থাই এয়ারওয়েজে ওষুধের কাঁচামাল এনেছিল দি একমি ল্যাবরেটরিজ। শাহজালাল বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং এজেন্ট হিসেবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস থাই এয়ারওয়েজ থেকে সেই কাঁচামাল বুঝে রাখে। এক পর্যায়ে বিমানের গুদাম থেকে কাঁচামাল চুরি হয়। খুঁজে না পেয়ে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন না করার অজুহাতে একমি ল্যাবরেটরিজকে সেই মালামালের ক্ষতিপূরণ থাই এয়ারওয়েজের কাছ থেকে আদায়ের সুপারিশ করেছে ঘটনা তদন্তে গঠিত এক সদস্যের কমিটি। দায়িত্ব এড়ানোর এ কৌশল বের করেছেন বিমানের নিরাপত্তা তত্ত্বাবধায়ক মো. মোস্তাক আহমেদ। তার নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গত ২ ডিসেম্বর প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মো. মোস্তাক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিধিবিধান অনুসরণ করে তদন্ত করেছি। সুপারিশও ওই আলোকেই করা হয়েছে। এর বাইরে কিছু জানতে হলে বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে হবে।’
ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান দি একমি ল্যাবরেটরিজ ২০১৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর অস্ট্রিয়া থেকে ওষুধের তিন কার্টন কাঁচামাল আমদানি করে। একমির হেড অব প্রকিউরমেন্ট সাইদ হোসেন পাটোয়ারী চলতি বছর ১৭ জানুয়ারি বিমান কার্গো কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের পণ্যের অবস্থান জানতে চান। একই চিঠিতে তিনি জানান তাদের মনোনীত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে তিন কার্টন কাঁচামালের মধ্যে এক কার্টন বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। ১২ দিন পর একমি ফের তাদের পণ্যের অবস্থান জানতে চায়। বিমান কর্তৃপক্ষের কোনো জবাব না পেয়ে সাইদ হোসেন পাটোয়ারী গত ৩ মার্চ খুঁজে না পাওয়া পণ্যের ক্ষতিপূরণ চান। ২৮৩ কেজি ওজনের ওষুধের কাঁচামালের ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয় ২০ লাখ ২ হাজার ৪৪০ টাকা। এ অবস্থায় বিমানের কার্গো শাখা হতে নিরাপত্তা তত্ত্বাবধায়ক মো. মোস্তাক আহমেদকে দিয়ে এক সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
তদন্তকারী কর্মকর্তা যাদের অবহেলায় কাঁচামাল চুরি হয়েছে তাদের চিহ্নিত করলেও ক্ষতিপূরণের জন্য আমদানিকারককে ভিনদেশি এয়ারলাইনসের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বিমানের মালামাল গ্রহণ, গুদামজাত করার পদ্ধতিগত ত্রুটিও তুলে ধরেছেন। তিনি তদন্ত প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, শাহজালাল বিমানবন্দরের এফটি ইয়ার্ড, টিনশেড ও ক্যানোপি এলাকায় আমদানি করা পণ্য সংরক্ষণ ও সেখান থেকে তা সরবরাহ নেওয়ার ড়্গেত্রে কোনো ধরনের রেজিস্টার মেইনটেন করা হয় না। ফলে এসব এলাকা থেকে কোনো পণ্য আমদানিকারককে বুঝিয়ে দিতে বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে স্থানান্তর করতে হলে তার সঠিকতা যাচাইয়ের কোনো প্রক্রিয়া নেই। এ অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সুযোগসন্ধানী একটি চক্র। তারা প্যাকেটের গায়ের স্টিকার পরিবর্তন করে, ছোট আকারের কার্টন বড় কার্টনের ভেতর ঢzকিয়ে আমদানিকারকদের পণ্য এক জায়গা থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়। সেখান থেকে সুযোগমতো পাচার করে দেয়।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি করা মালামাল রাখার গুদাম এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো পার্সেল থেকে কেউ কোনো কিছু চুরি করছে কি না, শুধু তাই দেখেন গুদাম এলাকার নিরাপত্তাকর্মীরা। পুরো পার্সেল এক জায়গা থেকে অন্য যায়গায় সরিয়ে নেওয়ার সময় তারা কোনো ডকুমেন্ট চাইতে পারেন না। সেখানে কাগজপত্র যাচাইয়ের কোনো প্রচলনই নেই। বিমানের কার্গো বিভাগের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীও বিষয়টি তদারকি করেন না। একমাত্র ডেলিভারি চেকিং পয়েন্টেই মালামাল খালাসের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিরীক্ষা করা হয়। এ সুযোগে দুর্নীতিবাজ চক্র ডেলিভারি চেকিং পয়েন্টে মালামাল পৌঁছানোর আগেই স্টিকার বদলে ফেলে। এভাবেই কৌশলে আমদানি করা পণ্য চুরি যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়।
ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অথরিটির নিয়ম অনুযায়ী, ২১ দিনের মধ্যে পণ্য ডেলিভারি না নিলে কোনো ধরনের ক্ষতির জন্য কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা যাবে না। কিন্তু একমি ল্যাবরেটরিজ ২৪ দিন পর পণ্যের অবস্থান জানতে চেয়েছে এবং ২ মাস ৯ দিন পর ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। বিষয়টি উল্লেখ করে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এফটি ইয়ার্ড, টিনশেড ও ক্যানোপি বা গুদাম এলাকা সিসিটিভির আওতার মধ্যে থাকলেও সিসিটিভির রেকর্ড ২১ দিন পর মুছে যায়। ২১ দিনের মধ্যেই যদি হারিয়ে যাওয়া পণ্যের তদন্ত প্রক্রিয়া চালু করা হতো সিসিটিভির ফুটেজের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া কাঁচামালের তথ্য উদঘাটন করা যেত।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্লাইট চেকিং স্টাফ রফিকুর রহমান একমি ল্যাবরেটরিজের কাঁচামালের তিনটি কার্টন গ্রহণ করেছেন এবং গুদামে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। নিয়ম থাকলেও তিনি পণ্যটি গুদামে পৌঁছেছে কি না তা নিশ্চিত করেননি। তার উদাসীনতায় পণ্যটি হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। জিএসই শাখার জুনিয়র অপারেটর জোনায়েত হোসেন কার্টনটি যথাস্থানে রেখেছেন দাবি করলেও তা মিথ্য ও বিভ্রান্তিমূলক বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমানের গুদাম থেকে পণ্য হারিয়ে যাওয়ার দায় বিমানের নিরাপত্তাকর্মীরা এড়াতে পারেন না। বিমানের কর্মীরা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় এবং সাক্ষীর অভাবে কোনো নিরাপত্তাকর্মীকে দায়ী করতে পারেননি বলে মন্তব্য করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
আমদানিকারককে পণ্য বুঝিয়ে দিতে ব্যর্থ হলে পরিবাহক এয়ারলাইনসের কাছে অভিযোগ করে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি মীমাংসা করার নিয়ম থাকার কথা বলা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে। একই সঙ্গে হ্যান্ডলিং এজেন্টের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করার কোনো বিধান নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘দি একমি ল্যাবরেটরিজ কোম্পানি লিমিটেড পরিবাহক এয়ারলাইনস থাই এয়ারওয়েজের কাছে দাবি উপস্থাপনকরত ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে পারেন’ বলে তদন্ত প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়।
একমি ল্যাবরেটরিজের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে জানান, তারা নিয়মিত ওষুধের কাঁচামাল আমদানি করেন। কোনো চালানের কাঁচামাল হারিয়েছে তা বুঝে উঠতেই কয়েক দিন সময় লেগেছে। এ কারণে তারা ২১ দিনের মধ্যে অভিযোগ জানাতে পারেননি।
বিমানের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, শাহজালাল বিমানবন্দরের একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সংস্থার আমদানি করা পণ্য গায়েব করে দিচ্ছে। এ চক্রের সঙ্গে বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও জড়িত রয়েছেন। এ ধরনের চুরির সঙ্গে অনেক সময়ই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও জড়িত থাকেন। তাদের যোগসাজশেই এসব ঘটনা ঘটে। শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যাওয়া পণ্য পাওয়া না গেলে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বীমা কোম্পানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পায়। আর চক্রটি হারিয়ে যাওয়া পণ্য সংশ্লিষ্টদের হাতে তুলে দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। প্রতারক চক্র, বিমানের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী আর কখনো কখনো আমদানিকারক কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে খপ্পরে পড়ে বিমানের আর্থিক ও সুনাম নষ্ট হচ্ছে।
