সম্প্রতি আইনে পরিণত হওয়া বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (সিএবি) নিয়ে সরগরম ভারতের রাজনীতি। বিলটি রাজ্যসভায় পাস ও প্রেসিডেন্টের অনুমোদনে আইনে পরিণত হওয়ায় বিক্ষোভে ফুঁসছে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো। আসামের বিলবিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে ইতিমধ্যেই গণআন্দোলনের ডাক দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। আর মমতার সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন কেরালা, পাঞ্জাব, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ের নেতারা।
কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে গতকাল দিল্লির রামলীলা ময়দানে নতুন করে ‘মেগা ভারত বাঁচাও র্যালি’ অনুষ্ঠিত হয়। র্যালিতে সোনিয়া গান্ধী নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল ছাড়াও ভারতের অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা ও সরকারের সমালোচনা করেন। ভারতসহ সারা বিশ্বে এই বিলবিরোধী আন্দোলনের সূচনা করার আহ্বান জানিয়েছে কংগ্রেস। এনডিটিভির বিশ্লেষকদের মতে
বিলবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব নিতে চাইছে কংগ্রেস।
গতকালও আসামের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ-অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সহিংসতা হয়েছে। এর বাইরে রাজধানী দিল্লির মধ্যাঞ্চলে গত শুক্রবার রাত থেকে জড়ো হতে শুরু করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। গতকাল শনিবারও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ, রেল-সড়ক অবরোধ চলছে বলে জানিয়েছে আনন্দবাজার। বেশিরভাগ এলাকায় ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে আছে। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সরকারি বাস ভাংচুর ও পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কয়েকটি স্টেশনে আগুনও ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রতিবাদকারীদের দমাতে কোনো কোনো এলাকায় পুলিশকে লাঠিচার্জ করতে হয়েছে। ক্রমেই বিলবিরোধী আন্দোলন গোটা ভারতে ছড়িয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন দেশটির সাংবাদিকরা।
কেরালার ক্ষমতাসীন লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এলডিএফ) ও দলটির অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউডিএফ) মধ্যে বিলবিরোধী অবস্থানে সমঝোতা হয়েছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ান ও বিরোধী নেতা রমেশ চেন্নিথালা ১৬ ডিসেম্বরে থিরুভানানথাপুরমে সত্যাগ্রহের ডাক দিয়েছেন। উভয় জোটই ‘নাগরিকত্ব আইনকে’ সংবিধানের পরিপন্থী ঘোষণা দিয়ে এই আন্দোলনের ডাক দিয়েছে বলে জানান পিনারাই।
দেশটির কমিউনিস্ট পার্টিগুলোও ক্রমশ একাট্টা হচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে। কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সিস্ট) ও দ্য কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া সব বিভেদ ভুলে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তুলতে তৎপর হয়েছে। সিপিআই(এম)-এর কেরালা ইউনিট এক বিবৃতিতে জানায়, ‘সমাজের সব অংশের এখন উচিত একত্রিত হয়ে এই বিলের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা। এটা নিশ্চিতভাবেই সংবিধানের ১৪ নম্বর ধারার পরিপন্থী।’
বসে নেই দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল। বিজেপির অন্যমত মিত্র জনতা দল ইউনাইটেডের ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রশান্ত কিশোরের সঙ্গে যৌথভাবে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন কেজরিওয়াল। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারও কিশোরের সঙ্গে আছেন বলেও নিশ্চিত করেছে এনডিটিভি। মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কমল নাথ ও ছত্তিশগড়ের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেলও যোগ দিয়েছেন আন্দোলন। কোনো মতেই ‘নাগরিকত্ব আইনকে’ বাস্তবায়িত হতে দেবেন না, এমন প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন ওই মুখ্যমন্ত্রীরা।
আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মমতা ব্যানার্জি। আজ রবিবার পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি জেলায় বিলবিরোধী বিক্ষোভ সমাবেশ করবে তৃণমূল কংগ্রেস ও আন্দোলনে শরিক হওয়া অন্য দলগুলো। এরপর আগামীকাল সোমবার কলকাতায় আন্দোলনের শরিক দলগুলোকে নিয়ে অম্বেদকরের মূর্তির সামনে বিক্ষোভ মিছিল করে পরবর্তী কর্মসূচির ডাক দেবেন মমতা। বিভিন্ন রাজ্য থেকে মমতার সঙ্গে আন্দোলন প্রশ্নে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এদিকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিক্ষোভের কারণে রাজ্যগুলোতে বেড়াতে যাওয়ার ক্ষেত্রে পর্যটকদের ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডা। যুক্তরাজ্যের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে ভারতের বেশ কিছু রাজ্যে বিক্ষোভ হচ্ছে। খবরে জানা গেছে, ভারতের উত্তর-পূর্ব, বিশেষ করে আসাম ও ত্রিপুরাতে বিক্ষোভ বড় আকার নিয়েছে। গুয়াহাটিতে কারফিউ জারি করা হয়েছে ও আসামের ১০ জেলায় মোবাইল পরিষেবা বন্ধ। তাই এই এলাকায় বেড়াতে গেলে সমস্যায় পড়তে পারেন পর্যটকরা।’
