ঋত্বিকের পৈতৃক ভিটা ভাঙা নিয়ে হোমিওপ্যাথিক কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে ভিন্ন কথা

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৫:৪৯ পিএম

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক কুমার ঘটকের পৈতৃক ভিটার একটি অংশ ভেঙে সেখানে সাইকেল গ্যারেজ করার অভিযোগ উঠেছে রাজশাহী হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। এর প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন রাজশাহীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও চলচ্চিত্রপ্রেমী মানুষরা। ইতিমধ্যে তারা স্মারকলিপি প্রদান ও মানববন্ধনের মতো কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন। তবে, কলেজ কর্তৃপক্ষ দাবি করেছেন, যে কক্ষটি ভাঙা হয়েছে সেটি চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক কুমার ঘটকের পৈতৃক ভিটার অংশ নয়। ১৯৯০ সালের দিকে ওই কক্ষটি বানিয়েছিল হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ। 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের সভাপতি অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ বকুল জানান, বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি ঋত্বিক কুমার ঘটকের রাজশাহী মহানগরীর মিঞাপাড়ার বাড়িতে শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের একটি অংশ কেটেছে। এই বাড়িতে কিছু সময় বসবাস করেছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীও। এ বাড়িতে থাকার সময়ই ঋত্বিক ঘটক রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল ও রাজশাহী কলেজে পড়েছেন। তিনি রাজশাহী কলেজ এবং মিঞাপাড়ার সাধারণ গ্রন্থাগার মাঠে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে নাট্যচর্চা করেছেন। ঋত্বিক ঘটক ওই সময় রাজশাহীতে 'অভিধারা' পত্রিকা সম্পাদন করেছেন। বিলুপ্ত কল্পনা হলের ' ভাবীকাল' নামে একটি চলচ্চিত্রের ব্যানারও এঁকেছেন বলে জানা যায়। রাজশাহীর তৎকালীন সাংস্কৃতিক জগতে তিনি যৌবনকালে সবার মধ্যমণি হয়ে উঠেছিলেন। ওই সময়ে নাট্যান্দোলন ও সাহিত্য সম্পাদনা করেছেন। তার সেই বাড়িটিই এরশাদ সরকারের আমলে ১৯৮৯ সালে নামমাত্র মূল্যে রাজশাহী হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজকে ইজারা দেওয়া হয়। তারাই এখন সম্পূর্ণ বাড়িটি ব্যবহার করছে। বাড়িটির এক অংশে ইতিমধ্যে বহুতল ভবন করছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। আরেক অংশে যেসব কক্ষে ঋত্বিকরা থাকতেন সেসব কক্ষও ব্যবহার করছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। তারই এক অংশ ভেঙে অস্থায়ী সাইকেল গ্যারেজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।

সাজ্জাদ বকুল বলেন, রাজশাহীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও চলচ্চিত্রপ্রেমী সংগঠনের নেতারা এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে অতি দ্রুত তা বন্ধ করে ঋত্বিকের পৈতৃক ভিটা সংরক্ষণ করে হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এই ভিটায় ঋত্বিক ঘটক স্মৃতি জাদুঘরও গড়ে তোলার দাবি জানান তারা।

রাজশাহী মহানগরীর মিঞাপাড়ায় ঋত্বিক ঘটকের পৈতৃক ভিটা সংরক্ষণের দাবিতে মঙ্গলবার বিকেলে রাজশাহী নগরীর সাহেববাজারে মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। ঋত্বিক ঘটক ফিল্ম সোসাইটি, রাজশাহী ফিল্ম সোসাইটি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ ও বরেন্দ্র ফিল্ম সোসাইটি।

এর আগে রাজশাহী জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে রাজশাহীর প্রগতিশীল কয়েকটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। সোমবার বিকেলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক)  মুহাম্মদ শরিফুল হক এ স্মারকলিপি গ্রহণ করেন। এসময় রাজশাহী ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি আহসান কবীর লিটন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের সভাপতি অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ বকুল, কবি ও কবিতার সংগঠন 'কবিকুঞ্জের' সভাপতি অধ্যাপক রুহুল আমিন প্রামাণিক, ঋত্বিক ঘটক ফিল্ম সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ ইসলাম মাসুদ, নাট্য সংগঠন ভোর হলোর সভাপতি কামার উল্লাহ সরকার কামাল উপস্থিত ছিলেন। 

কবি আরিফুল হক কুমার বলেন, রাজশাহী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ঋদ্ধ একটি শহর। অবিভক্ত ভারতবর্ষের এবং বাঙলার অন্যতম শিক্ষা কেন্দ্র রাজশাহী। এই শহর ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদার, প্রমথ নাথ বিশি, রজনীকান্ত সেন, রাধিকা মোহন মৈত্র, মাকসুদ হিলালী, সৈয়দ মুজতবা আলী এবং ঋত্বিক ঘটক, মহাশ্বেতা দেবী প্রমুখ অসংখ্য নক্ষত্রের আলোয় সমুজ্জ্বল। এই ঐতিহ্যই রাজশাহীর পরিচয়, অহংকার। এগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র আইকন ঋত্বিক ঘটকের বাড়ি সংরক্ষণের দাবি জানাচ্ছি। তার বাড়ি ভেঙে ফেলার উদ্যোগের নিন্দা জানাই।

তবে, রাজশাহী হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ডা. আনিসুর রহমান বলেন, যে কক্ষটি ভাঙা হয়েছে সেটি ঋত্বিক ঘটকের স্মৃতিজড়িত কোন কক্ষ নয়। ১৯৯০ এর দিকে ওই ঘরটি হোমিওপ্যাথিক কলেজ কর্তৃপক্ষই ওই ঘরটি নির্মাণ করেছিল। সেটি ছিল অস্থায়ীভাবে বানানো ঘর। এরই মধ্যে কক্ষটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। সেটিই ভাঙা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বলেন, যারা এর প্রতিবাদ জানাচ্ছেন তারা সোমবার কলেজে এসেছিলেন। তাদেরকেও বিষয়টি বলেছি, এছাড়া দেখিয়েছি যে এই কক্ষটি যেসব ইট দিয়ে তৈরি করা হয়েছে সেগুলো প্রাচীন সময়ের বা পুরোনো আমলের নয়। দেখলেই বোঝা যায় সেটি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত