টেক সালতামামি-২০১৯

বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মঞ্চে বাণিজ্যযুদ্ধের বছর

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:৫৮ পিএম

বিশ্বাস ভাঙার খেলা শুরু হলো ২০১৬ সালে, সেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়। মানুষ জানল ২০১৯-এ। মাঝের তিন বছর প্রযুক্তিবিশ্বে তৈরি হলো একটি গ্রাউন্ড, যেটি তল ছুঁয়েছে এ বছর। সঙ্গে লাগল বাণিজ্যযুদ্ধের আঁচ।

একুশ শতকের আরেকটি বছরকে বিদায় দেওয়ার সময় প্রযুক্তি জগতের হিসাব-নিকাশ করতে গেলে চীন-আমেরিকার বাণিজ্যযুদ্ধকে বাদ দেওয়ার উপায় নেই। চীনের হুয়াওয়ে কোম্পানিকে আমেরিকা কালো তালিকায় ফেলার পর টেক দুনিয়া বড় ধাক্কা খায়। যেটি সামনের বছরও অব্যাহত থাকবে। চলতি বছরের বাকি গল্প ফ্ল্যাশব্যাকে দেখতে গেলে ফিরতে হবে তিন বছর আগে।

সেবার ট্রাম্পের নির্বাচন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ফেইসবুকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা প্রায় পাঁচ কোটি ফেইসবুক ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহার করে। বিদায়ী বছরে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কোটি কোটি ডলার জরিমানা দিতে হয় ফেইসবুককে। বিভিন্ন দেশে মামলা হয় সহপ্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গের নামে।

এই ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে গোটা বিশ্ব। বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের সতর্ক করে বলে, সব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানই ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য কাজে লাগিয়ে ব্যবসা করছে।

এখনকার দিনে উবার, পাঠাও, মেসেঞ্জারের মতো অ্যাপের কারণে কিছুই আসলে গোপন থাকছে না। আপনি কোথায় যাচ্ছেন, কী করছেন, কার সঙ্গে কথা বলছেনÑ সব তারা খেয়াল রাখছে। এই বিষয়টি নিয়ে সারা বছরই হইচই হয়েছে।

স্টার্টআপের উত্থান

একদম নতুন আইডিয়া নিয়ে যারা ব্যবসা করতে চান, তাদের জন্য ২০১৯ সাল একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। সিলিকনভ্যালি আগে থেকেই স্টার্টআপের জোয়ারে ভাসছে। এই বছরটা মূলত বাংলাদেশের মতো অঞ্চলে স্টার্টআপ নতুন মাত্রা পেয়েছে। অনেক বাংলাদেশি তরুণ তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রযুক্তিগত আইডিয়া নিয়ে ব্যবসায় আসার স্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন।

এসবের পাশাপাশি চলতি বছর এমন কিছু প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়েছে, যা মানুষের জীবনকে বদলে দিতে ভূমিকা রাখছে। তার মধ্যে অন্যতম ইসিজি ঘড়ি।

এই ঘড়ি হঠাৎ মৃত্যুর হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করছে। ঘড়িটি হাতে পরে থাকলে হার্ট-রেট পর্যবেক্ষণ করা সহজ। পাশাপাশি এই ঘড়িতে রয়েছে অসুস্থ হয়ে পড়ে গেলে তা শনাক্তের প্রযুক্তি। ঘড়িটি এমন অবস্থায় জরুরি চিকিৎসাসেবার জন্য নিজেই যোগাযোগ শুরু করতে সক্ষম। তা ছাড়া এট্রিয়াল ফিব্রিলেশন হিসেবে পরিচিত হৃৎপিণ্ডের মারাত্মক রোগের লক্ষণ শনাক্ত করতে পারবে অ্যাপল ওয়াচ।

জ্বালানিবিহীন মহাকাশযান

নাসার প্রকৌশলী ডেভিড বার্নসের আইডিয়া থেকে তৈরি হচ্ছে জ্বালানিবিহীন মহাকাশযান।

যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামার হানস্টভিলে নাসা পরিচালিত মার্শাল মহাকাশ উড্ডয়ন কেন্দ্রে কর্মরত বার্নস তার প্রকল্পটির নাম দিয়েছেন ‘হেলিকাল ইঞ্জিন’। ইঞ্জিনটি প্রস্তুত করতে বাক্সের মধ্যে একটি রিং রাখা হবে, যা ঘর্ষণহীন পৃষ্ঠের ওপর বসানো হবে। রিংটি মেঝে বরাবর একটি রডের ওপর থাকবে, যার এক প্রান্তে একটি স্প্রিং সংযুক্ত হবে। স্প্রিংটি রিংকে সামনের দিকে ধাক্কা দিলে বাক্সটি নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্র অনুসারে বিপরীত দিকে পিছিয়ে যাবে; এ সূত্র কাজে লাগিয়ে বাক্সটিকে প্রভাবিত করতে আগেই রিংয়ের ভর বৃদ্ধি করা হবে। এতে বাক্সটিকে সামনের দিকে ধাক্কা দিতে একটি নির্দিষ্ট মুহূর্ত সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। এটি বারবার করার সময় বাক্সটি এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে যেতে সক্ষম হবে। এভাবে গতিবেগ বাড়ালে রিংয়ের পরিবর্তন আরও ত্বরান্বিত হবে। এক সময় পাবে আলোর গতি! নাসা বলছে, এই প্রযুক্তির সফল ব্যবহার মহাকাশ গবেষণায় বিপ্লব ঘটাবে। মহাকাশে পৌঁছাতে আগের মতো খরচ হবে না।

সেনাদের অদৃশ্য পোশাক

মানবসভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ এমন পোশাক তৈরি করতে চেয়েছে, যা পরলে কেউ দেখতে পাবে না। এটি ২০১৫ সাল থেকে স্বল্প পরিসরে তৈরি হলেও পূর্ণতা পেয়েছে ২০১৯ সালে।

কানাডার একটি প্রতিষ্ঠান কোয়ান্টাম স্টিলথ ম্যাটেরিয়াল দিয়ে এমনভাবে পোশাকটি তৈরি করেছে, যা আলোতে অদৃশ্য থাকে। এই পোশাক দিয়ে ঢেকে সেনাবাহিনীর ট্যাংক পর্যন্ত নিয়ে আসা যায়, কেউ চোখেই দেখবে না। এটি এমন একটি অদৃশ্য উপাদান, যা খুব পাতলা এবং সহজলভ্য। অদৃশ্য হতে বাড়তি কোনো শক্তির প্রয়োজন হয় না। কানাডার সেনাবাহিনী এটি ব্যবহার করছে।

ল্যাবে মানব মস্তিষ্ক

জাপানের স্নায়ুবিজ্ঞানীরা চলতি বছর ল্যাবে মানুষের মস্তিষ্কের কিছু অংশ তৈরি করেছেন। এটি তারা তৈরি করেন প্লুরিপোটেস্ট স্টেম সেল থেকে। হার্ভার্ডের গবেষকরাও একই ধরনের সেল তৈরি করেছেন।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার

প্রযুক্তিবিদদের স্বপ্নের কম্পিউটার ‘কোয়ান্টাম’ তৈরি করেছে গুগল। গত অক্টোবরে গুগল জানায়, সাধারণ একটি কম্পিউটার যে হিসাব করতে ১০ হাজার বছর সময় নেবে, কোয়ান্টাম কম্পিউটার সেটি দুই মিনিটেরও কম সময়ে (১০০ সেকেন্ড) শেষ করবে! গুগল এই কম্পিউটার আবিষ্কার করতে ১৩ বছর ধরে চেষ্টা চালিয়েছে।

ডিপফেক প্রযুক্তি

ভালো ভালো সব প্রযুক্তির ভিড়ে এ বছর শঙ্কা জাগানিয়া কিছু প্রযুক্তি দেখেছে বিশ্ব। তার মধ্যে অন্যতম ডিপফেক।

ডিপফেক বলতে নকল ভিডিও বা অডিওকে বোঝায়। আপাতদৃষ্টিতে দেখতে আসল মনে হলেও তা মোটেই আসল নয়। মেশিন লার্নিং ডিপফেক ভিডিও বানানোর প্রধান প্রযুক্তি। মেশিন লার্নিংয়ের একটি কৌশলের নাম জেনারেল অ্যাডভারসেরিয়াল নেটওয়ার্ক (জিএএন)। এর মাধ্যমে প্রথমে একজন ব্যক্তির বিভিন্ন অভিব্যক্তির শত শত ছবি সংগ্রহ করা হয়। সেই ছবিগুলো মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে প্রক্রিয়া করে তার মুখের সব ধরনের অভিব্যক্তির একটি গঠন তৈরি করা হয়।

এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ব্যক্তির গলার আওয়াজও হুবহু নকল করা সম্ভব। এসব ভিডিও ও অডিও নানাভাবে প্রক্রিয়া করে এমন একটি নকল ভিডিও তৈরি করা হয়, যা খালি চোখে শনাক্ত করা অনেক কঠিন। জনপ্রিয় সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট দ্য হাফিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনের অভিযোগ, বিভিন্ন দেশে ডিপফেক দিয়ে ভুয়া পর্নো ভিডিও বানিয়ে নারীদের বিপাকে ফেলা হচ্ছে।

রাশিয়ার নিজস্ব ইন্টারনেট

ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অসম্ভবকে প্রায় সম্ভব করে ফেলেছে রাশিয়া। বৈশ্বিক ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের তৈরি ওয়েব ভার্সন ‘রুনেট’-এর পরীক্ষামূলক সংযোগ এই ডিসেম্বর নাগাদ সফল করেছে তারা।

পৃথিবীর ইন্টারনেট ব্যবস্থার মূলত কোনো কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান নেই। নেটওয়ার্ক সচল রাখতে একটি দেশকে তার নিজের যন্ত্রপাতির ওপর যেমন নির্ভর করতে হয়, তেমনি বিদেশিদের দিকেও তাকিয়ে

থাকতে হয়। সম্মিলিত এই প্রক্রিয়া সাগরতলের কেব্ল কিংবা স্যাটেলাইট দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়। যেখানে থাকে না কোনো সীমান্ত। অনলাইনের কল্যাণে পৃথিবীটা হয়ে যায় উন্মুক্ত। রাশিয়া তাদের ‘রুনেট’ দিয়ে শুধু নিজেদের দেশে ইন্টারনেট ব্যবস্থা চালু রাখবে। বাইরের দেশের কোনো প্রযুক্তি তারা ব্যবহার করবে না।

কয়েক মাস আগে কঙ্গো তাদের নির্বাচনের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছিল। এখন রাশিয়াও এমনটি করছে। কিন্তু তাদের পরিকল্পনা আরও বড়। নিজস্ব ইন্টারনেট ব্যবস্থার জন্য কঙ্গোর কোনো অবকাঠামো নেই। রাশিয়া কয়েক বছর ধরে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে সেই কাঠামো গড়েছে। একটি রাষ্ট্রের জন্য এটি কঠিনতম ঝুঁকির কাজ।

এ পলিসির কারণে রাশিয়ার সব ডোমেইন নেম সিস্টেম (ডিএনএস) সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রক্সি ডোমেইন নেম সিস্টেমে যেতে বাধ্য হচ্ছে। অর্থাৎ সাধারণ আইএসপি দিয়ে সচল থাকা একটি ডিএনএস সার্ভার যুক্ত হয়েছে সরকারের ডিএনএস সার্ভারে।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তার এই পরিকল্পনাকে ‘ইন্টারনেট বিপ্লব’ বললেও পশ্চিমা বিশ্লেষকরা বলছেন ‘গণতন্ত্রকে রুদ্ধ’ করার ‘ভয়ংকর’ খেলা।

সারে বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানী অধ্যাপক অ্যালান উডওয়ার্ড বিবিসিকে বলেন, ‘এর অর্থ হলো রাশিয়ার মানুষ আর নিজের সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারবেন না। ইন্টারনেটে তাদের সব কিছু সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে।’

এসবের পেছনে পুতিনের ক্ষমতা ধরে রাখার নীলনকশা যেমন আছে, তেমনি আছে বৈশ্বিক প্রভাবমুক্ত হয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা। যে পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু ওই বাণিজ্যযুদ্ধ!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত