস পর দেখা যাবে তিনি মৃত্যুর মুখে চলে গেছেন।’ জয়নুল আবেদীন আরও বলেন, ‘আপিল বিভাগের ইতিহাসে ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামির জামিন দেওয়ার নজির রয়েছে। পাকিস্তানকে আমরা বর্বর রাষ্ট্র বলি। কিন্তু সেখানেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে চিকিৎসার জন্য জামিন দিয়ে তাকে লন্ডন পাঠানো হয়েছে। আমরা শুধু খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য নয়, মানবিক বিবেচনায় তার জামিন চাইছি।’

বিরতির পর বেলা সাড়ে ১১টার কিছু পর শুনানিতে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘আমাদের দেশে রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো, রাজনীতি আর জেল পাশাপাশি চলে। এখানে রাজনীতি করলে জেলে যেতে হয়। কখনো কখনো যত সময় রাজনীতি করি তার চেয়ে বেশি সময় জেলে থাকতে হয়। আর কেউ যদি জেলে যায় তার চেয়ে খারাপ লোক আর কেউ নেই। তার বিরুদ্ধে অভিযোগেরও শেষ নেই। আর ক্ষমতায় থাকলে তার চেয়ে ভালো কেউ নেই। খালেদা জিয়া অসুস্থ, বয়স্ক একজন মহিলা। আমরা মানবিক বিবেচনায় তার জামিনের আবেদন করছি। আপনারা জামিন দেন।’

মেডিকেল প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার অবস্থা স্থিতিশীল। তিনি যেসব রোগে ভুগছেন তা দীর্ঘমেয়াদি। তিনি ২০ বছর ধরে ডায়াবেটিসে ভুগছেন। ১০ বছর ধরে উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। আর আথ্র©াইটিসে ভুগছেন ৩০ বছর ধরে। প্রতিবেদন বলছে, তার ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আর যেসব রোগের কথা বলা হচ্ছে সেগুলোর চিকিৎসা বাংলাদেশেই সম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘দুই মামলায় তিনি (খালেদা জিয়া) ১৭ বছরের সাজা ভোগ করছেন। এটিকে সংড়্গিপ্ত সাজা বলা যায় না। দুটি মামলাতেই তার করা আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জামিন হতে পারে না।’ অ্যাটর্নি জেনারেল অনুযোগের সুরে বলেন, ‘চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়ার সম্মতি পাওয়া যাচ্ছে না। এর ফলে চিকিৎসকরা তাকে যথাযথ চিকিৎসা দিতে পারছেন না।’

সবশেষ দুদক আইনজীবীর শুনানি শেষে কিছুক্ষণের জন্য খাসকামরায় যান প্রধান বিচারপতিসহ ছয় বিচারপতি। কয়েক মিনিট পর তারা এজলাসে এসে জামিনের আবেদন খারিজের আদেশ দেন।

‘জামিন না হওয়া নজিরবিহীন কলঙ্কজনক অধ্যায়’ : খালেদা জিয়ার জামিন না পাওয়া সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে নজিরবিহীন কলঙ্কজনক অধ্যায় বলে মন্তব্য করেছেন তার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। আপিল বিভাগের আদেশ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, দুই মামলায় (জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা) তিনি সাত বছর সাজা পেয়েছেন। ইতিমধ্যে তিনি দেড় বছর সাজা খেটেছেন। তিনি অসুস্থ ও বয়স্ক। এ অবস্থায়ও তার জামিন না পাওয়া সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায়। শুধু বাংলাদেশ নয়, পার্শ্ববর্তী দেশেও এ ধরনের মামলায় জামিন নাকচ করার নজির নেই। খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘আমরা মানবিক বিবেচনায় জামিনের আবেদন করেছিলাম। আদালত আমাদের আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। আর খালেদা জিয়ার অ্যাডভান্স (উন্নত) চিকিৎসার বিষয়ে আদালত আদেশে যেটি বলেছেন সেটি খুব মামুলি বিষয়।’ তিনি বলেন, ‘বিএসএমএমইউতে যদি উন্নত চিকিৎসা হতো তাহলে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া লাগত না।’

‘বিচারপতিরা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন’ : আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতি যথেষ্ট বিবেচনা করেই খালেদা জিয়ার জামিনের আবেদন খারিজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘যতটুকু জেনেছি আপিল বিভাগ মেডিকেল প্রতিবেদন পেয়েছেন এবং তারা তাদের বিবেচনায় দেখেছেন যে এখানেই (বিএসএমএমইউ) তার চিকিৎসা করা যায়। তাই জামিনের আদেশ তারা নাকচ করে দিয়েছেন। আপিল বিভাগের সম্মানিত ছয় বিচারপতি এ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তারা যথেষ্ট বিবেচনা করেই এ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। আমরা যেহেতু আইনের শাসনে বিশ্বাস করি, তাই তারা যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন সেটি আমাদের সবাইকে মানতেই হবে।’

‘খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়নি’ : অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জানিয়েছেন, খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসা হবে, তবে তার অনুমতি সাপেক্ষে। খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন খারিজ হওয়ার পর দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এর আগের মেডিকেল রিপোর্ট ও এখনকার মেডিকেল রিপোর্টে দেখা গেছে তার শারীরিক অবস্থার বিশেষ কোনো অবনতি হয়নি। আগে যেরকম ছিল, এখনো সেরকম আছে। কতগুলো বিশেষ ইনজেকশন তাকে দিতে হয়। কিন্তু সেই ইনজেকশনের অনুমতি পাওয়া না গেলে তা দেওয়া যাবে না। উনি অনুমতি দিচ্ছেন না। আদালত বলেছেন, যদি অনুমতি দেন তাহলে বিএসএমএমইউ কতৃপক্ষ সে ব্যবস্থা নেবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত