নাগরিকত্ব আইনের জুয়া ও সংখ্যার রাজনীতি

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:৩৫ এএম

ভারতে ভোটের রাজনীতিতে সংখ্যার হিসাবে নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো পশ্চিমবঙ্গ, এরপর খানিকটা আসাম। খুব সতর্কভাবেই সংখ্যার হিসাব-নিকাশ সেরে এ চালটি চালা হয়েছে। ভারতে সাম্প্রতিককালে সবচেয়ে বেশি আশ্রয় নেওয়া বিদেশিরা হলেন তামিল হিন্দু জনগোষ্ঠী, শ্রীলঙ্কার এলটিটিইবিরোধী নিধনযজ্ঞ এড়াতে তারা দলে দলে তামিলনাড়ুতে আশ্রয় নিয়েছেন, নানান আশ্রয় শিবির এবং বাইরে বসবাস করছেন (দেখুন ঃ t.ly/xNdk5), অনেকগুলো সূত্র বলছে, গত ৩০ বছরেই ন্যূনতম দেড় লাখ শরণার্থী ভারতে এসেছেন, সংখ্যাটি হয়তো আরও বেশি হতে পারে। ১৯৪৭ সালে শ্রীলঙ্কায় তামিল জনগোষ্ঠীর সংখ্যাটি ছিল প্রায় ১১ ভাগ, এখন ৫ ভাগেরও নিচে নেমে এসেছে। পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশে অর্পিত সম্পত্তি আইনের মতো কিছু বন্দোবস্তে হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন চললেও শ্রীলঙ্কাতে রীতিমতো নাগরিকত্ব আইন তৈরি করে বহু তামিলকে রাষ্ট্রহীন করার ইতিহাসও আছে। কিন্তু ভারতের সাম্প্রতিক নাগরিকত্ব সংশোধন আইনে শ্রীলঙ্কার এই হিন্দু উদ্বাস্তুদের কথা নেই, আছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের কথা।

কারণটা খুব পরিষ্কার– পাকিস্তানের উপস্থিতিকে বিজেপি দেখায় তার উগ্রজাতীয়তাবাদী নীতির বৈধতা নিরূপণে। বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতের সেসব প্রদেশগুলো যেখানে কোনো কোনোটিতে বিজেপি ইতিমধ্যে আঞ্চলিক শরিকদের সহযোগিতায় ঘাঁটি গেড়েছে, আর পশ্চিমবঙ্গ হলো সেই রাজ্য যেটিকে কোনো শরিকদের সঙ্গে ভাগবাটোয়ারা ছাড়াই বিজেপি দখল করতে পারবে বলে ভেবেছে। তাহলে আফগানিস্তানের নামটা কেন? কারণ আফগানিস্তানে মুজাহিদ ও তালেবানদের কয়েক দশকের গৃহযুদ্ধ পর্বটিতে দেশটির সংখ্যায় অতি অল্প কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রায় পুরোটাই দেশত্যাগী হয়েছেন। ভারতের রাজনীতিতে তাদের তেমন কোনো ভূমিকার উল্লেখ না থাকলেও ‘সংখ্যালঘু নিপীড়ক হিসেবে মুসলমানদের সামগ্রিক ভাবর্মূতিতে’ আফগানিস্তানও নামে নামেই অন্তভু©ক্ত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে, বিজেপি ভোটের রাজনীতিতে তার মুসলিমবিরোধী ভাবমূর্তিকে গুরুত্ব দেয়, এই দেশগুলোর নামোল্লেখ তার সেই পালে হাওয়া দেয় মাত্র। সামগ্রিকভাবে পুরো ভারতে এ ভাবমানস আরও শক্তিশালীভাবে গড়ে তোলার পাশাপাশি নাগরিকত্ব সংশোধন আইনটি ভোটের হিসাব-নিকাশে এককালের পূর্ববাংলা থেকে পশ্চিমবঙ্গে ও আসামে বসতি গড়া জনগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করার জন্যই পরিকল্পিত, এটা অনেকেই লিখেছেন।

যেমন নাগরিকত্ব সংশোধন আইন নিয়ে পল্লব ভট্টাচার্য যা লিখেছেন (দেখুনt.ly/lxqV7)), তার সারসংক্ষেপ করলে এটাই দাঁড়ায় যে, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যসভার ২৯৪টি আসনের মাঝে ৮০টিতেই অভিবাসী হিন্দু জনগোষ্ঠী প্রধান নির্ধারক শক্তি, আরও ৪০-৫০টি আসনে তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। অন্যদিকে আসামের এনআরসিতে বাদ পড়া ১২ লাখ হিন্দু জনগোষ্ঠীকেও আশ্বস্ত করবে এই বিল। তৃণমূলও এটা টের পেয়ে ২০২১ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থীদের জন্য তাদের আবাসগুলোর মালিকানা প্রদান করার ঘোষণা দিয়েছে।

২. এগুলো তো সংখ্যার হিসাব। কিন্তু সংখ্যার বাইরেও রাজনীতির বিশাল জগৎ আছে। ভারত কোনো একক জাতি না, এটা একটা বহুজাতির দেশ। একে একক জাতির রূপ দেওয়ার চেষ্টাটা কত ভয়াবহ আত্মঘাতী হবে, সেটা নাগরিকত্ব বিলে আরেকবার দেখা গেল।

বিজেপি প্রায় একক হিন্দু ভারতীয় চেতনা গড়ে তুলতে আগ্রহী। কিন্তু হিন্দু ধর্ম নিজেও তর্কাতীতভাবেই বহু ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহ্যের একটা অসমন্বিত ধারণা। ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে বরং অনেক বেশি শক্তিশালী চেতনা হলো জাতিগত স্বাতন্ত্র্যবোধের শক্তি। আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্যবাদীরা বহুক্ষেত্রেই বিজেপিকে ভোট দিয়েছিল নানান আঞ্চলিক হিসাব-নিকাশেরই সূত্রে। যেমন আসামে বিজেপি চায় মুসলমানবিরোধী মনোভাবকে ব্যবহার করতে। আসামবাসীদের কাছে কিন্তু বিষয়টা প্রধানত বাঙালি যেকোনো বহিরাগত বিরোধী একটা প্রশ্ন, সে হিন্দু কিংবা মুসলমান যাই হোক। ত্রিপুরা কিংবা নাগাল্যান্ড বা মণিপুর সর্বত্র বিপুল ভূমি হারানো মানুষরা বহিরাগত বিরোধী একটা মনোভাব পুষছেন। আসামে বাঙাল খেদা আন্দোলন যেমন সত্য, তেমনি বিহারি বহু শ্রমিককেও সেখানে খুন হতে হয়েছে বহিরাগত বিরোধী হত্যাকাণ্ডে।

বিজেপি আর অসমীয়া আঞ্চলিকতাবাদের উভয়ের দেখানো শত্রুর জায়গাতে মুসলমান আছে, কিন্তু বিজেপি শুধু মুসলমানে সীমিত থাকতে চায়, অহমীয়া জাতীয়তাবোধ তা চায় না। ফলে আপাত মিত্রে ঘোর সংঘাত লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কারণ এ অঞ্চলগুলো ধরে নিয়েছে সেখানে যে বিপুল বহিরাগত আছে বলে তারা বলছেন, তাদের সঙ্গে আরও নতুন বহিরাগতদের নিয়ে আসবে এ নাগরিকত্ব বিল।

বাংলাদেশে কেউ কেউ যেটা খেয়ালও করেছেন এবং আশঙ্কার সঙ্গে বলছেন আসামের আন্দোলনটা তো বাঙালিবিরোধী! এটার মাঝে সত্যতা আছে। কিন্তু আমার মনে হয় এ বিষয়ে কোনো একটা মীমাংসায় যেতে হলে অন্যপক্ষের দাবির সত্যতাও স্থিরমনে খানিকটা বিচার করার চেষ্টা করা উচিত। এটা সত্যি যে, আঠারো, উনিশ ও বিশ শতকে ‘বাঙালি’ বলতে যা আমরা বুঝি, তার একটা ব্যাপক বিস্তার বিকাশ ও সমৃদ্ধি ঘটেছে। অন্যদিকে এটা ঘটেছে বহুক্ষেত্রে প্রতিবেশী এবং কম সুবিধাপ্রাপ্ত জাতিগুলোর সীমা সংকুচিত হয়ে আসার বিনিময়ে। দ্বন্দ্বের ঐতিহাসিক নানান কারণ থাকতে পারে। কিন্তু দ্বন্দ্বকে সাধারণত ঐতিহাসিকভাবে সমাধান করা যায় না। সেজন্য দরকার বাস্তবতাকেও স্বীকার করা, কেননা এর মাঝে যে নতুন পরিস্থিতিগুলোর সৃষ্টি হয়েছে সেটাকে স্বীকার করে না নিলে সবার কাছে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য কোনো সমাধান কোনোদিন মিলবে না।

৩. গ্রহণযোগ্য আত্মীকরণের পথে সেই রকম কোনো সমাধান বিজেপির নাই। বরং তার রাজনীতি যেহেতু বিরোধ তৈরি করা, সারা ভারতে মুসলিমবিরোধী এক হিন্দুত্ব তৈরির আওয়াজ দিয়েই সে ভেবেছিল অনেক বড় চাল চালবে তারা। কিন্তু এর নাগরিকত্ব আইনটি আবারও সেই চাপা পড়া স্বাতন্ত্র্য এবং জাতীয়তাবোধের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে। এটার আশু তাৎপর্য বিজেপির ভারতে একক হিন্দুত্ব আনয়নের ভাবমূর্তির তছনছ হয়ে যাওয়া। বিজেপি তার রাজনীতি ও দর্শনকে যৌক্তিক সীমায় পৌঁছানোমাত্র ভারত রাষ্ট্রের গাঠনিক ভিত্তিটি– একত্ব নয়, বহুত্ব এবং স্বাতন্ত্র্য– ভারতের বহু অঞ্চলকে নাড়িয়ে দিল।

কোনো একটা নেতৃত্ব যদি বিভেদকে খুঁচিয়ে ক্ষমতায় যায়, তার পক্ষে ঐক্যের রাস্তায় ফেরা খুব কঠিন। সে ড়্গেত্রে দেখবেন দলের নেতৃত্বে বড়জনকে টপকে মেজোজন দলের দখল নেবে। ফলে নিজেদের পতন না ঘটা পর্যন্ত অমঙ্গলের রাস্তাতেই তাকে আরও বেশি করে হাঁটতে হয়, ইতিহাসে বহুবার এটা দেখা গেছে। বিজেপির নেতৃত্বের ক্রমউগ্রভাবমূর্তি দেখে বিষয়টা আরেকবার স্পষ্ট হচ্ছে।

বিজেপি কি কোনো একটা রাষ্ট্রনৈতিক সীমা অতিক্রম করেছে, প্রশ্ন করেছেন অনেকেই। সম্ভবত বিজেপি তা করেছে। ভোটের সংখ্যা গুনেছে তারা, লক্ষ্য ছিল পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম। এতদিন পর্যন্ত বিজেপির সংখ্যা গোনার, কার সঙ্গে কাকে মিত্রতা কিংবা শত্রুতার ব্যকরণে কোন রাজ্যে সাফল্য আসবে, তার হিসেবে ভালোই চলেছিল। কিন্তু শুধু সংখ্যা দিয়ে রাজনীতি হয় না, এবার বিজেপি ভোটের সংখ্যার বাইরেও এই সংখ্যাগোনার খেলায় রাষ্ট্রের সংহতি ও অস্তিত্ব শঙ্কার মাঝে পড়ে এমন দুর্ভাবনাও ভালোই জাগিয়ে তুলেছে।

এবং সম্ভবত নরেন্দ্র মোদির অপরাজেয় ভাবমূর্তিরও সর্বনাশ ঘটেছে। বহু ভারতীয় মধ্যবিত্তকে এতদিন পর্যন্ত দেখা গেছে গুজরাট হত্যাকাণ্ডকে মোদীর একটা ভুল অধ্যায় হিসেবেই দেখার চেষ্টা করেছেন, ভেবেছেন রাষ্ট্রের অগ্রগতিতে মোদির মতো শক্ত নেতা দরকার। এবার সেই মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি স্থানীয় শিক্ষার্থীদের মাঝেও প্রতিবাদের যে ঝড় উঠেছে, তা যেভাবেই সামলানো হোক, মোদির বেপরোয়া খেলার বিরুদ্ধে এটা খুব বড় ফৌজ হিসেবে আসতে যাচ্ছে।

ভারতের দরিদ্র মানুষের মাঝেও মোদির সমর্থন বেশি? মমতা বন্দোপাধ্যায় সম্প্রতি একটি বক্তৃতায় এই কথাটির উত্তর দিয়েছেন– মোদী ৩৮ ভাগ ভোটই পেয়েছেন, বাকি ৬২ ভাগ মানুষ তো তাকে ভোট দেয়নি। কিন্তু তারপরও, বিজেপি এবং তার মিত্ররা ৪৫ ভাগ ভোট পেয়েছেন, এটা বিশাল।

কথা প্রসঙ্গে বলে রাখি, শুধু মুসলমানরা নন, ভারতে খ্রিস্টান ও অন্য ধর্মের মানুষরাও ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার এবং এরপরও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মাঝেও দলিত জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন অবর্ণনীয়। ফলে ‘মুসলমান’ তার একটা লোকদেখানো শত্রু, আসলে সে নিজেই নিজ জনগণের বড় অংশটিরই অনেক বড় একটা শত্রু। ভারতে এ প্রতিবাদী বিক্ষোভের একটা বড় রাজনৈতিক তাৎপর্য উপমহাদেশজুড়ে রয়েছে। বিজেপির বিরোধিতায় ভারতে প্রগতিশীল এবং ঐক্যকামী মানুষেরা সামনের কাতারে থাকা মানেই বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক উসকানির রাজনীতি আরও একধাপ দুর্বলতর হওয়া। সংখ্যালঘু উন্মত্ত রাজনীতির শক্তি বিভাজন, জনগণের মঙ্গল পারস্পরিক সংহতি আর মিত্রতায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত