আমরা এমন একজন মানুষকে হারালাম যিনি মুক্তিযুদ্ধের যে আদর্শ ও বিশ্বাসের কথা আমরা বারবার বলি সেটাকে বাস্তবে রূপান্তর করতে চেয়েছিলেন। এটা খুব বড় একটা জিনিস।
বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে যে মানুষ জিতেছে কারণ গ্রামের মানুষের সঙ্গে অন্যদের একটা সমঝোতা ছিল বলে। বাংলাদেশের গ্রামের মানুষের সঙ্গে মধ্যবিত্ত কিংবা ওপর তলার একটা যোগ ছিল বলে।
আবেদ ভাই তার কর্মক্ষেত্রে এসে এই একই মডেলে গ্রামের মানুষের সঙ্গে জোট বেঁধেছিলেন। সে কারণে তিনি সফল হয়েছিলেন এবং সে কারণে তার জীবনটা এত সফল। আমি তো অনেক দিন ধরে ওনাকে চিনি, আমার কাছে মনে হয়েছে যে আস্থাটা ছিল গ্রামের মানুষের ব্যাপারে তার, খুব কম মানুষের সেটা ছিল। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদেরই এ আস্থা নেই।
কিন্তু তিনি এটা বুঝেছিলেন। তিনি এটা জানতেন বলেই বোধ হয় এ কাজটা করতে চেয়েছিলেন। এবং একজন অবস্থাসম্পন্ন ওপর তলার মানুষ বিলেত ছেড়ে চলে আসলেন। উনি দেশে আসলেন, চাকরি ছেড়ে দিলেন।
মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। শুধু যোদ্ধা না, তিনি করাচি পোর্ট উড়িয়ে দেওয়ার জন্য যখন টাকা সংগ্রহ করে ভারতের আগরতলায় তাজউদ্দীন আহমদের কাছ থেকে অনুমতি নিতে যান, তখন তাজউদ্দীন আহমেদ তাকে বললেন, কত টাকা সংগ্রহ করেছেন, আমি তো মুজিবনগর সরকারের কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছি না। এতটা ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে।
সেই মানুষটা বিদেশ থেকে দেশে ফেরত আসলেন। তার বড় চাকরি ছিল। তিনি শেল ওয়েলের প্রধান ছিলেন। কিন্তু সেই চাকরি করেননি।
তিনি আমাকে একবার বলছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময়, আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি, অনেকগুলো মানুষ দেশে ফিরছে। তারা হিন্দু শরণার্থী। তারা চলে গিয়েছিল। তারা এক সময় সম্পন্ন গেরস্ত ছিল, এখন কিচ্ছু নেই, একেবারে সর্বহারা হয়ে গেছে।
তিনি বলতেন, তাহলে এদের জীবনের আর কী মূল্য আছে।
এরপর তিনি দেশে ছুটে এসে ব্র্যাক গড়ে তোলেন। ব্র্যাক যে তিনি সারা জীবন করবেন তা কিন্তু ভাবেননি। ব্র্যাকই তাকে দখল করে ফেলল।
তার জীবন অসম্ভব সফল জীবন। আমার খারাপ লাগছে তার চলে যাওয়াতে। কিন্তু এত সম্পূর্ণভাবে নিজের জীবনের কল্পনা, মানুষের জীবনের যে দায়িত্ববোধ সমস্ত কিছু তিনি পালন করে যেতে পেরেছেন।
শেষ দিকে এসেও, তিনি হয়তো জানতেন যে তিনি মারা যাচ্ছেন। সম্ভবত তিনি খুব অসুস্থ, চিকিৎসকরা তাকে এটা বলে দিয়েছিল। তিনি তখন পরিবর্তনটা করে যেতে পেরেছিলেন যে কে ব্র্যাক চালাবে।
সে দিক থেকে আমি মনে করি অসম্ভব একটা সফল জীবন। বাংলাদেশে কয়টা মানুষের এ রকম সফল জীবন আছে? নিজেকে রাজনীতি থেকে মুক্ত রেখে আবেদ ভাই কাজ করে গেছেন। এটা খুব বিরাট একটা অর্জন। অন্যরা সবাই পারে না। সবাই ক্ষমতা চায়, অন্যান্য কিছু হতে চায়। নিজের কাজের, প্রতিষ্ঠানের বাইরে গিয়ে বড় কিছু হতে চায়। আবেদ ভাই কোনো দিনই এটা চাননি।
আমার সঙ্গে একবার কথা হয়েছিল। লোকজন তাকে খুব চাপ দিচ্ছিল একটা আন্দোলনে যুক্ত হতে। আমি জানতে চাইলাম, আপনি কোনটা চান। তিনি বললেন, না ভাই, আমি চাই গরিবের জন্য কাজ করতে।
এত বড় মানুষ বাংলাদেশে কয়জন এসেছে? খুব কম। তিনি কাজেই বিশ্বাস করতেন এবং কাজই করে গেছেন।
আফসান চৌধুরী: মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও কলামনিস্ট।
