ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণ খতিয়ে দেখবে সরকার

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৩:০০ এএম

বছরজুড়ে দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল। চাল, পেঁয়াজ, ভোজ্য তেল, আটা, চিনি ও বিভিন্ন সবজির দাম নিয়ে অস্বস্তির শেষ নেই ভোক্তাদের। তবে বেশিরভাগ পণ্যের দাম বাড়ার কারণ জানে না সরকার। এরই মধ্যে নতুন করে বিপণন পর্যায়ে ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে এ খাতের মিল মালিকদের সংগঠন ভোজ্য তেল পরিশোধনকারী ও বনস্পতি উৎপাদনকারী সমিতি। এ বিষয়ে আজ সোমবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণ খতিয়ে দেখার বিষয়েও ওই বৈঠকে আলোচনা হবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সরকারের বিপণন প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) গতকাল রবিবারের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে প্রতি কেজি খোলা আটার দাম বেড়েছে ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ ও প্যাকেট আটার দাম বেড়েছে ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এ ছাড়া খোলা ময়দার দাম বেড়েছে ৭ শতাংশ। প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের (খোলা) দাম বেড়েছে ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ, আর এক মাসের ব্যবধানে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ৬৯ শতাংশ। মশুর ডালের দাম বেড়েছে বছর ব্যবধানে ২০ শতাংশ, দেশি ডালের দাম বেড়েছে ২৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এ ছাড়া চলতি বছর পেঁয়াজের দাম রেকর্ড প্রায় ৬০০ শতাংশ বেড়েছে। তিন মাসের ব্যবধানে চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৬-৮ টাকা। চিনির দাম বেড়েছে কেজিতে ৫-৮ টাকা।

বাণিজ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি বছর পেঁয়াজ ছাড়া অন্য কোনো ভোগ্যপণ্যের মূল্য বাড়ার কারণ খুঁজে পায়নি সরকার। কিন্তু পেঁয়াজের কেজি কোনোভাবেই ২৬০ টাকা হওয়ার কথা নয়। এ ছাড়া বিশ্ববাজারে সয়াবিন তেল ও আটার দাম কিছুটা বেড়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে তার চেয়ে অনেক বেশি বেড়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বোরো মৌসুমে কৃষকরা ন্যায্য দামে ধান বিক্রি করতে না পারলেও, মিলাররা চালের দাম ঠিকই বাড়িয়েছেন। এতে কৃষকদের কোনো লাভ হয়নি। অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লেও কৃষক পর্যায়ে আগের দামই আছে। কোনো কোনো ড়্গেত্রে কৃষকরা আরও কম দাম পাচ্ছেন।

বিশ্ববাজারে বাড়ায় দেশে গত দুই মাসে ভোজ্য তেল ও আটার দাম বেড়েছে বলে যুক্তি ব্যবসায়ীদের। এদিকে ট্যারিফ কমিশনকে গত ১২ ডিসেম্বর বিপণন পর্যায়ে বোতলজাত সয়াবিনের দাম লিটারপ্রতি ১০২ থেকে বাড়িয়ে ১১০ টাকা, দুই লিটার ২০২ থেকে ২১৮ টাকা ও পাঁচ লিটার ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৫৪০ টাকা করার প্রস্তাব করেছে মিল মালিকদের সংগঠন। এর আগেও দুটি কোম্পানি দাম বাড়ানোর বিষয়ে ট্যারিফ কমিশনকে চিঠি দিলে তা খারিজ করে কমিশন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশের বেশিরভাগ সয়াবিন তেল ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা থেকে আমদানি করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান বিজনেস ইনসাইডারের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারের ২০১৬-১৭ সাল জুড়ে সয়াবিনের দাম  ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও ২০১৮ থেকে তা কমতে শুরু করে। গত অক্টোবরে দাম কিছুটা বেড়ে নভেম্বরে আবার কমে। আর বর্তমানে প্রতি টন সয়াবিন তেলের মূল্য ৭২৮ মার্কিন ডলার। আরেক বাজার পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ইনডেক্স মুন্ডির তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে সয়াবিনের দাম বেড়েছে ৬ দশমিক ২৭ শতাশং আর গত বছরের ২১ ডিসেম্বরের তুলনায় দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ। মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববাজারে পণ্যটির দাম গত চার মাস ধরে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও ২০১৬-১৭ হারে বাড়েনি। এছাড়া অল্প সময়ের মধ্যে দাম কমার সম্ভাবনাও রয়েছে। তাই এখনই দাম বাড়ানোর বিপক্ষে বেশিরভাগ কর্মকর্তা। তাদের যুক্তি, বর্তমানে বিপণন প্রতিষ্ঠনগুলো নির্ধারিত দামের অনেক কমে পাইকারি ব্যবসায়ীদের নিকট সরবরাহ করছে। লোকসান হলে সেটা করতে পারত না। তাই দাম বাড়ানোর আগে এটা অধিকতর যাচাই করার প্রয়োজন আছে।

বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে চিনি মজুদ থাকার পরও কেজিপ্রতি চিনির দাম বেড়েছে ৫-৭ টাকা। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খোদ বাণিজ্যমন্ত্রী। এছাড়া পাইকারি পর্যায়ে চালের দাম মাত্র ১ টাকা বাড়ায় খুচরা পর্যায়ে ৬-৭ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। বেশিরভাগ সবজির দাম চড়া। মাছের বাজারেও একই অবস্থা। এ নিয়ে এক প্রকার বিপাকেই আছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তাই বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখার চিন্তা করছে সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া কৃষক পর্যায়ে কীভাবে ন্যায্য দাম নির্ধারণ করা যায় এবং বাজারে কীভাবে ভারসাম্য আনা যায় সেই বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ভোজ্য তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব ও বিভিন্ন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আজ বৈঠকে বসতে যাচ্ছে বাণিজ্যমন্ত্রী। সেখানে মন্ত্রণালয় ও বাজারে সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত থাকবেন। বৈঠকে আগামী রমজানে কীভাবে পণ্যবাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বৃদ্ধি রোধ, পেঁয়াজ আমদানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও বাজার তদারকি বাড়ানোর করণীয়, ২৫তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা বিষয়ে আলোচনা হবে।

এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রায় এক বছর হয়েছে আমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েছি। এই সময়ে বেশকিছু পণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে বেড়েছে। তবে চাল ও আটার বিষয়টি আমার অধীনে নয়। তারপরও বলছি, এগুলোর দাম বৃদ্ধিতে কৃষকের লাভ হয়নি। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় পণ্যটির দাম বাড়ে। তবে দেশে পর্যাপ্ত অবিক্রীত চিনি থাকার পরও এর দাম বাড়ছে। এর কোনো কারণ দেখছি না। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। একটা প্রবণতা হয়ে গেছে, যতটা না দাম বাড়ে তার থেকে প্রচার বেশি হয়। ফলে দ্রুত ওই পণ্যের দাম আরও বাড়ে। এর কারণ কী সেটাও দেখা হবে। ইতিমধ্যে ভোজ্য তেল কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। আগামীকাল (আজ) এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক হবে। সেখানে আমরা এর যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখব। যদি মনে হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে যে হারে দাম বাড়ছে তাতে অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম বাড়ানো হবে না, তাহলে আর দাম বাড়াব না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত