জুনায়েদ হাফিজের ফাঁসির দণ্ড, ধর্ম ও মানবতা

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:৪০ এএম

ধর্মরক্ষার নামে ‘আইন ও সংবিধানের’ দোহাই দিয়ে এবার পাকিস্তানে জুনায়েদ হাফিজ নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে ফাঁসির দড়ির সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্লাসফেমি আইনে ৩৩ বছর বয়সী এই শিক্ষকের মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হজরত মুহাম্মদকে (সা.) নিয়ে সমালোচনামূলক মন্তব্য পোস্ট করেছিলেন হাফিজ। আদালত অবশ্য জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ ছিল। একটি মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় তাকে। অন্যটিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তৃতীয় অভিযোগের জন্য আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। দীর্ঘদিন ধরেই এই মামলার শুনানি চলছিল। এর মধ্যে একাধিকবার বিচারপতি বদলি হয়েছেন। শুনানিও স্থগিত হয়েছে অসংখ্যবার। শেষমেশ তাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের সাজা শোনায় মুলতানের আদালত। ফাঁসির সাজা ঘোষণা হওয়ার পর কার্যত পৈশাচিক আনন্দে ভরে ওঠে আদালত চত্বর। সরকারি পক্ষের আইনজীবীরা মিষ্টি বিতরণ করেন সবাইকে!

২০১৩ সালে, প্রথমে তার হয়ে মামলা লড়তেই রাজি হননি কেউ। এক বছর পর ২০১৪ সালে তার আইনজীবী হিসেবে মামলা লড়তে শুরু করেন রশিদ রেহমান নামে এক আইনজীবী। কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে কে বা কারা গুলি করে মারে। গ্রেপ্তারের পর জেলের ভেতরে একাধিকবার জুনাইদের ওপরও হামলা চালিয়েছিল অন্য বন্দিরা। এরপরই মুলতানের একটি কারাগারের নির্জন কক্ষে স্থানান্তরিত করা হয় জুনাইদকে। সেখানেই মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয়েছে তার।

২০১৯ সালে দাঁড়িয়ে এমন রায় ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়। মানুষ যখন উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের অধিকার নিয়ে সোচ্চার, গণতান্ত্রিক বিশ্বে যখন মানুষের অধিকার আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে, তখন পাকিস্তান রাষ্ট্র আর তার আদালত এখনো অবস্থান করছে কতটা অন্ধকার আদিম সময়ে, তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়।

জুনায়েদ হাফিজ পাকিস্তানের মুলতানের বাহাউদ্দিন জাকারিয়া ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করতেন। আমেরিকান সাহিত্য, আলোকচিত্র ও থিয়েটার বিষয়ে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করেছেন। তিনি উচ্চতর লেখাপড়া শেষ করে পাকিস্তানে ফিরে এসেছিলেন দেশের সেবা করবেন বলে। তিনি চেয়েছিলেন নিজ দেশে শিক্ষা বিস্তার করতে। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হাফিজ একজন যুক্তিবাদী ও অন্ধ ধর্মপ্রেমবিরোধী। ধর্মের নামে পাকিস্তানে চলা বহু প্রাচীন চিন্তাভাবনা ও মানুষের ওপর চলা অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ করেছেন। তারপর আওয়াজ তোলেন নারীদের শিক্ষা, সুরক্ষা ও স্বাধীনতা নিয়েও। এটাই ধর্মান্ধ গোঁড়া পাকিস্তানিদের চোখে তাকে খারাপ করে তোলে। তাকে বিভিন্ন মামলায় ফাঁসিয়ে চালানো হয় অকথ্য অত্যাচার। রেহাই পায়নি তার পরিবারের লোকজনও। তার বাবার ব্যবসা ধ্বংস করা হয়েছে। উগ্র ধর্মান্ধ আর জঙ্গিদের নিরাপদভূমি পাকিস্তানে তার দেশসেবার আকাক্সক্ষা এখন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।

উল্লেখ্য, ধর্মীয় অবমাননা পাকিস্তানে বরাবরই গুরুতর বিষয়। অপরাধ প্রমাণ হলে সাজা হয় মৃত্যুদণ্ড। আবার অপরাধ প্রমাণ না হওয়া সত্ত্বেও অভিযুক্তকে পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনাও এখানে হামেশাই ঘটে। পাকিস্তানের প্রাচীন ধর্ম-আইন অনুযায়ী, কোনো ধর্মীয় সমাবেশে গণ্ডগোল করা, অন্য ধর্মের সমাধিস্থানে প্রবেশ করা, কারও ধর্মীয় বিশ্বাসে অপমান করা বা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ধর্মীয় স্থান বা বস্তু ধ্বংস বা তার ক্ষতি করায় সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হতো। কিন্তু ১৯৮০ থেকে ১৯৮৬ সালের মধ্যে সেনাশাসক জিয়াউল হকের আমলে এই আইনে আরও বেশ কয়েকটি ধারা যোগ করা হয়।

সেই নতুন ধারায় ইসলামের কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্য করাকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়, ইচ্ছাকৃতভাবে কোরআন অপবিত্র করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তির বিধান আনা হয়, হজরত মুহাম্মদকে (সা.) সমালোচনা বা অবমাননা করে কোনো মন্তব্য করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ যোগ করা হয়।

পাকিস্তানে ব্লাসফেমি আইন প্রয়োগ করে হাফিজের মতো অনেককেই কঠিন দণ্ড দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালে প্রকাশিত ‘আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশনের’ একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ধর্মদ্রোহের অভিযোগে কমপক্ষে ৪০ জন এ মুহূর্তে পাকিস্তানের বিভিন্ন জেলে বন্দি রয়েছেন। কেউ সাজা পেয়েছেন, কারও শাস্তি ঘোষণা সময়ের অপেক্ষা। সাজাপ্রাপ্তদের অনেকেই পেয়েছেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। বাকিরা মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন। ওই একই অভিযোগে দীর্ঘ এক দশক সেখানে লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন আসিয়া বিবি। প্রমাণের অভাবে গত বছর অক্টোবরে সুপ্রিম কোর্টে অব্যাহতি পান তিনি।

দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ধর্মের নামে উন্মত্ততা ক্রমেই বাড়ছে। কখনো রাষ্ট্রীয় আইন দিয়ে, কখনো-বা প্রকাশ্যে গুলি করে, চাপাতির ঘায়ে কিংবা গণপিটুনিতে ভিন্ন মতাবলম্বীদের হত্যা করা হচ্ছে। এটা শুধু পাকিস্তানেই নয়, ভারত এবং বাংলাদেশেও এই উন্মত্ততার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা যাচ্ছে। আমাদের দেশে ২০০৪ সালে বিশিষ্ট লেখক-গবেষক অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদকে উগ্রধর্মবাদীরা ঢাকায় বাংলা একাডেমির সামনের রাস্তায় নৃশংসভাবে আক্রমণ করে প্রকাশ্য দিবালোকে। তার মৃত্যু ঘটে ১১ আগস্ট, ২০০৪ সালে। এরপর ভারতে খুন হন অধ্যাপক এইচ এস সাভারওয়াল। তিনি ছিলেন উজ্জয়িনীর মাধব কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক। অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের উগ্র-সন্ত্রাসী কর্মীদের হাতে তিনি ২৬ আগস্ট ২০০৬ নিহত হন। ব্লগার রাজীব হায়দার প্রকাশ্যে খুন হন ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের জমায়েত শুরুর দশ দিনের মাথায়।

ভারতের পুনের কুসংস্কারবিরোধী আন্দোলনের নেতা, লেখক নরেন্দ্র দাভলকরকে ‘হিন্দু’ ধর্মরক্ষার নামে প্রকাশ্যে সকালে পার্কে হত্যা করা হয় ২০ আগস্ট ২০১৩। যেভাবে প্রকাশ্যে কুপিয়ে অভিজিৎ রায়কে ধর্মরক্ষার নামে হত্যা করেছে জঙ্গিরা। বাংলাদেশে ধর্মীয় জঙ্গিদের হাতে ২০১৩-২০১৮ পর্যন্ত খুন হয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহম্মদ ইউনুস, মুক্তচিন্তার লেখক-ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয়, নাজিমুদ্দিন সামাদ, শাহজাহান বাচ্চু, প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনসহ অনেকে।

এসব হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধ ও প্রতিকারে রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্র চরমভাবে ‘একদেশদর্শী’ ভূমিকা পালন করছে। সমাজে নানা মতের মানুষ এবং নানা ধরনের জীবনচর্যা থাকবেই। একের সঙ্গে অন্যের মতানৈক্য ও আদর্শগত বিরোধও স্বাভাবিক। কিন্তু তা কখনোই অন্যের ওপর চড়াও হওয়ার যুক্তি হতে পারে না। এটা যেকোনো সুস্থ এবং সভ্যসমাজের প্রাথমিক শর্ত। যদি কেউ এই শর্ত লঙ্ঘন করে, তবে তাকে নিরস্ত করতে হয়। কিন্তু উগ্র ধর্মবাদ প্রভাবিত রাষ্ট্রগুলোতে তা হচ্ছে না। এখানেই রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। সেই সঙ্গে তা মানবজাতির জন্যও শোচনীয় পরাজয়!

ভারতীয় উপমহাদেশে ‘সংবিধানের শাসন’ মেনে আমরা ‘বেশি হিন্দু, বেশি মুসলমান’ হয়ে উঠছি। এর ফলে ধর্মের ঐশ্বর্যকে ব্যাপক করে তোলার কাজটি থেকে আমরা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছি। মানুষ বাদ দিয়ে ধর্ম যখন সবকিছুর নিয়ন্তা হয়ে দাঁড়ায়, তখন মানবতার মুক্তি অসম্ভব হয়ে পড়ে। আমাদের লোকায়ত গানেও ধর্ম তর্কজাল ছিঁড়ে সহজ মানবতায় মুক্তি পেয়েছে। ‘মনেতে মথুরা আছে/মক্কা কাবার ঘর/তারই মাঝে বিরাজিছে/মানুষ সুন্দর’ (একলিমুর রাজা চৌধুরী)।

একবিংশ শতাব্দীতে ব্লাসফেমি আইনের কোনো স্থান থাকতে পারে না। সব দেশে সব মানুষের জন্য মানবাধিকার এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ এবং রক্ষা করা দরকার। ধর্ম বা বিশ্বাসের স্বাধীনতার অধিকার সবার জন্য গ্যারান্টিযুক্ত হওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও এ ব্যাপারে দায়িত্ব আছে। অন্ধ হয়ে না থেকে আমাদের দেশে, ভারতে বা পাকিস্তানে কী ঘটছে, সেদিকে অবশ্যই সবার দৃষ্টি দেওয়া উচিত। মানবাধিকার রক্ষা করা বিশেষত, দুর্বল ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের ব্যক্তির মানবাধিকার, সবার জন্যই একটি মহান দায়িত্ব।

পাকিস্তানের জুনায়েদ হাফিজ অসহায় হয়ে আজ ফাঁসির জন্য অপেক্ষা করছেন। কোথায় মানুষ, কোথায় মনুষ্যত্ব? ধর্মের অবমাননার আড়ালে এই মানুষ খুনের চক্রান্ত, তাও আবার আদালত আর সংবিধানের দোহাই দিয়ে? এই এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে, এই বর্বরতার বিরুদ্ধে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সব মানুষকে সোচ্চার হতে হবে। পথে নেমে এর বিরোধিতা আর তীব্র প্রতিবাদ করতে হবে। মধ্যযুগের অন্ধকারকে ফিরিয়ে আনার সর্বগ্রাসী আয়োজন মানবজাতির অভীষ্ট হতে পারে না।

লেখক : লেখক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত